• শিরোনাম

    * কারাগারটি অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া * ইয়াবা কারবারি বন্দীরা খাচ্ছেন কেজিতে ১৭০০ টাকার গরু ও ৬০০ টাকার মুরগির মাংশ

    কক্সবাজার কারাগার ইয়াবা কারবারিদের রাজস্থান

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৯ জুন ২০১৯ | ১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

    কক্সবাজার কারাগার ইয়াবা কারবারিদের রাজস্থান

    কক্সবাজার জেলা কারাগারে লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাত্রা এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কারাগারে আটক বন্দীদের নিকট এক কেজি গরুর কাঁচা মাংশ বিক্রি করা হচ্ছে এক হাজার ৭০০ টাকায়। সেই সাথে কাঁচা মুরগির মাংশ বিক্রি করা হচ্ছে কেজি প্রতি ৬০০ টাকা করে। তার উপর মাংশ রান্না করে দেয়ার জন্য আলাদা বখশিসও আদায় করা হয়। এত উচ্চ দামের মাংশের ক্রেতারা হচ্ছেন আতœসমর্পণ করা কোটিপতি কারাবন্দী ইয়াবা কারবারিরা।
    সাধারণ বন্দীদের কপালে এরকম দামি মাংশ জুটে না। কারাগারের বন্দীদের সাথে ৫ মিনিট কথা বলতে আদায় করা হয় জনপ্রতি ১২০০/ টাকা করে। এর পরবর্তী মিনিট নেয়া হয় ১০০/ টাকা করে। কারাগারের ভিতর থাকা ক্যান্টিন ব্যবসায় প্রতি মাসে কোটি টাকাও লাভ হয়। এ ক্যান্টিনেই ২ টাকার শপিং ব্যাগ বিক্রি করা হয় প্রতি পিস ২০ টাকা হিসাবে। কারাগারে ইয়াবা কারবারি বন্দীদের জন্য যেন এক ভিন্ন জগত। কারবারিদের যেহেতু টাকার অভাব নেই সেহেতু তারা যখন যেটা চায় তখন সেটাই তাদের হাতের নাগালে আসে। বলতে গেলে কক্সবাজারের ‘কারাগারটি যেন ইয়াবা কারবারিদের একটি রাজস্থান।’
    কক্সবাজার কারাগারে দীর্ঘদিন কারা ভোগ করা এক ইয়াবা কারবারি দম্পতির অজানা কাহিনী জানা গেছে একজন বিএনপি নেতার কাছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বিএনপি নেতা গতরাতে জানান, তিনি রাজনৈতিক মামলায় বেশ কিছুদিন জেলা কারাগারে ছিলেন। ওই সময় নেতার সাথে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ইয়াবা ডন বাবুল মেম্বারের সখ্য গড়ে উঠে। প্রায়শ গল্প-গুজবে মেতে উঠতেন তারা। একদিন গল্পচ্ছলে বাবুল মেম্বার বলেই ফেললেন-‘টাকাতো ভাই হাতের ছাতা। আমি মেম্বার হয়েছি দেড় কোটি টাকা খরচ করে।’ বাবুল মেম্বার আরেকদিনতো ইয়াবা কারবারের মোর্দ্দা কথাই বলে ফেললেন। কথায় কথায় বাবুল মেম্বার বললেন-‘ সবকিছু ছাড়া যায় কিন্তু ইয়াবা কারবার ছাড়া যায়না। কেননা মাত্র ২০ হাজার টাকা দিয়ে যদি ২০ লাখ টাকা ঘরে আসে সেটা ছাড়ি কিভাবে।’ প্রসঙ্গত কারবারি বাবুল মেম্বারের স্ত্রী ১০ হাজার ইয়াবা নিয়ে ঘর থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। এরপর বিজিবি সদস্যদের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন বাবুল মেম্বার। তারা জামিনে বের হয়েছেন। তবে জামিনে গিয়ে এখন বাবুল মেম্বার পলাতক হয়ে গেছেন।
    সাধারণত দেশের প্রতিটি কারাগারে দুর্নীতি-অনিয়ম চলে আসলেও কক্সবাজার জেলা কারাগারের সাম্প্রতিক চিত্র ভিন্ন রকমের। কারাগার সুত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রুবার পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দী রয়েছে ৪ হাজার ২৬০ জন। এসব বন্দীর মধ্যে শতকরা ৭০ জন অর্থাৎ তিন হাজারেরও বেশী রয়েছেন ইয়াবা কারবারি। কারাকর্মীরা ইয়াবা কারবারিদের টার্গেট করে যেনতেন ভাবে টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এমন কাজের খেসারত দিতে হচ্ছে অন্যান্য অপরাধে জড়িত সহ¯্রাধিক বন্দীদের। বিশেষ করে গত ১৬ ফেব্রয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উপস্থিতিতে আতœসমর্পণ করা ১০২ জন কোটিপতি ইয়াবা কারবারি কারাগারে অবস্থানের পর থেকেই কারাভ্যন্তরের পরিস্থিতি বদলে গেছে।
    আগে কারাভ্যন্তরে সিট বেচাকেনার বিষয়টি অনেকটাই সহনশীল ছিল। কিন্তু ইয়াবা কারবারিদের কারনে এখন অন্যান্য মামলার বন্দীরা আর কোন সিট কিনে থাকতে পারছেন না। কেননা কারবারিরা যে টাকা দিয়ে সিট কিনে কারাগারের ভিতর থাকতে পারছেন তা অন্যান্য বন্দীদের কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। কারাগারে পানির অভাব হওয়ায় আতœসমর্পণ করা টেকনাফের হ্নীলা গ্রামের বাসিন্দা এক ইয়াবা কারবারি নিজেই ৭/৮ লাখ টাকা খরচ করে ২ টি গভীর নলকুপও স্থাপন করে দিয়েছেন। বিনিমেয় ওই কারবারি কারাগারের ২০ টি ওয়ার্ডের যেখানেই ইচ্ছা সেখানেই দিনরাত কাটাতে পারেন। নলকুপ স্থাপনকারি কারবারির কদরও কারাগারে এখন অন্যরকমের। তিনি কারারক্ষীদের নিকটও বিশেষ মর্যাদা পেয়ে আসছেন। কেননা নলকুপের পানি নিয়েও চলছে ভাল বাণিজ্য।
    জেলা কারাগারের ভিতর ভিতর বর্তমানে ২০ টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ড মিলে রয়েছে ৫ টি ক্যান্টিন। তদুপরি ওয়ার্ডের বাইরে কারা ফটকেও রয়েছে আরো একটি ক্যান্টিন। ক্যান্টিনগুলোই মূলত কারাবন্দী মানুষগুলোকে জিন্মি করে টাকা উপার্জনের বড় ফন্দী হিসাবে ব্যবহ্রত হচ্ছে। কারাগারের পুরানো বিশ্বস্ত বন্দীদের সহায়তায় রক্ষীরাই ক্যান্টিনগুলো নিয়ে গলাকাটা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। খাবার দাবার থেকে শুরু করে একজন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় পণ্যই ক্যান্টিনে থাকে। তবে দাম বাইরের বাজারের ৩/৪ গুণ বেশী। বন্দীদের স্বজনরা বাইর থেকে কোন পণ্য নিয়ে ভিতরে দিতে পারবে না। যাই দিতে হয় তার সবই কারাগারের ক্যান্টিন থেকে কিনে দিতে হবে।
    গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি রাজনৈতিক মামলা থেকে জামিনে মুক্ত কক্সবাজারের ঈদগাঁও এলাকার বাসিন্দা আবুল কাসেম জানান-‘ কোন না কোন কারনে কারা কর্তৃপক্ষের সাথে আমার বিশেষ সখ্য ছিল। আমি নিজেও ক্যান্টিন পরিচালনায় তাদের একদম কাছে থাকতাম। আমার জানামতে কেবল জানুয়ারি মাসেই ক্যান্টিনে নীট মুনাফা এসেছিল ৪৫ লাখ টাকা। আর ১৬ ফেব্রুয়ারি ১০২ জন ইয়াবা কারবারি কারাগারে ঢুকার পর থেকেই মাসিক আয় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ হতে বাধ্য।’ কেননা ইয়াবা কারবারিদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নিজেদেরই কয়েকজন মিলে রান্না করে খাবারের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ কারনেই তাদের কয়েকগুণ বেশী দামে মাংশ কিনে নিতেও গায়ে লাগছে না।
    ঈদের তিনদিন আগে জেলা কারাগার থেকে একটি মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়া দিদারুল আলম নামের কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার একজন প্রবাসী জানিয়েছেন, কারাগারের ভিতর ইয়াবা কারবারিদের এক ভিন্নরকমের প্রভাব চলছে। এ প্রভাবের কারনে কষ্টে আছেন রাজনৈতিক কারনের মামলা সহ বিভিন্ন মামলার কারাবন্দী আসামীরা। এই প্রবাসী নাগরিক বলেন-‘কারাগারের হাসপাতাল থেকে আমদানী ওয়ার্ড সহ সবখানেই ইয়াবা কারবারিরা টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রাখেন। তাদের অবৈধ টাকার কাছে অন্যান্যরা অসহায়।’ তিনি জানান, কারাগারের আমদানী ওয়ার্ডে সিট নিয়ে রয়েছেন কক্সবাজার শহরের শাহজাহান আনসারী ইয়াবা ডন। তার জন্য প্রতিদিনই তিন বেলা বাসা থেকে ভাত যায় কারাগারে।
    র‌্যাবের হাতে ৪ টি অস্ত্র নিয়ে গ্রেফতার হওয়া একজন সম্প্রতি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির তিন ভাই সহ ৫ জন কোটিপতি কারাগারের ৩ নম্বর সেল এর ২ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছেন। তারা জনপ্রতি মাসিক ৫০ হাজার টাকা চুক্তিতে এমন সুযোগ নিয়েছেন। ওয়ার্ডটির বিশেষ সুযোগ হচ্ছে টাইলস করে দেয়া হয়েছে ওদের সুবিধার জন্য। কারাগারে কারবারিরা মোবাইলও ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকবার মোবাইল উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। ইয়াবা কারবারিদের কারনে কারাগারটিতে বাড়তি আয় দেশের অন্যান্য কারাগার থেকে সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন। তাই এখানে একবার পোষ্টিং নিয়ে যিনি এসেছেন তিনি কোনভাবেই এখান থেকে অন্যত্র যেতে রাজি নয়।
    মাস তিনেক আগে কারগারটির ব্যবস্থাপনা তদারকিতে নতুন করে ৯ সদস্যের একটি বেসরকারি কারা পরিদর্শক দলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত পরিদর্শকদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন স্থানীয় এমপি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, একজন জেলা যুবলীগ নেতা, একজন নারী নেত্রী, একজন শিক্ষাবিদ ও একজন মুক্তিযোদ্ধা। নিয়োগপ্রাপ্ত একজন বেসরকারি পরিদর্শকের বিরুদ্ধেও উঠেছে নানা অভিযোগ। বলা হচ্ছে, ওই পরিদর্শক কয়েক ঘন্টা ধরে বন্দীদের সাথে কথা বলিয়ে দিতে চুক্তির পর দর্শনার্থীদের কারগারে পাঠিয়ে থাকেন। এসব ছাড়াও সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, কারাগারের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে। হাসপাতালে চুক্তির মাধ্যমে ইয়াবা কারবারিরা দখল করে নিয়ে থাকেন। তবে কোন পরিদর্শন দল গেলে দ্রুত কারবারিদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে কিছু অসুস্থ এবং উন্মাদ প্রকৃতির লোকজনকে এনে দেয়া হয়।
    এসব বিষয় নিয়ে বেসরকারি কারা পরিদর্শক এবং কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফার সাথে আলাপ করলে তিনি বলেন-‘আমার সময়ের অভাবে কারাগারে তেমন যাওয়া হয়না। তবে যে সব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এসব অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি অবশ্যই কারাগারে গিয়ে এসব অন্যায়-অবিচার তদন্ত করে জোরালো প্রতিবাদ করব।’ অপরদিকে বেসরকারি কারা পরিদর্শক মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন-‘ আমাদের বেসরকারি কারা পরিদর্শকের তালিকায় রেখে কারাগারের অভ্যন্তরে ফ্রিষ্টাইলে আকাম-কুকাম চলবে তা কিছুতেই হতে দেব না। আমি এসবের ঈঙ্গিত পেয়েই কারাগারের তত্বাবধায়ককে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি এখনো কোন ব্যবস্থা নেননি।’
    গত বৃহষ্পতিবার ঈদের পরের দিন কারাগারে এত বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর ভীড় জমেছিল যে, এদিন দর্শনার্থীদের নিকট থেকে কারারক্ষীরা যে যেভাবেই পেরেছেন টাকা আদায় করে নিয়েছেন। এ কারনেই কক্সবাজার কারাগারের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের চলমান অনিয়ম-দুর্নীতির কথা চাওর হয়ে পড়ে। ঈদের পরের দিন বৃহষ্পতিবার কারাগারে অন্তত ৬/৭ হাজার দর্শনার্থীর ভীড় জমেছিল বলে জানা গেছে। এদিন বন্দীদের সাথে দেখা করে ভাত-তরকারির একটি ক্যারিয়ার ঢুকাতেও কারা কর্তৃপক্ষ আদায় করেছে ২০০/৩০০ টাকা। এসব বিষয়ে কক্সবাজার জেলা কারাগারের তত্বাবধায়ক বজলুর রশীদ আখন্দ দাবি করেছেন-‘অভিযোগ সমূহ সত্য নয়। বৃহষ্পতিবার কয়েক হাজার দর্শনার্থী ছিল কারাগারে। ওই সময় আমি কিছু সময়ের জন্য বাইরে ছিলাম। একারনে এ সময় কিছু অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তাই এসব অভিযোগের বিষয়ে আমি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’ ####

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ