সোমবার ২৫শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

ইয়াবার প্রবেশদ্বারে ওসি’র ‘নিরব অভিযান’

  |   বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ইয়াবার প্রবেশদ্বারে ওসি’র ‘নিরব অভিযান’

তোফায়েল আহমদ:
মরণ নেশার টেবলেট ইয়াবা বিরোধী এক অন্য রকমের নিরব অভিযানে নেমেছেন কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী থানা উখিয়ার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহাম্মদ সনজুর মোরশেদ। থানার ওসি’র এ অভিযানে সঙ্গীয় সশস্ত্র কোন পুলিশের দল থাকে না। থাকে না হুঁইসেল বাজানো গাড়ির বহর। ওসি’র নিরব অভিযানে কাউকে আটক করা হয় না। এ কারনে গাঁও-গেরামে ওসি’র গাড়ি দেখে দিগবিদিক পালায়না লোকজনও। একদম নিরবেই থানার ওসি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রায় ৫ মাস আগে উখিয়া থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসাবে যোগদান করেন পুলিশের পরিদর্শক আহাম্মদ সনজুর মোরশেদ। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জে এর আগে চাকরি করার সুযোগ হয়নি তার। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ইয়াবার অন্যতম প্রবেশদ্বার উখিয়া থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাবে তিনি যোগদান করেই চিন্তিত হয়ে পড়েন। নতুন এলাকা সর্ম্পকে কোন ধারণা নেই। এলাকার নানা তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশের যেটা দরকার সেরকম কোন সোর্সও নেই।

মিয়ানমার সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফ থানা দু’টি একমাত্র ইয়াবার কারনেই দেশ-বিদেশে আলোচনার তুঙ্গে রয়েছে। ইতিমধ্যে সীমান্ত থানা দু’টিতে কথিত বন্দুক যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ২৮৭ জন ইয়াবা কারবারি। তন্মধ্যে টেকনাফ থানার বহিষ্কতৃ ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সময়ে কেবল পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে মারা গেছেন ১৬১ জন কারবারি। এ ছাড়াও দেড় শতাধিক ইয়াবা কারবারিকে আতœসমর্পণ করিয়ে কারাগারে আটকও রাখা হয়েছে। এরি মধ্যে গত বছরের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা নিহতের চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। এর পর থেকেই পুলিশের সাথে কথিত বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা বন্ধ হয়ে যায়।
এতসব ঘটনার পরেও সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার থামেনি। এদিকে মেরিন ড্রাইভে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যার ঘটনার পর গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন সহ জেলার এক হাজার পুলিশ সদস্যকে একযোগে বদলী করা হয়। একই সাথে জেলায় সমসংখ্যক পুলিশ সদস্য যোগ দেন। নতুন করে যোগ দেয়া এসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা এক অচেনা এলাকায় এসেই এক প্রকার থমকে দাঁড়ান।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বেকায়দায় পড়েন সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফ থানার পুলিশ সদস্যরা। ওদিকে ইয়াবা কারবারিরাও মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের পরবর্তী পুলিশের বড় ধরণের রদবদল জনিত সময়টুকুতে ব্যাপক হারে ইয়াবার চালান পাচারের কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এমন সমস্যা কিভাবে সামাল দেয়া যায় সেই চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন উখিয়া থানার ওসি। যেখানে ইয়াবা কারবারিরা মৃত্যুকে পর্যন্ত ভয় করছে না, বন্দুকের নলের মুখেও তারা সমানে পাচার করছে ইয়াবার চালান, সেখানে বিকল্প পদ্ধতির খোঁজ করা শুরু করলেন উখিয়া থানার ওসি।

এ প্রসঙ্গে থানার ওসি আহাম্মদ সনজুর মোরশেদ বলেন-‘ আমি অনেক চিন্তা করেই ব্যতিক্রমী এক নিরব অভিযান শুরু করেছি। আর ভয় নয়, এবার ঘরে ঘরে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। গ্রাম থেকে গ্রামে আমি ছুটছি উদ্বুদ্ধকরণ অভিযান নিয়ে।’ ওসি বলেন, ইয়াবা কেবল একজন বা একটি পরিবারকে ধ্বংস করছে না, ধ্বংস করছে গোটা জাতি এবং দেশকে। যদিওবা সাময়িক কিছু টাকা আয়ের মোহে পড়ে গুটি কয়েক ব্যক্তি একাজে জড়িত রয়েছে তারাও পরে ‘মোহ’ ছেড়ে ইয়াবায় সবাইকে ধ্বংস ডেকে আনার কথাটি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। থানার ওসি এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বর থেকে শুরু করে স্থানীয় সর্দ্দার-মাতব্বরদের ডেকে ডেকেই তাগিদ দিয়ে চলেছেন-ইয়াবা কারবারিদের ভয় না দেখিয়ে তাদের বুঝানোর কথাটি।

উখিয়া থানার ওসি নিজেও বসে নেই। তিনি প্রতি শুক্রুবার রুটিন মাফিক কোন না কোন মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করেন। খুৎবার আগের সময়টুকুতে তিনি দাঁড়িয়ে আহŸান জানিয়ে যাচ্ছেন, ইয়াবার টাকা ধর্মীয় ভাবেও হারাম। ইয়াবার টাকা নিয়ে কেউই প্রকৃতভাবে বেশী দিনের জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তি হতে পারেন না। আইন যে কোনদিন তার উপর হামলে পড়ে সমুলে নিঃশেষ করে দিবে। ইয়াবা আমাদের পুরো জাতিকে ধ্বংস করছে। সেই সাথে তিনি (ওসি) বাল্য বিবাহ, জঙ্গীবাদ সহ অন্যান্য অপরাধজনক কাজ থেকে বিরত থাকতেও মানুষকে আহŸান জানিয়ে যাচ্ছেন।
থানার ওসি জানান, উখিয়া উপজেলার ৫ টি ইউনিয়ন পরিষদের ৪৫ টি ওয়ার্ড রয়েছে। তিনি প্রতিটি ওয়ার্ডের মসজিদ টার্গেট করে রেখেছেন, যাতে পালাক্রমে প্রতিটি ওয়ার্ডের মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজ আদায় করবেন। ইতিমধ্যে ১৫ টি মসজিদে গিয়ে জুম্মার নামাজে ইয়াবা বিরোধী বক্তব্য রেখেছেন। কেবল মসজিদ নয়, এলাকার ধর্মীয় মাহফিল যেখানে সেখানেই উখিয়া থানার ওসি নিজেই গিয়ে হাজির হন। মাহফিলে নির্ধারিত ওয়াজ করার আলেমদের সাথে তিনিও একজন বক্তা। ইতিমধ্যে ৬/৭ টি বড় ওয়াজ মাহফিল এবং সীরাত মাহফিলে ওসি নিজেই বক্তব্য রেখেছেন।

গাঁও-গেরামের মসজিদ বা ওয়াজ মাহফিলে খোদ থানার একজন ওসিকে উপস্থিত থাকতে দেখে এলাকাবাসীও মহাখুশি। এমনকি একজন ওসি যখন কয়েক হাজার মুসল্লির উপস্থিতিতে নিজেই বক্তা হন তখন দর্শক-শ্রোতাদের নিকটও অন্য রকমের অনুভুতি জাগ্রত হয়। এ প্রসঙ্গে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন-‘ এমন একজন ওসি আর আমরা পাইনি। ওয়াজ মাহফিল এবং মসজিদে গিয়ে মরণ নেশা ইয়াবা টেবলেট বিরোধী এরকম বক্তব্যও এর আগে কোন ওসি রাখেননি। আমার এলাকার মানুষ ওসির বক্তব্য অত্যন্ত পজেটিভ হিসাবে নিচ্ছেন।’
উখিয়ার হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন-‘ আকস্মিক আমার এলাকার মরিচ্যা জামে মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য ওসি উপস্থিত হন। তিনি মসজিদের ইমামের অনুমতি নিয়ে ইয়াবা, বাল্য বিবাহ ও জঙ্গীবাদ থেকে মানুষকে দুরে থাকার উপদেশ দিলেন।’ ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি তার এলাকার মুরুব্বিরা বেশ ভাল ভাবেই নিয়েছেন। মানুষকে খারাপের পথ পরিহার করে আলোর পথে আশার কথা বলার জন্য তিনি আমরা জনপ্রতিনিধিদেরও বলে যাচ্ছেন।

পালংখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মনজুর আলম জানান-‘আমাদের বর্তমান ওসি অত্যন্ত পজেটিভ। যেখানেই মানুষ সেখানেই তিনি ছুটে গিয়ে ইয়াবা, বাল্য বিবাহ, যৌতুক এবং জঙ্গীবাদ থেকে দুরে থাকতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।’ অপরদিকে হলদিয়া পালং ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মনজুর আলম বলেন, আর নয় ক্রস ফায়ার। ক্রস ফায়ারে সমাধান নেই। ইতিমধ্যে সেটা এক প্রকার প্রমাণও পাওয়া গেছে। এত কারবারি মারা গেছে কিন্তু বন্ধ হয়নি ইয়াবা পাচার। এবার মানুষকে মোটিভেশন করা দরকার। মাদক ইয়াবা মানুষের জন্য মারাতœক ক্ষতিকর জিনিষ। তিনি বলেন, উখিয়া থানার বর্তমান ওসি এখন সেই শান্তির পথে গিয়েই ভয়াল ইয়াবা সমস্যার সমাধান করার পথে হাঁটছেন। তাতেও ইয়াবা বন্ধ না হলে আবারো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তৃণমূলের এই জনপ্রতিনিধি।

রত্নাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খাইরুল আলম চৌধুরীও অনুরুপ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, জুম্মার নামাজ এবং মাহফিলে ওসির বক্তব্য এখন প্রায় ঘরে আলাপের বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, এলাকায় এমনিতেই ধর্মপ্রাণ বাসিন্দার সংখ্যা বেশী। এ কারনে অভিভাবকগনও তাদের সন্তানদের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বুঝাচ্ছেন। এতে করে ওসি’র নিরব অভিযানের বার্তা নিয়ে মানুষের কাছে একটি পজেটিভ পরিবর্তনেরও আভাস মিলছে-জানান ইউপি চেয়ারম্যান।

এডিবি/জেইউ।

 

Comments

comments

Posted ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

(333 বার পঠিত)

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক : তাহা ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
০১৮১২-৫৮৬২৩৭
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com