• শিরোনাম

    বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগানোর জন্য বিএফআরআই ডিজি ড. ইয়াহিয়া মাহমুদের আহবান

    কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল সী-উইড বা সামুদ্রিক সবজি চাষের উপযোগী

    বার্তা পরিবেশক | ২৮ মে ২০১৯ | ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ

    কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল সী-উইড বা সামুদ্রিক সবজি চাষের উপযোগী

    কক্সবাজারসহ দেশের ৭১০ কিলোমিটারব্যাপী সমুদ্র সৈকত এবং ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার ব্যাপী উপকূূলীয় অঞ্চল সী-উইড বা সামুদ্রিক সবজি চাষের উপযোগী। কক্সবাজারস্থ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ ছয় বছরের গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে ১১৭ প্রজাতির সী-উইড শনাক্ত হলেও এরমধ্যে ১০টি রপ্তানীযোগ্য ও বাণিজ্যিকভিত্তিতে লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়েছে। দেশের ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র সম্পর্কিত অর্থনীতি জোরদার করার জন্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এ প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগানোর আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ও দেশের বিশিষ্ট মৎস্য বিজ্ঞানী ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ।
    সোমবার দুপুরে কক্সবাজার সাগরপাড়ের এক হোটেলে কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত ‘কক্সবাজার উপকূলে সী-উইড চাষের সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক কর্মশালায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যদি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার করা না হয়, তাহলে সেই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কোন মানে থাকে না। তিনি বলেন, আমাদের সমুদ্র সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সমুদ্রসীমা বিজয়ের ফসল ঘরে তুলতে হবে।
    তিনি জানান, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি হ্যাচারিতে কৃত্রিম উপায়ে কোরাল বা ভেটকি মাছের পোনা উৎপাদনে সক্ষম হওয়ার পর উদ্ভাবিত সেই প্রযুক্তিতে এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাচ্ছে। কক্সবাজারে সরকারি হ্যাচারিতে খুব শীঘ্রই কাঁকড়া পোনার পাশাপাশি কোরাল মাছের পোনাও মিলবে। উপকূলীয় ঘেরে সুস্বাদু কোরাল মাছের চাষ খুব লাভজনক হবে।
    কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.জুলফিকার আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ ইন্সটিটিউটের পরিচালক প্রফেসর ড. জাহেদুর রহমান চৌধুরী, চট্টগ্রামস্থ সামুদ্রিক মৎস্য জরীপ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. লতিফুর রহমান, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের গবেষণা শাখার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কাঁকড়া বিশেষজ্ঞ ড. ইনামুল হক এবং
    বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রফেসর ড. হারুনুর রশীদ। আরো বক্তব্য দেন কক্সবাজার জেলা মৎম্য কর্মকর্তা এসএম খালেকুজ্জামান ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ মোহাম্মদ শরিফউদ্দিন। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কক্সবাজারস্থ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মহিদুল ইসলাম। কর্মশালা পরিচালনায় ছিলেন উপ-পরিচালক ড. আবদুর রাজ্জাক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকিয়া খানম। কর্মশালায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিজ্ঞানী, শিক্ষক, ছাত্র, এনজিও কর্মী, সাংবাদিক ও উদ্যোক্তাসহ শতাধিক অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন।
    কর্মশালায় বলা হয়, স্থানীয় ভাষায় সী-উইড “হেজালা” নামে পরিচিত। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন¤িটটিউট এর কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র ২০১৩ সাল হতে সী-উইড নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইন¤িটটিটিউট থেকে কক্সবাজার সদর উপজেলার বাঁকখালী নদী-মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় নুনিয়ারছড়া থেকে নাজিরারটেক পর্যন্ত সৈকত সংলগ্ন জোয়ার-ভাটা এলাকা ও মহেশখালী দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক গুরুত্বস¤পন্ন সী-উইডের প্রাকৃতিক উৎপাদন ক্ষেত্রের সন্ধান লাভ করেছে। প্রাপ্যতা ও স্থানীয় পরিবেশের সাথে মানানসই প্রজাতিগুলোর পুষ্টিমান যাচাই এবং খাদ্য উপাদান হিসেবে বাণিজ্যিক গুরুত্বের আলোকে গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞানীরা কক্সবাজার উপকূলে এ পর্যšত ১১৭ প্রজাতির সীউইড সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। সে সাথে সীউইডের পুষ্টিমাণ নির্ণয় করা হয়েছে। পুষ্টি মানের বিচারে বিভিন্ন দেশে খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল হিসোবেও এটি সমাদৃত। মানব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও ডেইরী, ঔষধ, টেক্সটাইল ও কাগজ শিল্পে সী-উইড আগার কিংবা জেল জাতীয় দ্রব্য তৈরীতে কাঁচামাল হিসেবে বহুল ব্যবহ্রত হয়। তাছাড়া জমিতে সার হিসাবে, প্রাণি খাদ্য ও লবণ উৎপাদনেও সী-উইড ব্যবহার করা হয়। সী-উইডে প্রচুর পরিমাণে খনিজ দ্রব্য বিদ্যমান থাকায় খাদ্যে অণূপুষ্টি হিসেবে এর ব্যবহার গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এসব সী-উইড বা সামুদ্রিক সবজিসমূহে উচ্চমাত্রায় প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামসহ মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও আয়োডিনজনিত গলগন্ডরোগের কার্যকরী প্রতিষেধক হিসাবে বিবেচিত বলে জানান বিজ্ঞানীরা। রক্তে কোলেস্টরেল কমাতেও সী-উইডের অনন্য ভূমিকার কথা জানানো হয়। এতে সামুদ্রিক লবণের চেয়ে অধিক পরিমাণে আয়োডিন রয়েছে বলে থাইরয়েড (গলগন্ড) রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও এটি কাজ করে।
    তবে আমাদের দেশে খাবার হিসেবে এর জনপ্রিয়তা না থাকলেও বিদেশে এদের প্রচুর চাহিদা ও বাজার মুল্য রয়েছে বলে জানান বিএফআরআই ডিজি ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।
    কর্মশালায় বিজ্ঞানীরা গবেষণা লব্দ ফলাফল তুলে ধরে আরো জানান, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ সেন্টমার্টিন দ্বীপ, ইনানী ও শহরতলীর বাঁকখালী মোহনার আশপাশের পাথুরে ও প্যারাবন এলাকায় জোয়ার-ভাটার অর্ন্তবর্তী স্থানেই অধিকাংশ সী-উইড জন্মায়। তবে সী-উইড জš§ানোর জন্য কিছু ভিত্তির প্রয়োজন পড়ে। সাধারণতঃ বড় পাথর, প্রবাল, শামুক-ঝিনুক-পলিকিটের খোসা, প্যারাবনের গাছ-শিকড়, শক্ত মাটি কিংবা অন্য যেকোন শক্ত বস্তুর উপর সী-উইড জšে§ বলে জানান বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশে সী-উইডের বৃদ্ধির হার ভারতের চেয়ে বেশি। তবে ভারতে বছরে ২১০ দিন চাষ করা গেলেও বাংলাদেশে মাত্র বছরে ৯০ দিনই চাষ করা যায়।
    বিজ্ঞানীরা জানান, আমাদের জলবায়ুতে স্থানভেদে নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৬ মাস সী-উইড চাষ করা যায়। তবে চাষের সর্বোচ্চ অনুকুল অবস্থা বিদ্যমান থাকে জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাস সময়। নারিকেলের রশি ও নাইলনের মাছ ধরার জাল ব্যবহার করে ইন¤িটটিটিউট থেকে আনুভূমিক নেট পদ্ধতিতে সী-উইড চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ৩ প্রজাতির (Hypnea musciformis, Enteromorpha intestinalis, Caularpa racemosa) সীউইড চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। আমাদের উপকূলে হিপনিয়া প্রজাতির সীউইডের উৎপাদনশীলতা (৩০ কেজি/বর্গমি.) পার্শ্ববর্তী দেশের একই প্রজাতির উৎপাদনশীলতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ