• শিরোনাম

    নিহতের পারিবারিক শশ্মানে সমাহিত

    উখিয়ায় ফোর মার্ডারের ঘটনায় মামলা

    রফিক উদ্দিন বাবুল/শফিক আজাদ,উখিয়া | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

    উখিয়ায় ফোর মার্ডারের ঘটনায় মামলা

    উখিয়া উপজেলার রতœাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রতœাপালং গ্রামে একই পরিবারের ৪জনকে বুধবার দিবাগত রাত্রে জবাই করে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নম্বর ৪৭/২০১৯, তারিখ :২৬/০৯/২০১৯ইং। নিহত মিলা বড়ুয়ার পিতা ও রোকন বড়ুয়ার শ্বশুর শশাংক বড়ুয়া বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে সুনির্দিষ্ট কাউকে আসামী করা না হলেও অজ্ঞাত হিসাবে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। উখিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবুল মনসুর ওসি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
    জানা গেছে, সফরে এসে মাত্র ২৬ দিন পূর্বে দেশ থেকে কুয়েত চলে যান রোকন বড়ুয়া। ঘটনার পর প্রবাসী রোকন বড়ুয়া শুক্রবার ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯ টায় বিমানযোগে কক্সবাজার পৌঁছেন। সেখান থেকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ৪ আপনজনের লাশ দেখতে মর্গে যান। সেখানে রোকন বড়ুয়ার জম্মদাতা মা সখী বড়ুয়া (৬৪), স্ত্রী মিলা বড়ুয়া (২৫), পুত্র রবিন বড়ুয়া (৫) ও ভাইঝি সনি বড়ুয়ার নিথর ও রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখে নির্বাক হয়ে যান। মৃতদেহ ৪ টির শুক্রবার ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষ করে বিকেল ৩ দিকে পূর্ব রতœা পালং বড়ুয়াপাড়ায় রোকন বড়ুয়ার বাড়ি নিয়ে আসেন। রোকন বড়ুয়ার বাড়ীতে ৪ জনের মৃতদেহ পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। হাজার হাজার মানুষের আহাজারিতে সেখানকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। এরপর প্রায় ২ ঘন্টা ধরে বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মহাঅনিত্য সভা সম্পন্ন করা হয়। মহাঅনিত্য সভায় অংশ নেয়া বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যান ট্রাস্টের ট্রাস্টি এডভোকেট দীপংকর বড়ুয়া পিন্টু জানান, রামু উপজেলার ফারিকুল বৌদ্ধ বিহারের পরিচালক বিজয় রক্ষিত মহাথেরোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত মহাঅনিত্য সভায় জ্ঞাতি করেন-উখিয়া উপজেলা ভিক্ষু সমিতির সভাপতি ধর্মপাল মহাথেরো। মহাঅনিত্য সভায় ধর্মীয় বক্তব্য রাখেন প্রজ্ঞাবোধি মহাথেরো, জীনানন্দ মহাথেরো, রতœাপালং আনন্দ বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ জ্যেতিলায়নথেরো, ইন্দ্রবংশ মহাথেরো, শাসনোপ্রিয় থেরো প্রমুখ।
    সেখানে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু (ভিক্ষু), জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সহ হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে বলে কক্সবাজার জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সিনিয়র প্রেসেডিয়াম সদস্য উদয় শংকর পাল মিটু জানিয়েছেন। বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান মহাঅনিত্য সভা শেষে মধ্য রতœাপালং খোন্দকার পাড়া বৌদ্ধ শ্মশানে একইদিন বিকেল সাড়ে ৫ টার দিকে ৪ জনকে সমাহিত করা হয়। এখানেও হাজার হাজার বৌদ্ধ ধর্মালম্বী ও সর্বস্থরের মানুষের ভীড় জমে যায়। পুরো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও সমাহিত করার প্রক্রিয়াটিতে চলছিলো শোকের মাতম। সবার একটি প্রশ্ন, ‘এতবড় হত্যাকান্ড কে বা কারা সংগঠিত করলো।
    সুত্রে আরো জানা গেছে, ফোর মার্ডারের মোটিভ উদঘাটনে প্রায় শেষপর্যায়ে এসেছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, সিআইডির ক্রাইম সিন টিমের রিপোর্ট, পিবিআই এর চট্টগ্রাম থেকে আসা ফরেনসিক এক্সপার্ট টিমের রিপোর্ট, অন্যান্য সংগ্রহকৃত আলামত ও তথ্য উপাত্ত সহ সমন্বিত করে প্রকৃত খুনীদের নাম ঠিকানা বের করে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।
    এদিকে, চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডার নিয়ে স্থানীয়রা রোকন বড়ুয়ার ভাই শিবু বড়ুয়ার স্ত্রী রিকু বড়ুয়া ও তার বাড়িতে থাকা টমটম (ই-বাইক) ড্রাইভারের দিকে সন্দেহের তীর ছুড়ছেন। কারণ বৃহস্পতিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে খুনের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর রিকু বড়ুয়ার স্বামী শিবু বড়ুয়া উক্ত টমটম (ই-বাইক) ড্রাইভারকে খুঁজলে রিকু বড়ুয়া উক্ত টমটম ড্রাইভার কোটবাজারে গেছে বলে কর্কশ ভাষায় উত্তর দেন এবং রিকু বড়ুয়া থেকে উক্ত টমটম ড্রাইভারের মোবাইল নম্বর চাইলে রিকু বড়ুয়া মোবাইল নম্বর দিতে স্বামীকে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ নিয়ে ঘটনাস্থলে উভয়ের মধ্যে তর্ক বিতর্ক হয় বলে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন। এছাড়া চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারে রিকু বড়ুয়াথর ৫ বছরের কন্যা সনি বড়ুয়া খুন হলেও বৃহস্পতিবার ২৬ সেপ্টেম্বর দৃঢ় মনোবল নিয়ে হত্যাকান্ড সম্পর্কে গণমাধ্যমে একনাগাড়ে সাক্ষাতকার দিচ্ছিলেন। নিজের মেয়ে খুন হওয়ার পরও এভাবে শক্ত মানসিকতা নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলা একজন মা হয়ে রিকা বড়ুয়ার কাছে কিভাবে সম্ভব হলো তা সবার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই রিকু বড়ুয়াই গণমাধ্যমে রোকন বড়ুয়া ও শিবু বড়ুয়ার মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে শত্রুতা রয়েছে বলে দৃঢ়তার সাথে গণমাধ্যমকে বলেছেন। আবার যে টমটম (ই-বাইক) ড্রাইভারের কথা বার বার উঠে আসছে সেও রিকু বড়ুয়ার বাপের বাড়ি চকরিয়া উপজেলার কাকরা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও রিকু বড়ুয়ার নিকটাত্মীয় বলে জানা গেছে। রোকন বড়ুয়ার পরিবার আগে খুব একটা স্বচ্ছল ছিলোনা। পরে রোকন বড়ুয়া কুয়েত গিয়ে সেখানে পরিশ্রম করা অর্থে তার পরিবারে বেশ আর্থিক স্বচ্ছলতা আসলে তাতে রিকু বড়ুয়া খুব পরশ্রীকাতর হয়ে উঠে বলে রোকন বড়ুয়ার প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন।
    এদিকে, উখিয়া থানা পুলিশ হত্যাকান্ডের মোটিভ উদঘাটনে খুন হওয়া সনী বড়ুয়াথর পিতা শিবু বড়ুয়া ও তার স্ত্রী রিকু বড়ুয়া, তাদের বাড়িতে থাকা উক্ত টমটমের ড্রাইভার সহ মোট ৫ জনকে বৃহস্পতিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উখিয়া থানায় আনা হয়েছিল। উখিয়া থানা কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানার পর তাদেরকে একইদিন রাত্রে ছেড়ে দিয়েছে বলে উখিয়া থানার ওসি (তদন্ত) নুরুল ইসলাম মজুমদার জানিয়েছেন।
    নিহত মিলা বড়ুয়ার স্বামী রোকন বড়ুয়া জানান, ব্যক্তিগত ভাবে তাদের কারো কোন শত্রুুতা নেই। তিনি মাত্র ২৬ দিন পূর্বে সফরে এসে দেশ থেকে কুয়েত গেছেন। ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে সে তার স্ত্রী মিলা বড়ুয়ার সাথে কথা বলেছেন। তিনি তখন কোটবাজার থাকায় বেশিক্ষণ কথা বলিনি। তিনি হাসি মুখে কথা বলেছে। তার ধারণা ঘটনাকারী চিহ্নিত কেই হতে পারে, না হয় মা,স্ত্রী,সন্তানকে হত্যা করতো না। হয়তো ঘাতককে ছিনে ফেলার কারনে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ঘটনাকারী সন্ধ্যার দিকে যেকোন সময় বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে। পরে আমার মা সখি বড়ুয়া টর্চ নিয়ে রুম দেখতে গেলে তাকে দুর্বৃত্তকে দেখে ফেলায় তাকে হত্যা করেছে। কারণ যে রুমে মায়ের লাশ পাওয়া গেছে ওই রুমে মা কখনো ঘুমাইনি।
    প্রবাসী রোকন বড়ুয়ার ঘরের ভিতর খুন হয়ে থাকা প্রতিটি লাশের গলায় জবাই এর চিহ্ন ছিলো। খুন হওয়া ঘরের ভিতর টেলিভিশন চলমান ছিল, নাস্তার প্লেটে নাস্তা ছিলো, বাড়ির দরজা, জানালা বন্ধ ছিল। এক রুমে ৪ টি বালিশ ছিলো। কিন্তু খুন হওয়া ৪ টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে পৃথক ৩ টি রুমে। স্থানীয় দীপালি বড়ুয়া ফ্রিজ থেকে মাছ আনতে গিয়ে বৃহস্পতিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে দরজার নীচ থেকে খুন হওয়া সখী বড়ুয়ার রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজনকে জানায়।
    স্থানীয় উষা বড়ুয়া জানান, প্রথমে লাশ দেখতে পান প্রতিবেশি দিপালী বড়ুয়া। তিনি চিৎকার করলে আমরা এগিয়ে আসি। পরে রবিসন সহ কয়েকজন ছাদ বেয়ে বাড়িত ভেতরে ঢুকে তাদের জবাই করা লাশ দেখেন।
    উল্লেখ্য উখিয়া উপজেলার রত্মাপালং ইউনিয়নের পূর্ব রতœাপালং বড়ুয়াপাড়ায় বৃহস্পতিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে একটি বাড়িতে একই পরিবারের জবাই করা ৪ জনের লাশ পাওয়া যায়। লাশ ৪টি হলো মৃত প্রবীণ বড়ুয়ার স্ত্রী সখী বড়ুয়া (৬৩), সখী বড়ুয়ার পুত্র, কুয়েত প্রবাসী রোকন বড়ুয়ার স্ত্রী মিলা বড়ুয়া (২৫), মিলা বড়ুয়ার পুত্র রবীন বড়ুয়া (৫), শিবু বড়ুয়ার কন্যা সনী বড়ুয়া (৬) সহ ৪ জন। খুনের খবর পেয়ে পুলিশ বৃহস্পতিবার ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির ছাদ দিয়ে ঢুকে লাশ গুলো উদ্ধার করেন।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ