• শিরোনাম

    আমদানীতেই শেষ লবণ চাষ

    দেশবিদেশ রিপোর্ট | ০৫ মার্চ ২০২০ | ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

    আমদানীতেই শেষ লবণ চাষ

    আজ বৃহষ্পতিবার বিকালে কক্সবাজার জেলা শহরের পাবলিক হল মাঠে (শহীদ দৌলত মাঠ) লবণ চাষীদের এক সমাবেশ অনুষ্টিত হবে। লবণ চাষীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, লবণের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও সোডিয়াম সালফেডের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানী নিষিদ্ধ করণ, সরকারিভাবে চাষীদের কাছ থেকে ন্যায্য মুল্যে লবণ ক্রয়সহ ইত্যাদি যৌক্তিক দাবীতে বিশাল লবণ চাষী সমাবেশের ডাক দিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। উক্ত লবণ চাষী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এমপি ও বিশেষ অতিথি হিসাবে শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার এমপি এতে উপস্থিত থাকবনে।
    এতে বক্তব্য রাখবেন জেলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় সংসদ সদস্যগণ ও লবণ চাষী নেতৃবৃন্দ। সমাবেশে কক্সবাজারের সকল লবণচাষী ও সর্বস্তরের জনগণকে যথাসময়ে দলে দলে মিছিলে মিছিলে যোগদান করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা ও সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিবুর রহমান।
    গতরাত সাড়ে ৯ টার সময় মহেশখালী দ্বীপের হোয়ানক পানিরছড়া বাজারে কক্সবাজার জেলা শহরের আজকের এমন লবণ চাষীদের সমাবেশের মাইকিং করা হচ্ছিল। এতে আহŸান জানানো হচ্ছিল লবণ চাষীদের উক্ত সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য। এ সময় আজকের দেশবিদেশ অফিস থেকে এ প্রতিবেদকের সাথে মোবাইলে আলাপ হচ্ছিল স্থানীয় সলিমুল্লাহ নামের একজন লবণ চাষীর সাথে। লবণ চাষী সলিমুল্লাহ মাইকিং শুনে অনেকটাই বিরক্ত হয়ে বললেন-‘দেখুন গতকাল বুধবার কুয়াশার জন্য এক কেজি লবণও মাঠে উৎপাদিত হয়নি। বিক্রিও হয়নি। হাতে টাকা-পয়সাও নেই। চার একর জমির চাষে চারজন মজুর রয়েছে। তারাও মজুরির টাকা পাবে। কিন্তু দিতে পারছি না। এ অবস্থায় কক্সবাজারে সমাবেশে আসা-যাওয়ায় খরচ হবে এক হাজার টাকা। এই টাকা কোথায় পাব ? কিন্তু যাওয়াও দরকার।’
    লবণ চাষী সলিমুল্লাহ বলেন, প্রতি কানিতে ৩৫ হাজার টাকা দরে মাঠ নিয়েছি চাষ করার জন্য। মজুর নিয়েছি জনপ্রতি ৭৫ হাজার টাকা করে। তাদের খাবার দাবারের খরচ ২৫ টাকা। কানি প্রতি পলিথিন খরচ হয় ৫ হাজার টাকা। পানি তোলার মেশিন ও তেল খরচ হয় কানিতে ৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ কানিতে খরচ হয় দুই লাখ করে। হোয়ানকের আইনুর ঘোনার এই হতভাগা চাষ আরো বলেন, এ পর্যন্ত কানি প্রতি লবণ উঠেছে মাত্র ৫৫ মণ। আকাশের অবস্থাও তেমন ভাল মনে করছি না। যে কোন সময় এবার বর্ষণও শুরু হতে পারে। যদি বর্ষণ শুরু হয় তাহলে আমি অভাগার অবস্থা কি হবে সেটা আমি ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না।
    লবণ চাষী সলিমুল্লাহর এমন দুঃখের বিবরণের যেন শেষ নেই। মা-বাবা, স্ত্রী তিন মেয়ে সহ ৭ জনের সংসার তার। মা এবং স্ত্রীর স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে আগাম লবণ চাষের জমি নিয়েছেন। সেই জমি নেয়ার পর তার আতœীয় স্বজনের স্বর্ণ নিয়ে ইতি মধ্যে আরো দেড়-দুই লাখ টাকা বন্ধকী টাকা নিয়েছেন। এমন অবস্থা তার লবণ চাষের জীবনেও হয়নি উল্লেখ করে সলিমুল্লাহ বলেন-‘অবস্থা এখন এরকমই হয়েছে যে, লবণের দাম না থাকায় আতœীয় স্বজনও ফিরে তাকাচ্ছেন না। সবাই মনে করছে তাদেরও স্বর্ণ-পাতি যাই আছে তা বন্ধকের জন্য ধার চাইব। আমরা যারা লবণ চাষী তাদের সবার দৈনন্দিন জীবন এরকমই। যেন এক দুর্বিষহ জীবন আমরা কাটাচ্ছি। আমদানীকারকরা আমাদের নিঃশ্বেষ করে দিয়েছে। কেবল আমরা নই গোটা দেশই শেষ করে দিয়েছে ওরা।’
    চাষীরা জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ে এখন প্রতি মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৫০/১৬০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে ৪ টাকা। তাও ক্রেতারা ৪০ কেজিতে এক মণের জায়গায় কিনে নিচ্ছে ৫৫ কেজিতে এক মণ হিসাবে। অপরদিকে মাঠ থেকে সংগ্রহ করে দালালরা বস্তা ভরে নৌকা ভাড়া করে ইসলামপুরের মিলে গিয়ে বিক্রি করছে বস্তা প্রতি ৪৩৫ টাকা দরে বলে জানান লবণ মিল মারিক সমিতির নেতা শামশুল আলম। এক বস্তায় ৮০ কেজি করে এ পরিমাণ লবণের দাম কেজিতে ৫ টাকা ৪৩ পয়সা। যেখানে প্রতি কেজি লবণের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৬ টাকা ৭৫ পয়সা সেখানে কেজিতে ৪ টাকা বিক্রি করে দরিদ্র লবণ চাষীরা কয়দিন টিকে থাকতে পারবেন দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে-এমন প্রশ্ন এলাকার সচেতন লোকজনের। তারপরেও সরকারের বোধোদয় না হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের সমালোচকদের গলাও হয়ে উঠেছে চড়া। বিদেশ থেকে সোডিয়াম সালফেডের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানী অব্যাহত থাকায় সরকারের চলমান উন্নয়নের সুনামও এখন চাপা পড়ে গেছে লবণ চাষীদের আহাজারিতে। গত নভেম্বরে লবণ চাষ শুরু হবার পর থেকেই স্থানীয় সরকারি দলের নেতৃবৃন্দ দৌঁড়-ঝাপ দিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলে লবণের প্রকৃত পরিস্থিতি জানান দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কেনইবা এতদিনেও সোডিয়াম সালফেডের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানী অব্যাহত রয়েছে তাও রহস্যজনক।
    লবণের এমন এক অরাজক পরিস্থিতিতে লবণ মিল মালিক সমিতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কিছু দাবি উত্থাপন করেছে। তাতে বলা হয়েছে, জনস্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম সালফেট আমদানী নিষিদ্ধ করা হোক। যদি নেহাতই অন্য শিল্পের জন্য প্রয়োজন হয়, তাহলে তার উপর ২০০% করারোপ করা হোক। সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানী বন্ধ করা হোক। কক্সবাজার কেন্দ্রীক একটা “লবণ বোর্ড” গঠন করা হোক।, সরকার র্কতৃক লবণ চাষীদের নিকট হতে সরাসরি ক্রয় করে, দেশের লবণের চাহিদা ঝুঁকিমুক্ত রাখার লক্ষ্যে চলতি মৌসুমে কমপক্ষে ২লক্ষ মে:টন লবণের আপদকালীন মজুদ গড়ে তোলা হোক। এতে করে চাষীরা ন্যায্য মূল্য পাবে। মধ্যস্বত্বভোগীদেরকে মন্ত্রণালয় বা অন্য কোন সরকারী সংস্থার আওতায় নিবন্ধিত করত: তাদের কমিশন নির্দিষ্ট করে দেয়া হোক।
    উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে লবণ চাষীদেরকে সরকার র্কতৃক পলিথিন সরবরাহ করা হোক এবং তাদের জন্য লবণ মৌসুম চলাকালীন বিশেষ উৎসাহ-সহায়তা হিসেবে চাউল বরাদ্দ করা হোক, যাতে করে তারা অভাবের তাড়নায় মধ্যসত্বভোগী বা মহাজনের কবলে না পড়ে।
    যেহেতু সরকার কতৃক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য লবণ চাষের জমি অধ্যুষিত এলাকার প্রচুর জমি অধিগ্রহণ করার কারণে, লবণ চাষের মূল জমির পরিমাণ কমে এসেছে, সেহেতু বিভিন্ন উপক‚ল সংলগ্ন নতুন করে জেগে ওঠা চরের জমি সত্যিকারের লবণ মিলার ও লবণ চাষীদেরকে সহজ শর্তে বন্দোবস্তী দেয়া হোক, যাতে করে উক্ত জমিগুলো লবণ চাষের উপযোগী করে লবণ চাষের আওতা বৃদ্ধি করা যায়।
    এসব বিষয় নিয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা জানান, গত দুই সপ্তাহ আগে আমরা লবন পরিস্থিতি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর সাথে দেখা করে বিস্তারিত জানিয়েছি। আমাদের অন্যতম বক্তব্য হচ্ছে, অবিলম্বে বিদেশ থেকে সোডিয়াম সালফেট আমদানী নিষিদ্ধ করে চাষীদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হোক। অপরদিকে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক বলেছেন, লবণের বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্যই আজ কক্সবাজারে লবণ চাষী সমাবেশ করে শিল্প মন্ত্রীকে চাষীদের দুর্দশার কথা জানানো হবে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান জানান, আমি আশা করি আজকের লবণ চাষী সমাবেশের মাধ্যমেই উপকুলের লবণ চাষীদের দুর্দশা লাঘব হবে।
    প্রসঙ্গত, বিসিক এবার লবণের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। দেশে লবণের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন লাক মেট্রিক টন। অথচ গের বছর এ সময়ে ৪ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন লবন উৎপাদন হয়েছিল। ####

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০
    ১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
    ১৮১৯২০২১২২২৩২৪
    ২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ