• শিরোনাম

    কৃষিতে প্রযুক্তি; বছরে সাশ্রয় ২৭ হাজার কোটি টাকা

    ড. মো. আনোয়ার হোসেন | ২৩ আগস্ট ২০২০ | ১০:২৮ অপরাহ্ণ

    কৃষিতে প্রযুক্তি; বছরে সাশ্রয় ২৭ হাজার কোটি টাকা

    “বাপ-বেটায় করবে চাষ, তাতে পুরবে মনের আশ” বা “বাপ বেটায় চাষ চাই, তা অভাবে সহোদর ভাই।” প্রায় ৮ম-১২শ শতাব্দীর দিকে রচিত দু’টি খনার বচন। সময়ের বিবর্তনে আজ বাপ কৃষির সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত থাকলেও বেটাকে কৃষির দিকে আকৃষ্ট করাই যাচ্ছে না। বাপ-বেটাকে কৃষিতে একসাথে ধরে রেখে মনের আশা পূরণ করাতে হলে প্রয়োজন যান্ত্রিকীকরণের, যা আজ অত্যন্ত আলোচিত একটি শব্দ। যান্ত্রিকীকরণ একদিকে যেমন বয়স্ক বাপের কায়িক-শ্রম লাগব করবে, ছেলেকে কৃষিতে পুনরায় ফিরিয়ে আনবে, অন্যদিকে টেকসই কৃষির উন্নয়নে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে শস্যের অপচয় হ্রাস করবে। খোরপোষের কৃষি রূপান্তরিত হবে বাণিজ্যিক কৃষিতে এবং তখন কৃষি হবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ। তাই কৃষিকে আধুনিকায়ন তথা টেকসই যান্ত্রিকীকরণ এখন সময়ের দাবী।

    বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ ২০১০ সালে মাঠ পর্যায়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করে ফলনোত্তর অপচয় পরিমাপের জন্য। আউশ, আমন এবং বোরো মওসুমে উক্ত গবেষণা গাজীপুরে পরিচালনা করা হয়। ব্রি,র ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিধান চন্দ্র্র নাথের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত উক্ত গবেষণায় লক্ষ্য করা যায় যে, ফসল কর্তন হতে শুকানো পর্যন্ত তিন মওসুমে গড়ে শতকারা ১০ ভাগ ধানের অপচয় হয়। গত ০৫ মার্চ, ২০২০ বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে গুদামজাতের সময় ২-৬ শতাংশ এবং পরিবহণের সময় ২-১০ শতাংশ অপচয় হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেদন হতে জানা যায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে চাল উৎপাদন পূর্ববর্তী পর্যায়ে ছয়টি ধাপে ১০-৩৩ শতাংশ ধান অপচয় হয়। এর মধ্যে ধান কাটার সময় ১-৩, আটি বাঁধা ও পরিবহনে ২-৫, মাড়াইয়ে ২-৬, শুকানোতে ১-৫, গুদামজাতকরণে ২-৬ এবং পরিবহণে ২-৮ শতাংশ পর্যন্ত ধান অপচয় হয়। বাংলাদেশও এই সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। মাসিক কৃষিবার্তায় ১৩ অক্টোবর, ২০১৪ এক প্রতিবেদনে নিতাই চন্দ্র রায় উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রায় ১৪ শতাংশ শস্য বিনষ্ট হয় যা খামার যান্ত্রিকরণের মাধ্যমে কমিয়ে ৫ শতাংশে আনা সম্ভব।

    বিভিন্ন মাত্রায় ফসলের এই অপচয় প্রি-হারভেস্ট, হারভেস্ট ও পোস্ট-হারভেস্ট পর্যায়ে ঘটে থাকে। প্রি-হারভেস্ট পর্যায়ে ফসলের অপচয় সাধারণ পোকামাকড়, আগাছা, ইঁদুর, কর্তনের সময় শস্যের পরিপক্বতা, আর্দ্রতার পরিমাণ, আবহাওয়া এবং ধানের জাত ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। হারভেস্ট পর্যায়ে অপচয় বলতে ফসল কর্তনের শুরু হতে কর্তন শেষ পর্যন্ত অপচয়কে বুঝানো হয়ে থাকে। এটি সাধারণত পরিপক্ব শস্যের শীষ হতে পড়ে যাওয়ার মাধ্যমে ঘটে যা শাটারিং জনিত অপচয় নামে পরিচিত। পোস্ট-হারভেস্ট পর্যায়ে ফসলের অপচয় সাধারণত ফসলের কর্তন পরবর্তী এবং খাদ্য হিসাবে ব্যবহার পর্যন্ত সকল অপচয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন, মাড়াই, ঝাড়াই, শুকানো, সংরক্ষণ, মিলিং ইত্যাদি অন্যতম।

    কর্তনকালীন অপচয় কমানোর জন্য যখন জমির ধান শতকারা ৮০-৮৫ ভাগ সোনালী রং ধারণ করে বা পরিপক্ব হয় তখন কাটার উপযুক্ত সময়। তাছাড়া ধান কর্তনের সময় আর্দ্রতাও একটি অন্যতম নিয়ামক। ২০-২৫% আর্দ্রতায় ফসল কর্তন করলে শাটারিং জনিত অপচয় কম হয়। এর চেয়ে কম আর্দ্রতায় ফসল কর্তন করলে যেমন শাটারিং জনিত অপচয় বেশী হয় তেমনি এর চেয়ে বেশী আর্দ্রতায় কর্তন করলেও মাড়াইকালীন অপচয় বেশী হয়। তাই ফসল কর্তনের সময় সঠিক পরিপক্বতা এবং আর্দ্রতা বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ । যদিও উন্নত দেশে ময়েশ্চার মিটার দিয়ে আর্দ্রতা পরিমাপ করে ধান কাটার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো প্রচলিত এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চোখের আন্দাজে বা অনুমানের উপর ভিত্তি করে ধান কাটার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

    গুদামজাত বা সংরক্ষণ এবং রাইস মিলিংয়ের সময়েরও ধানের অপচয় উল্লেখ করার মতো। আমাদের দেশে সাধারণত শুকানো ধানকে প্রচলিত মটকা, বাশেঁর নির্মিত খোলা গোলা বা ডোল, পাটের বা প্লাষ্টিকের বস্তা, মাটি বা টিনের পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। বায়ুরোধী করে সংরক্ষণ বা গুদামজাত করা হয় না বলে বিভিন্ন পোকা মাকড়ের আক্রমণে ধানের গুণগত মান হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে একটি বিরাট অংশের অপচয় ঘটে থাকে। যদিও উন্নত অনেক দেশে ব্রাউন রাইস গুদামজাত করা হয়। সাধারণত পরবর্তী মওসুমে বীজ হিসাবে ব্যবহারের জন্য, বিক্রির জন্য এবং পুনরায় ধান ঘরে আসার পূর্ব পর্যন্ত খাওয়ার ধান সংরক্ষণ করা হয়। বীজ ধান অতি যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হলেও খাওয়া এবং বিক্রির জন্য ধান ততটা যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয় না। আমাদেরে দেশের জলবায়ু বিশেষ করে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পোকার বংশ বিস্তারের জন্য খুব উপযোগী হওয়ায় সাধারণত লেপিডোপটেরা (ধানের সরুই পোকা) ও কোরিওপটেরা (ধানের শুঁড়পোকা, কেরিপোকা, চ্যাপ্টাদেহী শুসরি পোকা, খাপরা বিটল) বর্গের পোকা গুদামজাত শস্যে আক্রমণ বেশি করে। কৃষকের গুদামজাতকৃত ধানের একটি বিরাট অংশ এসব পোকার আক্রমণে নষ্ট ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। তাই ধান সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সচেতনতা এবং কিছু বৈজ্ঞানিক কৌশল অবলম্বন করা উচিত।

    ধান ভাঙানোর পদ্ধতিতেও আমাদের দেশে যথেষ্ট দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। সারা বিশ্বে ধান থেকে চাল তৈরিতে আধুনিক চালকলের ব্যবহার হলেও বাংলাদেশে এখনো প্রথাগত চালকল ব্যবহার হয়ে থাকে। এসব চালকলের মাধ্যমে যে চাল পাওয়া যায়, তা উন্নত বিশ্বের গড়ের তুলনায় বেশ কম। দেশের সিংহভাগ ধান এখনো প্রচলিত এঙ্গেলবার্গ হালারে বা সেমি অটো চালকলে ভাঙানো হয়। অটোমেটিক বা আধুনিক চালকলে ধান ভাঙানো হলে এঙ্গেলবার্গ হালারের বা সেমি অটো চালকলের তুলনায় প্রতি মণ ধানে ২-৫ কেজি বেশি চাল পাওয়া যায়। ধান হতে চালের পরিমাণ ধান শুকানোর মাত্রা, শুকানোর পদ্ধতি, মিলিং করার সময় আর্দ্রতা, মিলিং মেশিনসহ অনেক গুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। ইতোপূর্বে সীমিত পর্যায়ে ধান শুকানো, মিলিং এবং মিলিং মেশিনারি নিয়ে গবেষণা হলেও ব্রি’র ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি (এফএমপিএইচটি) বিভাগ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগ বিভিন্ন গবেষণা হাতে নিয়েছে। যদিও ব্রি’র এফএমপিএইচটি বিভাগ প্রচলিত এঙ্গেলবার্গ হালারকে উন্নয়ন করে একটি এয়ার-ব্ল টাইপ হালার উদ্ভাবন করেছে যাতে প্রচলিত এঙ্গেলবার্গ হালারের তুলনায় প্রায় ১% এর বেশী চাল পাওয়া যায় এবং খরচও অর্ধেক কম হয়। এই প্রযুক্তিটি সম্প্রসারণের মাধ্যমেও ধান হতে চালের উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাছাড়া দেশের প্রচলিত এঙ্গেলবার্গ হালারে প্রায় ২-৩ কেজি চাল প্রতি মণে ভেঙ্গে যায়। সাধারণত সিদ্ধ ধান হতে ৬৮ শতাংশ চাল পাওয়া গেলেও দেশের প্রচলিত এঙ্গেলবার্গ হালারে প্রায় ৬২ এবং সেমি অটো রাইস মিলে প্রায় ৬৩ শতাংশ চাল পাওয়া যায়।

    বিবিএস এবং ডিএই এর তথ্য মতে ২০১৮-১৯ সালে চালের উৎপাদন ছিল ৩৭.৩৬৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন যা ধানের হিসাবে প্রায় ৫৬.৬১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। শুধুমাত্র কম্বাইন হারভেস্টার সরবরাহের মাধ্যমে ধান কর্তন, পরিবহণ, মাড়াই এবং ঝাড়াই বাবদ অপচয় প্রায় ৫.০% রোধ করা সম্ভব। ৫% অপচয় রোধ করা সম্ভব হলে ফলন হতো প্রায় ৫৯.৪৪৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন অর্থাৎ ২.৮৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন অতিরিক্ত ধান প্রতি বছর কৃষক তার গোলায় তুলতে পারত যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০.২ হাজার কোটি টাকা। প্রচলিত এঙ্গেলবার্গ হালারকে আধুনিক অটো চালকলে রূপান্তরিত করা সম্ভব হলে শতকারা প্রায় ৩.০ ভাগ চাল বেশী পাওয়া সম্ভব হতো। সেক্ষেত্রে চালের মোট উৎপাদন হতো ৩৭.৩৬৪ মিলিয়ন মেট্রিক টনের স্থলে ৩৮.৪৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন অর্থাৎ ১.১২১ মিলিয়ন মেট্রিক টন চাল বেশী পাওয়া যেত যার বাজার মূল্য প্রায় ৬.১৬৬ হাজার কোটি টাকা। শুধুমাত্র ধান সংরক্ষণের পদ্ধতি পরিবর্তন করে সাইলো বা বায়ুরোধী ব্যাগ বা কন্টেইনার করা হলে গুদামজাত বাবদ শতকারা প্রায় ১.৫ ভাগ অপচয় হ্রাস করার মাধ্যমে প্রতি বছর আনুমানিক ০.৮৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ধান সাশ্রয় করা যাবে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৩.০৬ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া পরিবহণ এবং বাজারজাত করণের ক্ষেত্রে ব্যাপক ধান এবং চালের অপচয় হয়। এই ক্ষেত্রেও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং উন্নত চালের ব্যাগ ব্যবহার করে প্রায় ৩-৪ ভাগ পর্যন্ত অপচয় রোধ করা সম্ভব, যার বাজার মূল্য ৭-৮ হাজার কোটি টাকার কম নয়। সর্বোপরি ধান কর্তন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত আধুনিকায়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২৬-২৭ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা যেতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়।

    নিজের ফলানো ফসল বিভিন্নভাবে নষ্ট হওয়া মানে নিজের কষ্টার্জিত টাকারই অপচয়। তাই উৎপাদিত ফসল অপচয় রোধে সচেতন হওয়া যেমন জরুরি তেমনি জরুরি কৃষির সকল পর্যায়ে আমূল পরিবর্তনের। আমি মনে করি, কৃষি বান্ধব সরকার এবং সরকারের সুযোগ্য কৃষিমন্ত্রীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে কৃষিতে যে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে তাতে বাস্তব হয়ে ধরা দিবে পুরাতন সেই খনার বচন। ইতোমধ্যে কৃষিমন্ত্রীর সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে হাওরের ধানকাটাসহ অন্যান্য বিষয় দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়েছে। আশা করা যায়, দেশের অর্থনীতিসহ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে এবং ধান-চালের অপচয় রোধে আগামীর কৃষি হবে আধুনিক এবং প্রযুক্তি নির্ভর।

    লেখক: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
    ফার্ম মেশিনারি এন্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ
    বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

    Comments

    comments

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ