• শিরোনাম

    বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে কোরাল মাছের পোনা উৎপাদনে সাফল্য

    কক্সবাজার উপকূলে ২৩ বর্গ কি.মি এলাকাজুড়ে কোরাল ও তাইল্যা মাছের প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত

    বার্তা পরিবেশক | ০২ জুলাই ২০১৯ | ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

    কক্সবাজার উপকূলে ২৩ বর্গ কি.মি এলাকাজুড়ে কোরাল ও তাইল্যা মাছের প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত

    প্রথমবারের মতো কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ভেটকি বা কোরাল মাছের পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছেন বাংলাদেশের মৎস্য বিজ্ঞানীরা। সেসাথে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার-সোনাদিয়া উপকুলজুড়ে ২৩ বর্গ কি.মি এলাকা কোরাল ও তাইল্যা মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করতেও সক্ষম হন। গত এক বছর ধরে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের চালানো এক গবেষণায় সম্প্রতি এই সাফল্য এসেছে।
    তবে এখনও এটি প্রাথমিক সাফল্য বলে মনে করেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ও দেশের বিশিষ্ট মৎস্য বিজ্ঞানী ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ।
    তিনি বলেন, গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া এক গবেষণায় প্রথমবারের মতো হ্যাচারিতে কৃত্রিম উপায়ে পোনা উৎপাদনে সাফল্য এসেছে। তবে এজন্য আরো গবেষণা দরকার। এবিষয়ে আমরা শতভাগ সাফল্য পেলে দেশের অর্থনীতি তথা সামুদ্রিক মৎস্যক্ষেত্রে এক বিপ্লবের সূচনা হবে। আর এ বিপ্লব সূচনার লক্ষ্যেই কক্সবাজার বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে আরো বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রকল্প চলছে বলে তিনি জানান।
    তিনি বলেন, এরআগে গবেষণার মাধ্যমেই প্রথমবারের কাঁকড়া পোনা উৎপাদনে সাফল্য পান বিএফআরআই বিজ্ঞানীরা। এখন আর দেশে কাঁকড়া পোনার সংকট নেই। গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় ভেটকিসহ অন্যান্য অর্থকরী মাছেরও কৃত্রিম উপায়ে পোনা তৈরির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
    জানা যায়, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কক্সবাজারে পরিচালিত ‘সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা জোরদারকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’র অর্থায়নে ‘ভেটকি মাছের মা মাছ তৈরী ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন গবেষণা’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রকল্প চলছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক এর নেতৃত্বে এ গবেষণা কাজ পরিচালিত হচ্ছে। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে গবেষণা চালানোর পর গত মে মাসে সর্বপ্রথম ভেটকি মাছের কৃত্রিম প্রজননে সাফল্য পাওয়া যায়। আর গবেষণা চালাতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরে চিহ্নিত করতে সক্ষম হন কক্সবাজারের কলাতলী থেকে সোনাদিয়া পর্যন্ত ২৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তাইল্যা ও কোরাল মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং সর্বোচ্চ প্রজননকাল।
    ভেটকি বা কোরাল মাছ (ঝবধনধংং, খধঃবং পধষপধৎরভবৎ) বাংলাদেশের উপকুলীয় এলাকার অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় বৃহৎ আকারের সামুদ্রিক মাছ। এ মাছ কম কাটাযুক্ত, দ্রুত বর্ধনশীল ও খেতে সুস্বাদু বলে এর বাজারমূল্য বেশী। আর্ন্তজাতিক পর্যায়েও এ মাছের ব্যাপক চাহিদা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ প্রতিবেশী দেশগুলো গত ২/৩ দশক আগেই হ্যাচারিতে কৃত্রিম উপায়ে ভেটকি পোনা উৎপাদনে সক্ষম হলেও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা ছিলেন পিছিয়ে। অথচ কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা ভেটকি বা কোরাল মাছ চাষের উপযুক্ত বলে আরো বেশ কয়েকবছর আগেই মন্তব্য করেছিলেন সফররত একদল মালয়েশিয়ান বিজ্ঞানী। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটসহ দেশের উপকুলীয় অঞ্চলে ঘেরের মাঝে চিংড়ির সাথে কোরাল মাছেরও চাষ করা হয়। কোরাল মাছ লবনাক্ত, আধা-লবনাক্ত, এমনকি স্বাদু পানিতেও অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায়। এ মাছের রোগ বালাই কম বলে সাম্প্রতিককালে অনেকেই চিংড়ি চাষ বাদ দিয়ে ভেটকি চাষ করে সফল হয়েছেন। তবে পোনা সংকটের কারণে এ মাছের চাষকে সম্প্রসারিত করা যাচ্ছে না। অথচ অর্থনীতিতে এর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট।
    বিজ্ঞানীরা জানান- বাংলাদেশে কোরাল মাছের বৈজ্ঞানিকভাবে চাষ হয় না বললেই চলে। মে-জুন মাসে ঘেরমালিকরা প্রাকৃতিক উৎস থেকে ভেটকি মাছের পোনা সংগ্রহ করে বাগদা চিংড়ি ও অন্যান্য মাছের সাথে সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করে থাকে।
    ভেটকি মাছের পোনা উৎপাদনের উপর চলমান গবেষণা প্রকল্পের প্রধান, কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, একটি পরিপক্ক স্ত্রী ভেটকি বা কোরাল মাছ ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি পর্যন্ত ডিম দিতে সক্ষম। ফলে হ্যাচারীতে পোনা উৎপাদনের জন্য স্বল্প সংখ্যক মা ভেটকিই যথেষ্ট।
    তিনি বলেন, তবে চ্যালেঞ্জ হল মা ভেটকি তৈরি হওয়ার জন্য যে ৪-৫ বছর সময়টুকু দরকার, তা রক্ষা করতে হবে।
    তিনি জানান, ভেটকি মাছ প্রথমে পুরুষ হয়ে জন্মায় এবং ৪-৫ বছর পর কেউ কেউ স্ত্রীতে রূপান্তরিত হয়। স্ত্রীতে রূপান্তরিত হওয়ার পরই তারা প্রজননের জন্য উপকূলের নদী মোহনার কাছে আসে।
    বিজ্ঞানী আশরাফ বলেন, কোরাল মাছের প্রজননকাল এপ্রিল থেকে শুরু হলেও সবচেয়ে বেশি ডিম দেয় মে মাসে। তিনি গত ২৩ মে অবরোধের মাঝে সোনাদিয়া উপকুলে গবেষণা চালানোর সময় কোরাল মাছের ডিম পাড়ার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেন এবং এখান থেকে সংগৃহীত মা মাছ হ্যাচারিতে এনে কৃত্রিম উপায়ে পোনা উৎপাদনেও সক্ষম হয়েছেন বলে জানান।
    তবে উৎপাদিত পোনার মর্টালিটি রেট বা বেঁচে থাকার হার এখনও কাঙ্খিত মানের নয়- মন্তব্য করে বিজ্ঞানী আশরাফুল হক এবিষয়ে শতভাগ সাফল্য পাবেন বলে দৃঢ়ভাবে আশা করছে।
    তিনি বলেন, এজন্য এখন নিবীড় গবেষণা চলছে।
    ‘সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা জোরদারকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’র প্রকল্প পরিচালক ও কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাহনূর জাহেদুল হাসান বলেন, ভেটকির উপর গবেষণা চালাতে গিয়েই আমরা গত মাসে মহেশখালী চ্যানেল ও বাঁকখালী মোহনার ফাডার চরের আশপাশের আনুমানিক ২৩ বর্গ কিলোমিটার মোহনাঞ্চল জুড়ে তাইল্যা ও ভেটকি মাছের প্রজননক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছি। পরে আরো গবেষণা চালিয়ে আমরা এবিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি। আমাদের গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল খুব শীঘ্রই বিস্তারিতভাবে উর্ধতন মহলে অবহিত করা হবে।
    তিনি জানান, ২১ ডিগ্রি ২৮ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ ও ৯১ ডিগ্রি ৫১ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশ হতে ২১ ডিগ্রি ২৯ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ ও
    ৯১ ডিগ্রি ৫৩ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২১ডিগ্রি ৪৮ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ হতে ৯১ ডিগ্রি ৫৭ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত এ প্রজননক্ষেত্রটি বিরাজিত।
    এলাকাটি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী পয়েন্ট হতে পশ্চিমে আনুমানিক ৮ কিলোমিটার দূরবর্তী সমুদ্র এলাকায় অবস্থিত এবং জেলেদের কাছে ‘ফাড়ার চর’ নামে পরিচিত বলেও জানান তিনি।
    বিজ্ঞানী আশরাফুল হক জানান, কক্সবাজার উপকুলে জেলেরা বর্তমানে খয়েরী রংয়ের ৯/৩ নং সূতা দিয়ে তৈরী ১৫ সে.মি. মেস সাইজের ভাসমান ফাস জাল (স্থানীয়ভাবে লাক্ষা বা কোরাল জাল নমে পরিচিত) ব্যবহার করে ভেটকি মাছ আহরণ করে থাকে। স্থানীয় জেলেদের মতানুযায়ী এক দশক পূর্বে সাদা রং এর ৪৫/৩ নম্বর সূতা দিয়ে তৈরী ২১ সে.মি. মেস সাইজের জাল দিয়ে কোরাল মাছ ধরা হতো এবং প্রজনন ঋতুতে বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক বেশী পরিমাণে পরিপক্ক বড় আকারের স্ত্রী ভেটকি মাছ ধরা পড়তো।
    তিনি জানান, সাগর থেকে কোরাল মাছ আহরণে নিয়োজিত অভিজ্ঞ নৌকার মাঝিদের সাথে ফোকাস গ্রুপ আলোচনার মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বঙ্গোপসাগরে ভেটকি মাছের প্রজনন ক্ষেত্র থেকে সরাসরি প্রজননকালে পরিপক্ক মা ভেটকি মাছ সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের মে মাস থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রতি মাসের অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার জো (গুণ) পরবর্তী ৩-৪ দিন মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ভেটকি ও তাইল্লা মাছের সঠিক এলাকা সনাক্ত করা হয়।
    বিজ্ঞানীরা জানান, মূলতঃ মহেশখালী চ্যানেল মোহনার ফাডার চর ভাটার সময় জেগে উঠে ও জোয়ারের সময় নিমজ্জিত থাকে। এ চরের অগভীর এলাকায় আগত জোয়ারের পানিতে সান্ধ্যকালীন সময়ে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ পরিপক্ক ডিম ও শুক্রাণু ছাড়ে। তীব্র ঢেউ ও ঘূর্ণনের মধ্যে ডিম ও শুক্রাণুর মধ্যে বাহ্যিক নিষিক্তকরণের মাধ্যমে ভেটকি মাছের প্রজনন সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রজনন ক্ষেত্রে নিষিক্ত ডিম্বাণুর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ তৈল গ্রন্থি বিদ্যমাণ থাকায় নিষিক্ত ডিম সাগরের পানির উপরিস্তরে ভাসতে থাকে এবং জোয়ারের পানির সাথে ভাসতে ভাসতে একসময় উজানের উপকুলীয় নদী-নালার কম লবনাক্ত পানিতে পৌছে। ১২ থেকে ১৫ ঘন্টার মধ্যে এরা ডিম থেকে লার্ভি আকারে বড় হয়ে সোনাদিয়া, মহেশখালী, বাঁকখালী নদীর উজান দিকের খুরুশকুল, পেশকারপাড়া, এসএমপাড়া, চান্দেরপাড়া ইত্যাদি এলাকায় (জোয়ারের পানি যেখান পর্যন্ত প্রবেশ করে সে সমস্ত এলাকায়) অগভীর জলাশয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
    বিজ্ঞানী আশরাফ জানান, সর্বোচ্চ প্রজননকালীন সময়ে মহেশখালী চ্যানেলের ভেটকি মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের পানির ভৌত- রাসায়নিক গুণাবলীও নিরূপণ করা হয়। ভেটকি ও তাইল্যার প্রজননের জন্য পানির লবনাক্ততার পরিমাণ ৩০ থেকে ৩১ পিপিটি, তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, পানির স্বচ্ছতা ২০ থেকে ২২ সে.মি, গভীরতা ১৪ থেকে ২৪ ফুট এবং পানির পিএইচ ৮ থেকে সাড়ে ৮ পর্যন্ত আদর্শ। আর বায়ু প্রবাহের দিক দক্ষিণ-পশ্চিম হলেই উক্ত এলাকায় এ আদর্শ বিরাজ করে। ভেটকি ও তাইল্যা উক্ত এলাকায় প্রজননের উদ্দেশ্যে একত্র হওয়া শুরু করে এবং প্রতি বছর চৈত্র, বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য এই তিন মাসে পূর্ণিমা ও অমাবশ্যার জো- এর পরবর্তী ৩-৪ দিন পরিপক্ক ও ডিম নির্গত অবস্থায় সমুদ্র থেকে মোহনায় প্রবেশ করে। এ সময় জেলেদের জালে ডিম নির্গত অবস্থায় ভেটকি মাছ ধরা পড়ে। জুন মাসের মধ্যম ভাগের পর দক্ষিণ পশ্চিম মৌমুমী বায়ুর প্রভাবে যখন বৃষ্টিপাত শুরু হয় সে সময় উজান থেকে স্বাদু পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে প্রজনন ক্ষেত্রের উক্ত এলাকায় পরিপক্ক ভেটকি মাছের উপস্থিতি দেখা যায় না। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে যে, কোরাল মাছের জীবনচক্র ও অভিপ্রায়নের ক্ষেত্রে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার হার গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ