• শিরোনাম

    করোনা আক্রান্ত হতভাগির সবই আছে কিন্তু কেউ নেই

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৫ মার্চ ২০২০ | ১০:০৯ অপরাহ্ণ

    করোনা আক্রান্ত হতভাগির সবই আছে কিন্তু কেউ নেই

    ফাইল ছবি

    কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ৫০১ নম্বর কেবিনে চিকিৎসাধীন সৌদি ফেরত করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধ নারীর ধারে কাছেও কেউ নেই। কেউ নেই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে নিয়ে যাবারও। এমন কোন স্বজন নেই কেউ একমুঠো ভাত নিয়ে খাওয়াবে বৃদ্ধাকে। সন্তান-সন্ততিদের সবাই কোয়ারেন্টিনে থাকায় আক্রান্ত এই হতভাগির দিকে কেউই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে-তার এক কন্যা এ পর্যন্ত সাথে রয়েছেন। তবুও বুধবার প্রায় পুরোদিনই উপুষে কাটিয়েছেন তিনি।
    এ যেন চীনের উহান শহর সহ বিশে^র অন্যান্য করোনা আক্রান্ত এলাকার নানা মানবিক কাহিনীর মতই একটি। অথচ করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধা মোসলেমা খাতুনের (৭০) রয়েছেন ৫ পুত্র ও ৪ কন্যার বিশাল আপনজনের বহর। বৃদ্ধার ৫ পুত্র সন্তান সবাই সমাজে স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্টিত। তাদের মধ্যে দুই পুত্র শিক্ষাবিদ, এক পুত্র ব্যাংকার ও অপর দুই পুত্র একটি বেসরকারি কম্পানীর পদস্থ কর্মকর্তা। অপরদিকে ৪ কন্যারও সবাই গৃহবধূ। কিন্তু সবাই ‘করোনা পরিস্থিতি’র শিকার হওয়ার কারনে তাদের মা বঞ্চিত হচ্ছেন সেবা শুশ্রæষা থেকে।
    করোনা এমনই এক ভয়ংকর ভাইরাস যেটি কিনা আপনজনকেও মুহূর্তের মধ্যে পর কওে ফেলার শক্তি রাখে। যে নারী একজন রতœগর্ভার অধিকারি আজ তিনিই কিনা পাচেছন না কাউকে। যে নারীর ডাকে মুহূর্তেই ৯ ভাই-বোন দৌঁড়ে কাছে আসার কথা আজ তারাই কিনা মা থেকে দুওে থাকতেও বাধ্য হচ্ছেন। এমন নয় যে-গর্ভধারিনী মাকেতারা ইচ্ছা করেই অবহেলা করছেন এমনও ভাবার কোন কারন নেই। বাস্তবে ভাইরাসটি তাবৎ দুনিয়ায় আঘাত হেনে এভাবেই পরষ্পরকে বিচ্ছিন্ন কওে দিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনা কক্সবাজারের সুস্থ মানুষগুলোর জন্যও একটি সতর্ক বার্তা হতে পারে।

    এক পুত্র ছাড়া ৮ ভাই-বোনই গত ১৩ মার্চ সৌদি আরব থেকে তাদের মা (মোসলেমা) দেশে ফিরে আসার পর থেকেই সাথে রয়েছেন। অপর এক ভাই রয়েছেন ঢাকায়। তিনিও করোনা পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছেন। মা’র সাথে মেলামেশার কারনে ৮ ভাই-বোনের মধ্যে ৭ জনের পরিবারই বর্তমানে রয়েছেন স্ব স্ব হোম কোয়ারেন্টিনে। তাদের মধ্যেও ব্যতিক্রম রয়েছেন এক বোন শায়েরা। তিনি সেই থেকে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তার মা’কে জড়িয়ে ধরে রয়েছেন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ৫০১ নম্বর কেবিনে। মা ‘ভয়ংকর করোনা’য় আক্রান্ত। তবুও কন্যা শায়েরা এতটুকুও ভীত নন। তিনি মা’র সাথেই একাকী রয়েছেন কেবিনটিতে।
    গত ১৮ মার্চ কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে সর্দ্দি-কাশি ও জ¦র নিয়ে সৌদি ফেরত মোসলেমাকে ভর্ত্তির পর থেকেই অদম্য সাহসী এবং মা ভক্ত কন্যা শায়েরা মাকে ছেড়ে যাননি। অথচ মঙ্গলবার ঢাকার আইইডিসিআর থেকে আসা নমুনা করোনা পজেটিভ চাওর হবার সাথে সাথেই স্বজনরা সবাই যার যার মত করে সরে গিয়ে কোয়ারেন্টিনে চলে যান। এ কারনে একমাত্র কন্যা শায়েরা ছাড়া হাসপাতালে বৃদ্ধাকে দেখভাল করারও কেউ নেই। ফলে গতকাল পুরোদিন ধরেই উপুষ থাকতে হয় তাদের মা মোসলেমা ও কন্যা শায়েরা কে।
    এ বিষয়ে করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধার জ্যেষ্ট পুত্র এবং কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সোলেমান বলেন-‘ কলেজের একজন পিয়নকে আমি ভাত নিয়ে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু ৫০১ নম্বর কেবিনে খাবার নিয়ে যাবার কথা শুনেই হাসপাতাল কর্মচারি কর্তৃক পিয়ন বাঁধার মুখে ফিরে আসে। ফলে আমার মা ও বোন উপুষ থেকেছেন।’ রাতের ভাত দেয়ার জন্য তিনি তার একজন সহপাঠিকে অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও জানান।

    শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাঃ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন হোটেল থেকে এনে ভাত খাইয়েছেন করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধাকে। এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্বাবধায়ক বলেন-‘ সারাদিন কেউ ভাত নিয়ে না আসার কথা জানতে পেরে আমি নিজেই হোটেল থেকে এনে খাবার ব্যবস্থা করেছি। আমি বৃদ্ধার স্বজনদের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে যোগাযোগও করেছি, তারা বলেছেন সবাই কোয়ারেন্টিনে।’

    তিনি বলেন, করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধা মোসলেমা খাতুনকে ১৮ মার্চ ভর্ত্তি করার সময় পরিবারের সদস্যরা সত্য গোপন করায় যত ঝামেলা হচ্ছে। স্বজনরা একবারের জন্যও স্বীকার করেননি-আক্রান্ত বৃদ্ধা ওমরা থেকে ফিরে আসার কথা। তত্বাবধায়ক ডাঃ মহিউদ্দিন আরো বলেন, চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে মোসলেমা খাতুনকে নিয়ে যাবার জন্য স্বজনদের কেউ এগিয়ে আসছেন না। এমনকি তিনি নিয়ে যাবার জন্য যানাবাহনের ব্যবস্থা করার কথা বললেও এগিয়ে আসছেন না কেউ।
    কক্সবাজার সরকারি মেডিকেল কলেজের সহকারি অধ্যাপক ডাঃ আবু মোহাম্মদ শামসুদ্দিন কালের কন্ঠকে জানান-‘বর্তমান অবস্থায় করোনা আক্রান্ত রোগি মোসলেমা অনেকটাই ভাল রয়েছেন। মঙ্গলবার তার পাতলা পায়খানা হলেও এখন সেটাও সেরে উঠেছে।’ তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, করোনা পজেটিভ রিপোর্ট আসার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এ রোগির সাথে মেলামেশা সহ চিকিৎসা কাজে জড়িত চিকিৎসক ও নার্সদের নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ