শুক্রবার ২৮শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

‘আগে পরকিয়া গইত্তাম, এহন ন গরি’

দীপক শর্মা দীপু   |   বৃহস্পতিবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২২

‘আগে পরকিয়া গইত্তাম, এহন ন গরি’

“আঁই মিছা হতা ন-হইয়োম। আগে পরকিয়া গইত্তাম, এহন ন গরি। ওয়ার্ল্ড ভিশন আঁরার অঙ্গে বউ-জামাইয়ের মিটিং গরে। বউ-জামাইয়ের মিটিং গরিবার পর অইতে আঁই পরকিয়া ছারি দিই। এহন পিরিতি চলে বউয়োর পোয়ারে। এহন দুইজনে মহব্বতে ঘর সংসার সুন্দর অইয়ে।” (এর অর্থ হচ্ছে ‘আমি মিথ্যা বলবোনা। আগে পরকিয়া করতাম,এখন করিনা। ওয়ার্ল্ড ভিশন আমাদের সাথে বউ-জামাইয়ের সভা করে। বউ-জামাইয়ের  সভা করার পর থেকে পরকিয়া ছেড়ে দিই। এখন প্রেম করি বউয়ের সাথে। এখন দুইজনের ভালবাসার কারণে ঘর সংসারও সুন্দর হয়েছে।) এমন কথাগুলো বলেন,  উখিয়ার পালংখালি ইউনিয়নের তেলখোলা গ্রামের চকিদার পাড়ার আলী মিয়ার পুত্র আলমগীর (ছদ্মমনাম)। তার কথার রেশ ধরে তার স্ত্রী হাবিবা খাতুন (ছদ্মনাম) বলেন,  আগে আমার স্বামী খুবই মারধর করতো, গালিগালাজ করতো। আমাকে সহ্য করতে পারতোনা। তার মারধর সহ্য করতে না পেরে চারবার বাপের বাড়ি চলে যাই। ওয়ার্ল্ড ভিশন স্বামী স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ম্যান কেয়ার মিটিং করার পর আমার স্বামী আমার প্রতি ও সংসারের প্রতি মনোযোগ দেয়। এখন আমার প্রতি দরদি হয়েছে আমার স্বামী। আল্লাহ দিলে এখন আমাদের ঘরে কোন ঝগড়া নেই। আমরা দুই জনে মিলে ঘরের রান্না-বান্নাসহ সংসারের কাজ করি আর বাইরে ক্ষেত খামারের কাজ করি। দুইজনে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করে সংসার ভালোভাবেই চালিয়ে যাচ্ছি।’ এই দুই জামাই বউয়ের সাথে কথা বলে আরো জানা যায়, তাদের ঘরে বউ-জামাইয়ের মধ্যে অশান্তির কারণে সংসারে অভাব সৃষ্টি হয়, সন্তানদের দেখভাল করা হতোনা, এমন কি পড়া লেখা বন্ধ হয়ে যায়। এমন সময় ওয়ার্ল্ড ভিশন বউ জামাইকে নিয়ে ‘পুরুষ সম্পৃক্তকরণ’ প্রকল্পে  সম্পৃক্ত হয় এই স্বামী-স্ত্রী। তারা এই প্রকল্পের ৫ টি বিষয়ের উপর সেশন করেন।  ৫ বিষয়ে সফলভাবে শেষ করার পর তাদের গ্রেজুয়েশন দেয়া হয়। হাঁস মুরগী পালনের জন্য ১৫ হাজার টাকা দেয়া হয় এবং কাজের বিনিময়ে ৯ মাসে মজুরি দেয়া হয় ৫০ হাজার ৪০০ টাকা। তারা ১৫ হাজার টাকা দিয়ে হাঁস-মুরগী পালন করে  প্রচুর লাভবান হয়। এই লাভের টাকা দিয়ে পানের বরজ, ক্ষেত খামার করে। এখান থেকে লাভ করে এখন তাদের কাছে ৮৫ হাজার টাকা জমা আছে। বড় মেয়ে ইসমত আরাকে এক হাজার টাকা খরচ করে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেয়। আবছার মিয়া ও সাইফুল ইসলাম এই দুই ছেলেকে শিশুশ্রম থেকে নিয়ে এসে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়।

একই এলাকা আরেক দম্পতি জামাল উদ্দিন ও দিল আফরোজা। দিল আফরোজা বলেন, তার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর তার মা তাকে বলেছে জামাই মারধর করবে, গালমন্দ করবে তা সহ্য করতে হবে। জামাইয়ের মারধর সহ্য করে সংসার করতে হবে। এমন কথা শুনার পর সেও মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে স্বামীর সংসারে এমন কিছু সহ্য করে সংসার করবে। কিন্তু তার বিয়ের পর সে দেখতে পাই তার স্বামী তার সাথে কোন খারাপ আচরণ করছেনা। তার কারণ হচ্ছে স্বামী কামাল উদ্দিন একজন গ্রাম পুলিশ। সে ওয়ার্ল্ড ভিশনের জামাই –বউ কিভাবে ভালো থাকবে তা জেনেছে। তা ছাড়া সরকারি বেসরকারিভাবে নানান সচেতনতানমুলক কর্মসূচিতে সে অংশগ্রহণ করে। তাই সে বিয়ের পর থেকে বউয়ের সাথে ভালো আচরণ করেন। বউ নিয়ে সে নিয়মিত ওয়ার্ল্ড ভিশনের ‘পুরুষ সম্পৃক্তকরণ’ কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করে। এখন তারা দুইজন মিলে নিজেদের সংসার উন্নত করতে একসাথে কাজ করছেন। শুধু তাই নয়, এলাকায় বাল্য বিবাহ তারা বন্ধ করে দিয়েছেন।  বন্ধ করেছেন নারী নির্যাতন। । ১৫ বছর বয়সী এক ছেলের সাথে ২১ বছর এক মহিলার বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা জানে নারী নির্যাতন হলে ১০৯ নাম্বারে ফোন করতে হয়, বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে এবং কোন বিপদ হলে ৯৯৯ এ ফোন করতে হয়। এসব শিক্ষা তারা পেয়েছেন ওয়ার্ল্ড ভিশনের পুরুষ সম্পৃক্তরণ প্রকল্পের নির্ধারিত নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, বাল্য বিবাহ রোধ, ক্ষমতায়ন, নারীদের সাথে পুরুষদের সম্পৃক্তকরণ, দ্বন্ধ নিরসন বিষয় থেকে। জামাল বলেন, ‘‘আমি নিজে কলসী নিয়ে বউকে পানি এনে দিই। থালাবাসন ধুয়ে দিই। বউ যখন রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকি তখন শিশু সন্তানদের দেখভাল করি। সন্তানদের খাবার খাওয়ানো, গোসল করাসহ সব ধরনের যত্ন নিই।’’ তার স্ত্রী মনোয়ারা বলেন, “আগে ঘরে আর্থিক টানাপোড়ন ছিল। এখন দুইজনে মিলে একে অপরের কাজের সাহায্য করে সব কাজ করি। ওয়ার্ল্ড ভিশনের দেয়া ১৫ হাজার টাকার মুরগী পালন থেকে লাভ হলে গরু, ছাগল পালন করা হয়। লাখ টাকা খরচ করে ননদকে বিয়ে দেয়া হয়।”

“যে সংসারের বউ জামাইয়ের মধ্যে মিল থাকে এই সংসার সুখের হয়। পাশাপাশি সমাজের নানা অসংগতি দূর করে সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়।” এমন কথাগুলো বলেন, উখিয়া জালিয়াপালং ইউনিয়নে সোনাইছরি গ্রামের দম্পতি আবদুল রশিদ ও হাসিনা বেগম, উখিয়া পালংখালির হাকিমপাড়ার দম্পতি ফাতেমা বেগম ও কামাল উদ্দিন, উখিয়া রাজাপালং  ইউনিয়নের রুদ্র পাড়ার দম্পতি রবি রুদ্র ও দীপ্তি রুদ্র। এভাবে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ উপজেলার ৫ ইউনিয়নের ৪ হাজার জামাই-বউ মিলে মিশে ভালোবাসার সুখের সংসার করছে। আর এমন মহৎ কাজটির সেতুবন্ধন করেছে  ইউএসএআইডি’র অর্থ সহায়তায় ওয়ার্ল্ড ভিশনের ‘ইমার্জসেন্সি ফুড সিকিউরিটি’ প্রোগ্রাম।

ওয়ার্ল্ড ভিশনের জিবিভি প্রিভেন্টশন অফিসার কে.এম. মুজিবুল আলম জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছাড়া ইউনিয়ন, হ্নীলা ইউনিয়ন, উখিয়া উপজেলার পালংখালি ইউনিয়ন, জালিয়াপালং ইউনিয়ন ও রাজাপালং ইউনিয়ন নিয়ে ওয়ার্ল্ড ভিশনের ‘ইমার্জসেন্সি ফুড সিকিউরিটি’ প্রকল্প কাজ করছে। ২০১৯ সালের সেপ্টম্বরে শুরু হওয়া এই প্রকল্প কাজ করবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই সময়ে মধ্যে ২০০ গ্রুপের ২ হাজার বউ ও ২ হাজার জামাই ৬ টি সেশন সম্পন্ন করবে। এর মধ্যে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, বাল্য বিবাহ রোধ, ক্ষমতায়ন, নারীদের কাজে পুরুষ সম্পৃক্তকরণ, দন্ধ নিরসন সেশন সফল হলে গ্রেজুয়েশন সেশনে সম্বর্ধিত করা হয় জামাই-বউকে।

পালংখালি ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের মেম্বার কামাল উদ্দিন জানান, এই ইউনিয়নের তেলখোলা গ্রাম এখনো অবহেলিত। এখানে বিদ্যুৎ নেই, নেটওয়ার্ক নেই। শিক্ষার হার সবচেয়ে কম। প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো উন্নয়নের তেমন ছোঁয়া লাগেনি। এই অবস্থায় ওয়ার্ল্ড ভিশন একটি মহৎ কাজ করছে। যার কারণে অনগ্রসর এই এলাকার স্বামী- স্ত্রী সচেতন হচ্ছে। পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ভিশনের দেয়া কাজের বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার কারণে রাস্তাঘাট উন্নয়ন হচ্ছে। অন্যদিকে হাঁস-মুরগি পালনের জন্য টাকা পেয়ে তাদের জীবিকার মান উন্নয়ন হওয়ার কারণে এখন এলাকাটিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

পালংখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন জানান, ওয়ার্ল্ড ভিশনের এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে এখন স্বামী – স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ কমেছে। তাদের মধ্যে সোহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আগে প্রতি নিয়ত পরকিয়া, গোপনে ২য় বিবাহ, বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতনের অভিযোগ বেশি পাওয়া যেত। এখন সে এলাকায় ওয়ার্ল্ড ভিশনের এই প্রোগাম চালু রয়েছে সেখান থেকে তেমন কোন অভিযোগ পাওয়া যায়না।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন আহমদ জানান, ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মসূচি বেশিরভাগ দৃশ্যমান। স্বামী স্ত্রীকে নিয়ে যে সচেতনতামুলক কর্মসূচি তাতে পরিবার ও সমাজের শান্তি বজায় থাকবে।

Comments

comments

Posted ৬:৩০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২২

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

প্রকাশক
তাহা ইয়াহিয়া
সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
01870-646060
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com