• শিরোনাম

    বরগুনার মতই আরেক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তোলপাড়

    কক্সবাজারে ধর্ষিত শিশুকে ৪ দিন থানায় আটকে মিথ্যা স্বীকারোক্তির অভিযোগ

    নিজস্ব প্রতিবেদক ` | ২৫ জুলাই ২০১৯ | ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

    কক্সবাজারে ধর্ষিত শিশুকে ৪ দিন থানায় আটকে মিথ্যা স্বীকারোক্তির অভিযোগ

    বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যাকান্ডের অন্যতম স্বাক্ষী এবং নিহত যুবক রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে আসামী করার মত আরেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার সদর মডেল থানায়। এই ঘটনায় চার দিন তিন রাত পরিবারের ৬ সদস্যসহ ধর্ষণের শিকার ৫ম শ্রেনীর এক ছাত্রীকে থানায় আটকে রেখে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজার সদর মডেল থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। শারিরিক ও মানষিক নির্যাতনের মাধ্যমে ভিকটিমের কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তিও আদায় করা হয়েছে। এ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে জায়গা-জমির বিরোধ দেখিয়ে প্রকৃত ধর্ষককে রেহাই দিয়ে উল্টো মামাকে নতুন করে করা হয়েছে ধর্ষক।
    এমনকি নির্যাতনের পর ভিকটিমের মাকে বাদি করে তিনজনকে আসামী দেখিয়ে আগের একটি মামলার পর ওই ঘটনায় আরও একটি ধর্ষণ মামলাও রুজু করা হয়েছে। ওই মামলায় ভিকটিমের সাথে থানায় আটকে রাখা মামা-মামীকে কারাগারে পাঠিয়ে অন্যদের ছেড়ে দিতে এক লাখ টাকা ঘুষও দাবী করার অভিযোগ উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অনেক দেন দরবারের পর যার কাছ থেকে যা পেয়েছেন তা নিয়ে চার দিন পর ভিকটিমসহ একে একে সবাইকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়।
    অথচ ওসিসি’র সহায়তায় করা মামলার একমাত্র আসামী মৌলভী ফরিদকে আটকের কোন চেষ্টাও করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে ওই তদন্তকারি কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মো. আবুল কালাম। চাঞ্চল্যকর এমন ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার পর কক্সবাজারে তোলপাড় চলছে। সরব হয়ে উঠেছেন নারী ও শিশু নিয়ে কাজ করা একাধিক সংগঠন। তারা বলছেন, শিশু ভিকটিমকে এভাবে চার দিন থানা হাজতে আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় প্রচলিত আইনের পরিপন্থি। উপরন্তু এ ঘটনায় ওই পুলিশ কর্মকর্তা নিজেই আইন ভঙ্গ করেছেন।
    ভিকটিমের পারিবারিক সূত্র জানায়, কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের মুহুরীপাড়া এলাকার মৃত বজল আহমদের স্ত্রী লতিফা বেগম কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া মাঝেরঘাট এলাকায় জনৈক এনামের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। ১৪ বছর বয়সী তার মেয়ে টেকপাড়া এলাকার এরশাদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠে ৫ম শ্রেনীতে পড়ে। গত ২ জুলাই মেয়েকে একা বাড়িতে রেখে লতিফা বেগম কলাতলী এলাকার তার বোনের বাড়িতে যান। বৃষ্টি বেশি হওয়ায় ওইদিন তিনি বোনের বাড়িতেই থেকে যান।
    এরই মধ্যে লতিফার বাড়িতে এমন সময়ে আসেন তার মামাতো ভাই মৌলভী ফরিদ (৩০)। বিষয়টি মেয়ে মাকে মোবাইলে জানায়। ওইদিন রাতে লতিফার মেয়েকে বাড়িতে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে মৌলভী ফরিদ। পরেরদিন লতিফা এসে তার মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। ধর্ষণের পর ভোর রাতেই পালিয়ে যান মৌলভী ফরিদ। পরে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ‘ওসিসি’তে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
    এ ঘটনায় ওসিসি’র সহায়তায় ৩ জুলাই মৌলভী ফরিদের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ধর্ষণ মামলা রুজু হয়। ওই মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কালামকে। কিন্তু এসআই আবুল কালাম আসামী আটক এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্ত না করে আসামীকে বাঁচানোর জন্য ভিকটিমসহ পরিবারের ৬ সদস্য ও পাশের আরও ২ জনকে থানায় ডেকে নেন। ১৬ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত তাদের থানায় আটকে রাখেন। শারিরিক ও মানষিক নির্যাতনের মাধ্যমে ভিকটিমের স্বীকারোক্তি আদায় এবং ভিকটিমের মাকে বাদি সাজিয়ে আরও একটি মামলা করে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। সাথে নেয়া হয় ঘুষের ১৬ হাজার টাকাও।
    ধর্ষণের শিকার ওই কন্যা শিশু সাংবাদিকদের বলেন, ‘মৌলভী ফরিদ আমার সাথে জোর করে খারাপ কাজ (ধর্ষণ) করেছে। হাসপাতালে আমাকে চিকিৎসা দেয়ার পর তাদের সহায়তায় পুলিশকে বিচার (মামলা) দিয়েছি। কিন্তু পুলিশ আমার দেয়া বিচার না করে উল্টো আমাকে নির্যাতন করেছে।’ ওই শিশু আরও বলেন, ‘আমার পরিবারের সবাইকে থানায় ডেকে নিয়ে চারদিন আটকে রাখে। আমাকে বিদ্যুতের লোহা কাটার মেশিন দিয়ে কেটে ফেলার হুমকি দেয়। ওই মেশিন দিয়ে কেটে ফেলার জন্য আমার মুখ পর্যন্ত নিয়ে আসে। আমাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়। সারা জীবনের জন্য বন্দি থাকতে হবে বলে জানানো হয়। সেখানে ঘুমাতেও দেয়া হয়নি। এভাবে শারিরিক ও মানষিক নির্যাতন করে যেভাবে শিখিয়ে দিয়েছে সেভাবে কোর্টে বলতে বাধ্য করে এসআই আবুল কালাম।’
    সে আরও জানায়, তাদের ছেড়ে দেয়ার জন্য এক লাখ টাকা দাবী করা হয়। পরে অনেক দেন দরবার করে দুই দপে ১৬ হাজার টাকা তুলে দেন তার হাতে।’ ওই শিশু এমন ঘটনার সুবিচার দাবী করেন এবং থানায় তিনি সুবিচার পাবেন না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
    ভিকটিমের মা ও মামলার বাদি লতিফা বেগম বলেন, ‘মৌলভী ফরিদ আমার মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। এ ঘটনায় আমি ৩ জুলাই তাকে একমাত্র আসামী করে একটি মামলা দায়ের করি। কিন্তু পুলিশ মামলার আসামী মৌলভী ফরিদকে গ্রেফতার না করে সময়ক্ষেপন করেন। একপর্যায়ে গত ১৬ জুলাই স্বাক্ষীর কথা বলে পুলিশ মেয়ে ভিকটিম, ছেলে-মেয়ে, আমার ভাই ও ভাবি এবং পাশের আরও দুইজন সহ ৮ জনকে থানায় নিয়ে যায়।’
    তিনি আরও বলেন, ‘থানায় নিয়ে তিন রাত চার দিন আটকে রেখে মৌলভী ফরিদকে বাদ দিতে চাপ সৃষ্টি করেন এসআই আবুল কালাম। একপর্যায়ে আমার আপন ভাই নুরুন্নবী, ভাবী আমেনা বেগম ও মেম্বার আলমগীরকে আসামী দেখিয়ে আরও একটি মামলার এজাহারে স্বাক্ষর দিতে আমাকে বাধ্য করেন এসআই আবুল কালাম।’
    থানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ভিকটিমের মা লতিফা বেগম ঘটনা উল্লেখ করে পুলিশ সুপার এবং সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের দাবী জানিয়ে ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দোষী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন করেছেন।
    লতিফা বেগমের আইনজীবী আমির হোছাইন হাফেজী বলেন, ‘লতিফা বেগম বাদি হয়ে ৩ জুলাই মৌলভী ফরিদকে একমাত্র আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ২২ ধারা জবানবন্দি হয়েছে। অন্যান্য কার্যক্রমও চলমান। এ অবস্থায় বাদি ও ভিকটিমসহ বেশ কয়েকজনকে থানায় ডেকে আটক রেখে নতুন আরেকটি মামলা করতে বাধ্য করা হয়। পরে বাদি থানা থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের কাছে আইনি সহায়তা নিতে আসেন। ঘটনার এফিডেভিট সহকারে আদালতের কাছে তদন্তকারি কর্মকর্তা পরিবর্তন এবং থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় গৃহিত মামলা ও জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন বাদি।’
    কক্সবাজার নারী ও শিশু সুরক্ষা নেটওর্য়াক এর আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আবদুশ শুক্কুর বলেন, ‘এ ধরণের ঘটনা নজিরবিহীন। শিশু ভিকটিমকে চার দিন থানা হেফাজতে রেখে ভয়-ভীতি ও নির্যাতনের কোন সুযোগ নেই। শুধু ভিকটিম নয়, আসামীকেও ২৪ ঘন্টার বাইরে থানা হেফাজতে রাখা যায় না। এছাড়া মামলা দায়েরের ১৭ দিনেও একমাত্র আসামীকে গ্রেফতার না করে উল্টো ভিকটিম ও বাদিকে চারদিন থানায় আটকে রেখে নতুন করে আরেকটি মামলা দায়ের নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করে।’ কক্সবাজার নারী ও শিশু সুরক্ষা নেটওর্য়াক এর সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, ‘এমন ঘটনা উদ্বেগের। পুলিশ ঘটনার তদন্তের প্রয়োজনে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু আদালতের অনুমতি ছাড়া শিশু ভিকটিমকে চারদিন থানায় আটকে রাখতে পারে না। এতে ধর্ষিত শিশুর উপর মনস্থাত্ত্বিক চাপ তৈরী হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিশুটিকে কাউন্সেলিং করারও দরকার হতে পারে। নারী ও শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।
    এ প্রসঙ্গে তদন্তকারি কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মো. আবুল কালাম এমন অভিযোগ সত্য নয় দাবী করে বলেন, ‘মিথ্যা মামলাটি আমি তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করেছি মাত্র।’ ####

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মাতারবাড়ী ঘিরে মহাবন্দর

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ