• শিরোনাম

    দলীয় সভানেত্রীকে তৃণমূলে তদারকির তাগিদ

    ‘নৌকা’কে অজনপ্রিয় করতেই কক্সবাজারে নানা কৌশল

    তোফায়েল আহমদ | ২৫ মার্চ ২০১৯ | ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

    ‘নৌকা’কে অজনপ্রিয় করতেই কক্সবাজারে নানা কৌশল

    দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা কে ক্রমশ ‘অজনপ্রিয়’ করে তোলার এক সুদুর প্রসারি প্রচেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। দলটির ঘরে বাইরেও এমন অপচেষ্টা চলছে বলেও নেতা-কর্মীদের অভিযোগ রয়েছে। গত এক দশকে দলে ভিড়া ‘হাইব্রিড আওয়ামী লীগ’ নেতা-কর্মীরা যেমনি এ বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় তেমনি নেপথ্যে জোরালো ভুমিকা রয়েছে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াত-বিএনপি’র।
    যে নৌকা প্রতীকে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের দৃপ্ত শপথ এবং যে নৌকা প্রতীক নিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সফল লড়াকো রাজনৈতিক সংগ্রামে এগিয়ে চলা সেই ‘নৌকা’ই আজ ‘শকুনের’ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ভিতরে-বাইরে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠি ‘নৌকা’ প্রতীককে ক্রমশ ভোটারদের কাছে ‘অজনপ্রিয়’ করে তোলার কাজ করে চলেছে। আর তাদের নেপথ্যে শক্তি যোগাচ্ছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে পরিচিত নেতা-কর্মীরাও।
    কেবল মাত্র গত দু’দফায় দেশের এক প্রান্তের জেলা কক্সবাজারের ৬ টি উপজেলার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কালে এমন ঘটনাটি আঁচ করা গেছে। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির কাছে একদম সুকৌশলেই ‘নৌকা’ প্রতীককে ডুবিয়ে দিতে কাজ চলছে বলে বলা হচ্ছে। এমনকি ভোটের মাঠে ‘নৌকা’ ডুবাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ‘হাইব্রিড’রাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে বলে ব্যাপক বলাবলি রয়েছে। দলের ‘হাইব্রিড’ হিসাবে পরিচিত তৃণমূলের নেতাদের পেছনে শক্তি যোগাচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী বিরোধী রাজনীতিকরা।
    এমন অস্বস্থিকর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার প্রতি তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মকান্ড তদারকির জন্য সুদৃষ্টি কামনা করা হয়েছে। গত ১৮ মার্চ থেকে রবিবার পর্যন্ত দু’কর্ম দিবসে কক্সবাজার জেলার ৮ উপজেলার মধ্যে ৬ টি উপজেলায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্টিত হয়েছে। নির্বাচনে যার সবগুলোতেই হেরেছে নৌকা প্রতীকধারি প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তবে ‘নৌকা’ প্রতীকধারি প্রার্থীরা হারলেও যারা ভিন্ন প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন তারা সবাই আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা। তাই ভিন্ন প্রতীকের বিজয়ীদের নিয়ে সাময়িক সন্তুষ্টি রয়েছে। বাস্তবে তার নেপথ্যের কারণ খুঁজে বের করার তাগিদ উঠেছে।
    গত ১৮ মার্চ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্টিত হয়েছে। সেই নির্বাচনে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীকে নৌকা প্রতীক দিয়ে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছিল। নৌকা প্রতীকধারি প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন স্থানীয় এমপি জাফর আলম সহ উপজেলার ১৮ টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ। তারপরেও ২৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীর নিকট নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পরাজয় ঘটে। অপরদিকে বিজয়ী বিদ্রোহী প্রার্থী ফজলুল করিম সাঈদী ছিলেন ইসলামী ছাত্র শিবিরের একজন সক্রিয় নেতা। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমদ সিআইপি’র আপন খালাত ভাই ফজলুল করিম সাঈদী। সেই সুত্রে দলে ভিড়েন তিনি (সাঈদী)।
    অনুসন্ধানে জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ‘হাইব্রীড’ হিসাবে পরিচিতরা স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেপথ্য সহযোগিতায় নির্বাচনে ‘নৌকা’ বিরোধী একটি জোয়ারের সৃষ্টি করে। সেই সাথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দলীয় অন্তর্কোন্দলের জের ধরে এলাকার এমপি বিরোধী একটি অবস্থান নেয় তৃনমূলের নেতা-কর্মীরা। আবার এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানদের প্রতিপক্ষ যারা তারাও এমন সুযোগটিকে কাজে লাগাতে এগিয়ে আসে।
    আর সবগুলোকে একত্রিত করে জামায়াত-শিবিরের সাবেক ক্যাডারগন চকরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ‘নৌকা’ বিরোধী অবস্থানকে একটি সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যায়। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, জামায়াত-শিবির এবং বিএনপি’র অভ্যন্তরে ‘নৌকা’ প্রতীককে নানা কৌশলে একটি অজনপ্রিয় প্রতীক হিসাবে দাঁড় করাতে কাজ করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আর এরকম পরিকল্পনায় পা দিয়ে ‘হীন উদ্দেশ্য’ চরিতার্থ করতে মূখ্য ভুমিকা পালন করছে আওয়ামী লীগের ‘হাইব্রিড’রা।
    রবিবার অনুষ্টিত কক্সবাজারের ৫ টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। যেমনি কক্সবাজারের টেকনাফে নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী যুবলীগের টেকনাফ উপজেলা সভাপতি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি নুরুল আলম। রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজল বিজয়ী হয়েছেন ‘নৌকা’ প্রতীকধারি প্রার্থী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রিয়াজ উল আলমের বিরুদ্ধে।
    মহেশখালী দ্বীপ উপজেলায় নৌকা প্রতীকধারি শহীদ পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ হোছাইন ইব্রাহিমকে পরাজিত করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ শরীফ বাদশা। পেকুয়া উপজেলায় স্থানীয় উপজেলা যুবলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে বিজয়ী হয়েছেন নৌকা প্রতীকের আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাসেমকে পরাজিত করে।
    অন্যদিকে উখিয়া উপজেলায় স্বতন্ত্র এবং বিদ্রোহী প্রার্থীরা সবাই মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করার কারনে নৌকা প্রতীকের আওয়ামী লীগ নেতা বিজয়ী হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উখিয়ার একজন বিএনপি নেতা বলেন-‘ আমরা উখিয়ার একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে টার্গেট করে রেখেছিলাম। তিনি প্রত্যাহার করে না নিলে আমরা ‘নৌকা’ প্রতীককে পরাজিত করতে মাঠে প্রকাশ্যে কাজ করতাম।’ উখিয়ার বিএনপি নেতার কথা থেকেই ষ্পষ্ট বুঝা যায়, নৌকা প্রতীকধারিকেই কেবল ধরাশায়ি করতে সবাই একাট্টা। যেন নৌকা প্রতীকটি এক অলুক্ষণে প্রতীক হিসাবে দাঁড় করানো যায়-সেটাই এসব আওয়ামী বিরোধীদের উদ্দেশ্য।
    রবিবার অনুষ্টিত কক্সবাজারের ৫ টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কেবল মাত্র ‘নৌকা’ প্রতীককে পরাজয় করার জন্য যেসব কর্মকান্ড ঘটেছে তাও রিতীমত উদ্বেগজনক। মাওলানা নুরুল হাকিম নামের জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতা হয়েও দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের রামু উপজেলা পরিষদ মসজিদের ইমাম হিসাবে চাকুরি করছেন। রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের ফাক্রিকাটা গ্রামের বাসন্দা তিনি। রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ফয়জুল হাসান জানান, মাওলানা নুরুল হাকিম জামায়াতে ইসলামী একজন রুকন পর্যায়ের নেতা।
    অপরদিকে রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামশুল আলম মন্ডল জানতে চান- জামায়াত নেতা এই মাওলানা উপজেলা পরিষদ পরিচালিত একটি মসজিদে বিগত এক যুগ ধরে কিভাবে চাকুরি করেন ? কার ইঙ্গিতে তিনি এখানে চাকুরি করছেন ? অভিযোগ উঠেছে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মাওলানা নুরুল হাকিম কচ্ছপিয়ার ফয়জুল উলুম মাদ্রাসায় এক গোপন সভায় ‘নৌকা’ প্রতীকের ভোটে যোগ না দিতে নির্দ্দেশনা দেন।
    নৌকা প্রতীককে তৃণমূলে বিতর্কিত করার জন্যও নানা ভাবে অপকৌশল চালানোরও অভিযোগ উঠেছে। যেমনি ভাবে এলাকায় ছড়ানো হচ্ছে-একজন জনপ্রিয় নেতাও যদি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন তাহলে কিন্তু খবর আছে। যেন নৌকা বাদ দিয়ে নির্বাচনে লড়লে অবশ্যই তিনি বিজয়ী হতেন বিষয়টিকে এমনভাবেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে অপপ্রচার হিসাবে চালানো হচ্ছে। সেই সাথে নৌকার প্রতিপক্ষ বিদ্রোহী প্রার্থীরা ভোটে বিএনপি-জামায়াতের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে নৌকার প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতেও পিছপা হননি। এমনকি
    এসব বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন-‘ নৌকা প্রতীক নিয়ে এরকম আলোচিত ঘটনাটির ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি। আমাদের দলে অনুপ্রবেশকারি কিছু লোক এজাতীয় ঘটনায় জড়িত থাকারও অভিযোগ আছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারি মহেশখালী দ্বীপের একজন আমাদের দলীয় নেতার ব্যাপারে এমন অভিযোগ সর্ম্পকেও আমি জেনেছি।’ তিনি বলেন, নৌকা বিরোধীতার ব্যাপারে আরো অনেক কথা আছে যা তাদের দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয়।
    কক্সবাজার জেলা শহরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ এম,এম সিরাজুল ইসলাম এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন-‘নৌকা বাঙ্গালী জাতির প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা হচ্ছে এই নৌকা। তাই এটিকে (নৌকা) একটি অপয়া প্রতীক বানানোর হীন ষড়যন্ত্র চলছে।’ তিনি বলেন, নৌকা দীর্ঘকাল ধরে এদেশের নির্বাচনী মাঠে একটি জনপ্রিয় প্রতীক হিসাবে মানুষের কাছে গেঁথে রয়েছে। এই প্রতীক যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির নিকট অপছন্দ করে তোলা যায় সেই হীন উদ্দেশ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধীরা। আর তাদের সামনের কাতারে রয়েছেন আওয়ামী লীগে নুপ্রবেশকারি ‘হাইব্রিডরা।’

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ