• শিরোনাম

    শহরে বহুতল ভবনে কউক’র অভিযান

    নেই নকশার অনুসরণ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা

    শহীদুল্লাহ্ কায়সার | ০৫ এপ্রিল ২০১৯ | ২:৩১ পূর্বাহ্ণ

    নেই নকশার অনুসরণ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা

    কক্সবাজার শহরের আলীর জাঁহাল। সিটি কলেজের সামনের এই এলাকার একটি সরু গলিতে নির্মিত হয়েছে একটি ১০ তলা ভবন। সৌদি প্রবাসী জনৈক মুজাহিদুল হক সিকদার ভবনটির মালিক। নির্মাণকালে প্রকৌশলী ভবনের পরতে পরতে রেখে গেছেন নানা সমস্যা।
    প্রায় ৫ শতক ছোট্ট জমির উপর গড়ে উঠা ভবনটি দূর থেকে দেখলে মনে হয় হেলে পড়ছে। ভবনের চারপাশে রাখা হয়নি আলো-বাতাস প্রবেশের প্রয়োজনীয় জায়গা। ভেতরের অবস্থা আরো খারাপ। সুউচ্চ এই ভবনে প্রবেশ এবং বের হওয়ার জন্য রয়েছে মাত্র ১টি ছোট্ট সিড়ি। উপরে উঠার জন্য রয়েছে একটি লিফট। যে লিফটটি রয়েছে তাতে চারজনের অধিক মানুষ বহন করা যায়না। মাকড়সার জালের মতো একপাশে ছড়িয়ে আছে ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার।
    ২০০৯ সালে এই ভবন নির্মাণের অনুমতি প্রদান করে কক্সবাজার পৌরসভা। এরপর থেকে পৌরসভার কোন কর্তা ব্যক্তি খবরও নেননি। অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করে সিকদার ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে কিনা। আগুন কিংবা ভূমিকম্পের মতো কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হলে যার পরিণতি হবে ভয়াবহ। ভবনে বসবাসকারীদের মৃত্যু ছাড়া আর কোন পথ খোলা থাকবে না।
    গতকাল কউক’র অভিযানে যা প্রত্যক্ষ করেন অভিযান পরিচালনাকারীরা। ওই সময় সেখানে ভবন মালিক অনুপস্থিত থাকলেও উপস্থিত ছিলেন তাঁর পিতা আমানুল হক সিকদার। তাঁকে অভিযান পরিচালনাকারী কউক সচিব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদর্শন করতে বললে, তিনি বেশ কিছু কাগজ উপস্থাপন করতে পারলেও পারেননি নকশা উপস্থাপন করতে। যে শর্ত মেনে তাঁর সন্তান ভবন নির্মাণের অনুমতি গ্রহণ করেন তার সাথে ভবনের বর্তমান অবস্থার কোন মিল নেই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনটি পরিদর্শন শেষে শুধু একটিই মন্তব্য করলেন, ‘এই ভবনে ফায়ার সেফটির কোন ব্যবস্থা নেই।’
    একই অবস্থা সিকদার টাওয়ারের সামনের হক টাওয়ারের। এই ভবনের মালিক রহমত উল্লাহও একজন সৌদি প্রবাসী। গতকাল অভিযানের সময় তাঁর নিয়োজিত ভবন ব্যবস্থাপক এসে জানালেন তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মালিকের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তিনি এসেছেন।
    জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ২০১৫ সালে ভবনটির অনুমোদন নেয়া হয় । ফায়ার সার্ভিস থেকেও নেয়া হয় ছাড়পত্র। কিন্তু পূরণ করা হয়নি অনুমোদন ও ছাড়পত্রের শর্ত। ফলে এই ভবনে আগুন ধরলে তা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কোন কিছুই করার থাকবে না। খোদ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাই এই কথা বললেন। নকশার ব্যতয় ঘটিয়ে নির্মিত এই ভবনের নকশাও অভিযান পরিচালনাকারীদের প্রদর্শনে ব্যর্থ হন ভবনের ব্যবস্থাপক। উল্লিখিত ভবন দুইটির চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম শহরের পানবাজার সড়কের এআরসি টাওয়ার। অনুমোদনের প্রায় সব শর্তই পালনের চেষ্টা করেছেন বাণিজ্যিক এই ভবনের মালিক আবদুর রহিম চৌধুরী।
    তবে তা বাহ্যিক। সবকিছু থেকেও যেন নেই এআরসি টাওয়ারের। এই ভবনে আগুন ধরলে আফসোস করতে হবে প্রায় সবকিছু থাকার পরও শুধুমাত্র অবহেলার কারণে কতো করুণ পরিণতি তাদের বহন করতে হচ্ছে। অগ্নি নির্বাপণের সব ধরনের যন্ত্রপাতি ভবনটিতে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এমনকি নির্মাণের পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দিয়ে একটি মহড়ার আয়োজনও প্রয়োজন মনে করেননি ভবন মালিক। আগুন ধরলে জরুরীভাবে বাইরে আসার মতো কোন পথও রাখেননি প্রকৌশলীরা। তবে, ভবন মালিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শীঘ্রই তিনি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সচল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
    উল্লিখিত ভবন ৩টির প্রকৃত চিত্র দেখা যায় গতকাল ৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার। সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত এই অভিযান পরিচালনা করেন কউক সচিব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু জাফর রাশেদ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী বহুতল ভবনগুলোতে আগুন লাগার প্রেক্ষিতেই কক্সবাজারের বহুতল ভবনগুলোর প্রকৃত চিত্র দেখতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। যখন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় ভবনগুলোতে অভিযান পরিচালনা করে। তখনই দেখা যায়, শহরের বহুতল ভবনগুলোর প্রকৃত অবস্থা। গতকালের অভিযানে কোন ভবন মালিককে জেল-জরিমানার মতো কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। প্রাথমিকভাবে তাঁদের নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের ভবনের ত্রুটি সারিয়ে নিতে। তবে, আগামি ১ মাসের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা না হলে জেল-জরিমানার মতো কঠোর শাস্তির বিষয়টি তাঁদের জানিয়ে দেয়া হয়।
    বর্তমানে শুধুমাত্র ৬ তলার উর্ধ্বে নির্মিত বহুতল ভবনগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে ৬ তলা থেকে নি¤েœ নির্মিত ভবনগুলো নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করাসহ অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা যাচাই করতে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানা গেছে।
    অভিযান পরিচালনাকারী কউক সচিব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু জাফর রাশেদ বলেন, শুরুতেই জরিমানা দন্ডের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলে অভিযানে সফল হবে না। এই কারণে অভিযুক্ত ভবন মালিকদের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হলো। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভবনের ত্রুটি সারা না হলে পরবর্তীকালে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
    ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার সদর উপজেলার ইনচার্জ শাফায়েত হোসেন বলেন, বর্তমানে কক্সবাজারে ৪ শতাধিক বহুতল ভবন রয়েছে। যার ৯০ ভাগেরই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলোতে আগুন ধরলে তা নেভানোর মতো সামর্থ্য আমাদেরও নেই। এই কারণেই ভবন মালিকদের নোটিশ দিয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ