• শিরোনাম

    দরপত্র প্রক্রিয়া মার্চে : তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ মেগাপ্রকল্প : পাইপলাইনে জ্বালানি তেল যাবে ঢাকায় : পরিকল্পনার রূপকার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল

    মাতারবাড়ী ঘিরে মহাবন্দর

    দেশবিদেশ অনলাইন ডেস্ক | ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

    মাতারবাড়ী ঘিরে মহাবন্দর

    কক্সবাজারের মহেশখালী মাতারবাড়ী এক সময় ছিল অচেনা অবহেলিত এক দ্বীপ জনপদ। সেই মাতারবাড়ী নামটি আজ জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতের নামীদামী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছে পৌঁছে গেছে। মাতারবাড়ীকে ঘিরে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক এক মহাবন্দর। ইতোমধ্যে সেখানে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল স্থাপন করা হয়েছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পাইপলাইনে পুরোদমে দৈনিক ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে চট্টগ্রাম ও ঢাকায়। চট্টগ্রামে ৩শ’ থেকে ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট রেখে বাদবাকি গ্যাস যাচ্ছে ঢাকায়। আরও বাড়বে এলএনজি আমদানি।
    তাছাড়া আমদানি করা জ্বালানি তেল খালাসের জন্য এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে। মহেশখালী ও চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরাসরি সরবরাহ হবে ঢাকায়। এরফলে লাইটার জাহাজ-ট্যাংকারে তেল পরিবহনে যে সিস্টেম লস, রিভার লস, চুরি ও অপচয় ঘটছে তা কার্যকরভাবেই রোধ করা যাবে। তেল-গ্যাস ছাড়াও কয়লাভিত্তিক পরিবেশবান্ধব একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে মাতারবাড়ী গড়ে উঠছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এনার্জি হাব হিসেবে।
    বঙ্গোপসাগর ঘেরা অপরূপ নিসর্গ ও অফুরান প্রাকৃতিক-খনিজ সম্পদের আধার কক্সবাজারকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন-পরিকল্পনা ছিল অনেক। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক-নির্দেশনায় কক্সবাজার-মাতারবাড়ী ঘিরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জ্বালানিকেন্দ্র (এনার্জি হাব), মহাবন্দর ও একাধিক অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠায় স্বপ্নীল পরিকল্পনা গ্রহণ করেন বিগত মহাজোট সরকারের সফল পরিকল্পনা মন্ত্রী ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি। তীক্ষ্ন মেধা-মনন আর বিচক্ষণতা দিয়ে সুনিপূণ শিল্পীর মতো নিবিড় এই পরিকল্পনা। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের অর্থমন্ত্রী কক্সবাজারের মেগাপ্রকল্প ও মাঝারি প্রকল্পগুলোর বাস্তব রূপায়ন করছেন।
    মহেশখালীর আরও কিছু এলাকায় এবং পার্শ্ববর্তী কুতুবদিয়া-পেকুয়া উপজেলায়ও সম্প্রসারিত হবে এনার্জি হাব। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ হওয়ার সুবাদে সেখানে গড়ে উঠবে বিশেষায়িত শিল্পজোন। এসব প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে অন্তত এক লাখ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ এনার্জি হাব স্থাপনে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে বিভিন্ন দেশের নামকরা কোম্পানি।
    একের পর এক দুই ডজন মেগাপ্রকল্প ও মাঝারি প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে অবকাঠামো সুবিধা উন্নয়ন যে ধারায় চলছে তাতে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই বদলে যাচ্ছে কক্সবাজার। দেশী-বিদেশী পর্যটক ও বিনিয়োগকারী আকর্ষণের লক্ষ্যে সরকার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতসমৃদ্ধ কক্সবাজারকে ঢেলে সাজানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পুরোদমে। যা নিছক কাগুজে নয়, বাস্তবে দৃশ্যমান।
    ‘দি বিগ-বি’ অর্থাৎ ‘বে অব বেঙ্গল গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল’ পরিকল্পনার আওতায় কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভূ-প্রাকৃতিক সুবিধাজনক অবস্থানকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) নিবিড় গবেষণা, কারিগরি সমীক্ষা, আর্থিক সহায়তা এবং একগুচ্ছ পরিকল্পনার আলোকে মাতারবাড়ীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মকান্ড এগিয়ে চলেছে।
    গভীর সমুদ্রবন্দর
    মহেশখালীর সোনাদিয়া উপদ্বীপে বহুল প্রত্যাশিত গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন প্রকল্প নানা কারণে ভেস্তে যায়। এখন নতুন আশার আলো জেগেছে মাতারবাড়ী আধুনিক গভীর মহাবন্দরকে ঘিরে। এটি হবে বহুমুখী সুবিধাসম্পন্ন সমুদ্রবন্দর। সেখানে নির্মাণাধীন জ্বালানিকেন্দ্র এবং বঙ্গোপসাগরের সাথে লাগোয়া ১ হাজার ২২৫ একর ভূমিতে স্থাপন করা হবে মহাবন্দর। জাপানের সহজশর্তে ঋণ সহায়তায় প্রথম ধাপে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে সমুদ্রবন্দর নির্মাণে। এই মেগাপ্রকল্প সরকারের অনুমোদন লাভের পর গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ভূমির সীমানা নির্ধারণ ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
    চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প দেখভাল করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী মার্চ মাসে দরপত্র সম্পন্ন হবে। বিশেষজ্ঞগণ আশাবাদী, পরিকল্পনামাফিক কাজ এগিয়ে গেলে আগামী ২০২১ সালে জেটি-বার্থ নির্মাণ এবং ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ার উপযোগী নয় তেমন বড় আকারের কন্টেইনার জাহাজ ভিড়বে। সেখানে ১৬ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। জাইকা মাতারবাড়ীতে জ্বালানি হাব গড়ে তোলার বিষয়ে গবেষণা ও সমীক্ষা চালাতে গিয়েই সেখানে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের প্রাকৃতিক সম্ভাবনা উদ্ঘাটন করে।
    বিভিন্ন খাতের প্রকল্পের হাত ধরে কক্সবাজার দেশের পূর্ণাঙ্গ এবং বিশ্বমানের পর্যটন নগরীতে উন্নীত হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ার মতো পর্যটন খাত থেকেই জাতীয় অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সোয়া এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে। সেখানে সুপরিসর বিমান ওঠানামা করছে। শেখ কামাল আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স, সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট, মেডিকেল কলেজসহ কক্সবাজারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ।
    পাইপলাইনে তেল সরবরাহ
    সড়ক ও নৌপথে অপচয়, চুরি-অনিয়ম, যানজট সমস্যা এড়ানো ও পরিবহন ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে সরাসরি ঢাকায় পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। মাতারবাড়ী এসপিএম এবং পতেঙ্গা হয়ে চট্টগ্রাম-ঢাকা গ্রিডলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। শিল্প-কারখানা, কৃষি-খামার, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নগরায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, গৃহস্থালীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, জেটফুয়েল, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল প্রভৃতি জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে সরকার জ্বালানি তেল সরবরাহ পদ্ধতি আরো দ্রুতায়িত এবং আধুনিকায়ন করছে। সাব-মেরিন ও ঢাকা-চট্টগ্রাম জ্বালানি তেলের পাইপলাইন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন কাজ চলছে।
    জাহাজ থেকে সরাসরি পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাস করে চট্টগ্রামে পরিবহনের জন্য মাতারবাড়ী ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-ঢাকা পর্যন্ত পাইপ লাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহে ‘পাইপলাইন ফর ট্রান্সপোর্টেশন অব হোয়াইট পেট্টোলিয়াম অয়েল ফ্রম চিটাগাং’ প্রকল্প এবং হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর সংলগ্ন কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল পরিবহন ও মজুদের লক্ষ্যে ‘জেট-এ-১ পাইপলাইন ফ্রম কাঞ্চন ব্রিজ, পিতলগঞ্জ টু কেএডি ডিপো, ঢাকা ইনক্লুডিং স্টোরেজ ট্যাংক’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ চলছে। চট্টগ্রামের তেল ডিপো সংযুক্ত করতে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন তৈরি হচ্ছে। এসপিএম উইথ ডাবল পাইপ লাইন প্রকল্পে অর্থায়নে চীনা এক্সিম ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে চুক্তি অনুসারে, এসপিএম প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন হবে ৫৫৪ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার।
    বর্তমানে লাইটারিং ব্যবস্থায় একটি এক লাখ টনের জাহাজ (ট্যাংকার) থেকে তেল খালাস করতে ১১ থেকে ১৬ দিন সময় লেগে যায়। টার্মিনাল নির্মিত হলে সময় লাগবে মাত্র ২ দিন। সিঙ্গেল মুরিং হলে ৪৮ ঘণ্টায় এক লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত এবং ২৮ ঘণ্টায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল খালাস করা যাবে। এতে বার্ষিক খালাসের ক্ষমতা দাঁড়াবে ৯০ লাখ মেট্রিক টন। দেশে এখন জ্বালানি তেলের চাহিদা বার্ষিক ৬৫ লাখ মেট্রিক টন।
    দেশবিদেশ /নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ