• শিরোনাম

    মাতামুহুরীর দু’কুল ভেঙ্গে বিলীন হচ্ছে জমি-মসজিদ-মন্দির-মাদ্রাসা-বসতি

    আতঙ্কে হাজারো পরিবার

    মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া: | ২৮ জুন ২০১৮ | ১১:২৯ অপরাহ্ণ

    আতঙ্কে হাজারো পরিবার

    ‘একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে এইতো নদীর খেলা, এই ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ’ অবস্থা চকরিয়ায়। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদমস্থ মায়ানমার সীমান্ত থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা পর্যন্ত ১২৯ মাইল দীর্ঘ মাতামুহুরী নদীর চকরিয়া অংশে প্রতি বর্ষায় চলে ভাঙ্গা-গড়ার খেলা। পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে পাহাড় কাটাসহ বনজ সম্পদ উজাড় করে গাছগাছালির গুড়ালি তুলে ফেলায় বৃষ্টির পানির সাথে মাটি ভেসে এসে মাতামুহুরী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করে বর্ষায়। পাহাড়ি ঢলের পানি কমার সাথে সাথে ভাঙ্গনের তান্ডব শুরু হয়। এই ভাঙ্গন থেকে আবাদি জমি ছাড়াও ঘর-বাড়ি, স্কুল-মাদ্রাসা, হাট-বাজার, মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডা-মাজার, থানা-হাসপাতালসহ বিলীন হয়েছে বেশুমার স্থাপনা। এই নদীর ভরাট চর ড্রেজিং না করায় এবং তীর রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ায় স্বাধীনতার পর থেকে অধ্যাবদি অব্যাহত রয়েছে ভাঙ্গন। ৪৮ বছরে অন্তত ৩০ হাজারের বেশি বসতি বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিমত। ভাঙ্গনের মুখে পড়ায় চকরিয়া থানা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বাঁশঘাট থেকে স্থানান্তর করতে হয়েছে। মানিকপুর ও পুরাতন চিরিংগা বাজার প্রায় অর্ধেক নদীতে বিলীন হয়েছে। নিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে মামা-ভাগিনার মাজার। ঝুঁকিতে রয়েছে কাকারা উচ্চ বিদ্যালয়। মানিকপুরের ঐতিহাসিক কিউক প্রতিষ্টিত মসজিদ। বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, সাহারবিল, ফাঁসিয়াখালী, কোণাখালী, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর ও পৌরসভার বিশাল অংশ ইতিপূর্বে বিলীন হয়েছে। এসব এলাকার কয়েক হাজার পরিবার এখনো ভাঙ্গন ঝুঁকিতে। পাহাড়ি ঢল নামলেই আতংক ভর করে নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের মাঝে। লক্ষ্যারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তাফা কাইছার জানান, তার ইউনিয়নে মাতামুহুরী নদীর তীর এলাকায় প্রায় ৬হাজার মানুষের বসবাস। নদী ভাঙ্গনের ফলে ইউনিয়নের বেশিরভাগ জনগনের মাঝে বিরাজ করছে চরম আতংক। শুস্ক মৌসুম যেমন তেমন, বর্ষাকালে বেড়ে যায় আতঙ্কের মাত্রা। ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে বর্ষাকালে যে কোন সময় নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে এলাকার ফসলী জমি, খতিবে আজমসহ বেশ ক’টি সড়ক, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিম খানাসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কৈয়ারবিল ইউপি চেয়ারম্যান মক্কী ইকবাল হোসেন জানান, প্রতিবছর বর্ষাকালে মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারনে কৈয়ারবিল ইউনিয়নে নদীর তীর এলাকার বিপুল জনবসতি ভাঙ্গনের কবলে পড়ে নদীতে বিলীন হচ্ছে। এবছরও বর্ষাকালের শুরুতে কয়েকদফা বন্যায় তার ইউনিয়নের দক্ষিন খিলছাদক এলাকার লামারপাড়া ও মন্ডলপাড়া গ্রামে ব্যাপক ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কটি বসতবাড়ি ও আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কয়েকবছরের মধ্যে কৈয়ারবিল ইউনিয়নের আয়তন ছোট হয়ে যাবে। এতে এলাকার অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে। চকরিয়া পৌরসভার মেয়র মো.আলমগীর চৌধুরী জানান, চলতি মৌসুমের বর্ষার শুরুতে পৌরসভার বিভিন্ন জনপদে বিশেষ করে মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক নদী ভাঙ্গনের শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে পৌরসভার ৮নম্বর ওয়ার্ডের কোচপাড়া পয়েন্টের বিশাল এলাকা নদীতে তলিয়ে গেছে। অন্তত ১০-১২টি বসতঘর এবারের বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো কোচপাড়া, নামার চিরিঙ্গা, মজিদিয়া মাদরাসা ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুনিয়া দিগরপানখালী পয়েন্টে নদীতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম অবস্থায় রয়েছে শতাধিক বসতঘর, দোকানপাট ও মসজিদ মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। তিনি বলেন, ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের ছাবেতপাড়া, চরপাড়া, কাজীরপাড়া, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তরছঘাটা, জলদাশপাড়া ও বাটাখালী সেতুর দুই পাশের চারটি গ্রামের অন্তত দুই শতাধিক বসতঘর। উপজেলার কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত ওসমান বলেন, মাতামুহুরী নদী সৃষ্টির পর থেকে কাকারাবাসি ভাঙ্গনের তান্ডবের সম্মুখীন। ইতোমধ্যে নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ইউনিয়নের হাজারো বসতি বিলীন হয়ে গেছে। তিনি আরো জানান, অতীতের মতো এবছর বর্ষার শুরুতে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার তান্ডবে নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে ইউনিয়নের মাঝেরফাড়ি, ইউনিয়ন পরিষদের সামনের এলাকা, কামাল উদ্দিন মাস্টারের ঘাটা, রুদ্রপাড়াসহ আশপাশ এলাকার বিপুল জনবসতি। এমনকি ভাঙ্গনে বিলীন হতে উপক্রম হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান ভবনটি। জানা গেছে, ১৯৯১সালে প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের পর নদীর তলা অত্যাধিক ভরাট হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি দু’কুল উপচিয়ে পাড়া-গাঁয়ে প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি মাতামুহুরী নদীতে ভাঙ্গনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এখনো প্রতিবছর বর্ষাকালে নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের প্রবল স্্েরাতের টানে অব্যাহত রয়েছে নদী ভাঙ্গনের ভয়াবহতা। এই ভয়াবহতার কবলে পড়ে গেল দুই দশকে উপজেলা ও পৌরসভা এলাকার প্রায় ১০হাজার পরিবার ভিটেবাড়ি হারিয়ে গৃহহারা হয়েছে। সরেজমিনে জানা গেছে, বর্তমানে চকরিয়া উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের বাটাখালী নাপিতের টোড়া ও উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কৈয়ারবিল, বিএমচর, বরইতলী, পুর্ববড় ভেওলা ইউনিয়নের আনিছপাড়া, বেতুয়াবাজার সেতু পয়েন্ট, সমসু মিয়ার হাটস্থ জলদাশপাড়া পয়েন্ট, কোণাখালী ইউনিয়নের কন্যারকুম, বাংলা বাজার, সিকদাপাড়া পয়েন্ট ও চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগর, বুড়িপুকুর পয়েন্টে সহ একাধিক জনপদ ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের চকরিয়া শাখার কর্মকর্তা (এসও) তারেক বিন সগীর সাংবাদিকদের জানান, মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধে পাউবো ইতোমধ্যে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছেন। বিশেষ করে নদীর ঝুঁিকপুর্ণ পয়েন্টে বসানো হচ্ছে সিসি বক্লদ্বারা টেকসই স্পার। তিনি আরো জানান, নতুন করে যেসব এলাকায় নদীর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে তা সনাক্ত করে সমীক্ষার মাধ্যমে অর্থ বরাদ্ধের জন্য উধর্বতন দপ্তরে সারসংক্ষেপ পাঠানো হবে। অর্থ বরাদ্ধ প্রাপ্তি সাপেক্ষে উপজেলার সবখানে ভাঙ্গন প্রতিরোধে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

    দেশবিদেশ/ ২৮ জুন ২০১৮/ নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ