• শিরোনাম

    মাতামুহুরীতে স্নান এখন বিপদসংকুল!

    নদীর ৩০ পয়েন্টে তৈরি হচ্ছে মানবসৃষ্ট চোরাবালি

    নিজস্ব প্রতিবেদক, চকরিয়া | ২৮ মে ২০১৯ | ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

    নদীর ৩০ পয়েন্টে তৈরি হচ্ছে মানবসৃষ্ট চোরাবালি

    মাতামুহুরী নদীর চকরিয়া অংশের অন্তত ৩০ পয়েন্টে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিনে এভাবেই অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু।

    পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদী সরকার ঘোষিত কোন বালুমহাল নয়। এর পরও কক্সবাজারের চকরিয়া অংশে নদীতে শক্তিশালী ড্রেজার এবং শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলণের কারণে অসংখ্য স্থানে তৈরি হচ্ছে গভীর গর্তসহ চোরাবালি। মানবসৃষ্ট এই চোরাবালির কারণে নদীতে গোসল বা ¯œান করা এখন বিপদসংকুল হয়ে উঠছে। প্রতিনিয়ত কোন না কোন স্থানে গোসল করতে নেমে সলিল সমাধি হচ্ছে মানুষের। বিশেষ করে দুরন্তপণা শিশু-কিশোররা এই সলিল সমাধি থেকে রেহাই পাচ্ছেনা।
    একসময়ের নিরাপদ মাতামুহুরীতে গভীরতা কমে আসলেও এমন রূপ কেন ধারণ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এজন্য নদীর বিভিন্নস্থানে মানবসৃষ্ট চোরাবালিকেই দায়ী করছেন সচেতন মহল। নতুন করে গত দুইমাস ধরে নদীর চকরিয়া অংশের বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি পয়েন্টে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করায় সেখানে নতুন করে তৈরি হচ্ছে চোরাবালি। এতে সামনের দিনগুলোতে আরো বেশি মানুষের সলিল সমাধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে গত একবছরে কম করে হলেও ২০ জনের বেশি লোকের সলিল সমাধি হয়েছে চোরাবালিতে। কিন্তু বরাবরের মতোই প্রশাসনের কর্মকর্তারা রয়েছেন একেবারেই নির্বিকার। তবে প্রশাসন সবকিছুই অবগত থাকলেও রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার দাপটের কারণে তারাও অনেকটা অসহায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
    সর্বশেষ গত রবিবার সকালে উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের পূর্ব কাকারা এলাকায় মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে সলিল সমাধি হয়েছে আমজাদ হোসেন (৮) নামের এক শিশুর। সে ওই এলাকার রফিকুল কাদের মুন্সীর পুত্র।
    স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি প্রভাবশালীরা মাতামুহুরী নদীর পূর্ব কাকারা পয়েন্টে শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে। এতে ওই পয়েন্টের একাধিক স্থানে গভীর গর্ত হয়ে চোরাবালির সৃষ্টি হয়। গতকাল সকালে সেখানে গোসল করতে নামে শিশু আমজাদ। এ সময় সে চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে পড়ে। তবে কিছুক্ষণ পর শিশুটির লাশ পানিতে ভেসে উঠে।
    কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শওকত ওসমান জানান, নদীতে গোসল করতে নেমে চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে শিশুটি মারা যায়।
    খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত একবছরে চকরিয়ার বিভিন্নস্থানে মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে সলিল সমাধি হয়েছে অন্তত ২০ জনের। তন্মধ্যে নিহত বেশিরভাগ শিশু-কিশোর বয়সের। গত বছরের ১৪ জুলাই মাতামুহুরী নদীর চিরিঙ্গা সেতুর কাছের বালুরচরে ফুটবল খেলার পর গোসল করতে নদীতে নেমে পড়ে একদল স্কুলশিক্ষার্থী। তারা সকলেই চকরিয়া গ্রামার স্কুলেরই শিক্ষার্থী। তন্মধ্যে মাতামুহুরী নদীর চোরবালিতে একে একে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারায় ৫ জন শিক্ষার্থী। একটানা ৫-৬ ঘন্টা তল্লাশী চালিয়ে এবং চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এনে এসব শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করা হয়। একসঙ্গে ৫ জন শিক্ষার্থী তথা কিশোরের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো কক্সবাজারে নেমে আসে শোকের ছায়া। দাবি উঠে নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পয়েন্টে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের। এনিয়ে তৎসময় অনেক হৈ চৈ পড়ে গেলেও পরবর্তীতে সেই ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়।
    ওইসময় চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের প্রধান জি এম মহিউদ্দিন জানিয়েছিলেন, শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত তথা চোরাবালির সৃষ্টি হয়েছিল। এতে ওই চোরাবালিতে একে একে পাঁচ শিক্ষার্থীর প্রাণ যায়।
    এছাড়াও সম্প্রতি উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের রামপুর এলাকায় নদীতে গোসল করতে নেমে চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায় এক দোকান কর্মচারী। পরে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এসে তল্লাশী চালিয়ে নদী থেকে ওই কর্মচারীর লাশ উদ্ধার করে। রামপুর পয়েন্টেও প্রভাবশালীরা শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সেখানে সৃষ্ট চোরবালিতেই সলিল সমাধি হয় ওই দোকান কর্মচারীর। উপরের সাতজন ছাড়াও একইভাবে গত একবছরে উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে প্রাণ যায় অন্তত ২০ জনের।
    সরজমিন দেখা গেছে, গত দুইমাস ধরে মাতামুহুরী নদীর চকরিয়ার ঘুনিয়া, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, পৌরসভার বিভিন্ন পয়েন্ট, সাহারবিলের রামপুর, মাইজঘোনা, কৈয়ারবিল, বাঘগুজারা, বেতুয়া বাজার, কোনাখালীর কন্যারকুম, চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনা, চরণদ্বীপসহ অন্তত ৩০টি পয়েন্টে এখন চলছে প্রভাবশালী বালুদস্যুদের অপতৎপরতা। সেখানে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। এতে নদীতে সৃষ্টি হচ্ছে ২০-৩০ ফুট গর্তসহ অসংখ্য চোরাবালি। এই অবস্থায় মানুষ গোসল করতে নামলেই চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে।
    চোরবালি কেন হয়, এমন প্রশ্ন করা হলে মাতামুহুরী নদীর তিন কিলোমিটারে ড্রেজিয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এস এস ন্যাশনের কর্ণধার নূরে বশির সয়লাব বলেন, ‘যেখানে শ্যালোমেশিন বা ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয় সেখানে নির্দিষ্ট জায়গায় বড় ধরণের একটি গর্তের সৃষ্টি হয়। আর সেই গর্ত ভরাট হয় পলিমাটিতে। তখন সেই গর্তের মধ্যে কেউ ঢুকে গেলে সহজে বের হতে পারে না। এতে সলিল সমাধি ঘটে।’
    প্রশ্নোত্তরে তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাকে নদীর তিন কিলোমিটারে ড্রেজিং করার জন্য নিয়োজিত করেছে। সেই মোতাবেক ডিজাইন এবং তিনটি কাটার ড্রেজার মেশিন পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিয়ের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু অপসারণ করছেন। নদীর অন্যান্য পয়েন্টে যেসব শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, তাতে আমার কোন ধরণের সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ মনে করছেন নদীর সবখানেই আমি অবৈধভাবে বালু তুলছি, যা কোন অবস্থাতেই সত্য নয়।’
    অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই বালু তুলছি। এতএব এনিয়ে লেখালেখি করলেও কোন কাজ হবে না। কারণ এসব বালু আমরা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বিক্রি করছি।’
    কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, ‘শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর বুকে বিভিন্নস্থানে বড় ধরণের গর্ত তৈরি হয়ে চোরাবালিতে পরিণত হচ্ছে। এতে আগামী বর্ষামৌসুমে নদীর তীর ভেঙে বহু স্থাপনা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বালুদস্যুদের এই অপতৎপরতা বন্ধে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে পত্র দেওয়া হয়েছে।’
    শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে মাতামুহুরী নদীর বেশকিছু পয়েন্ট থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার বলেন, ‘মাতামুহুরী নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। যারা এই অপকর্ম করে নদীতে চোরাবালি সৃষ্টি করছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ