• শিরোনাম

    মহেশখালীতে এসপিএম প্রকল্প

    ক্ষতিপূরণ ও পূনর্বাসন না হওয়ায় ক্ষুব্দ ক্ষতিগ্রস্তরা

    মোহাম্মদ শাহাব উদ্দীন, মহেশখালী | ২৮ নভেম্বর ২০১৯ | ১১:০৫ অপরাহ্ণ

    ক্ষতিপূরণ ও পূনর্বাসন না হওয়ায় ক্ষুব্দ ক্ষতিগ্রস্তরা

    কালারমারছড়ার প্রকল্প এলাকার উচ্ছেদ এর ছবি

    কক্সবাজারের মহেশখালীতে একের পর এক মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে পরিবেশ ও জীবনযাত্রা পাল্টে যাচ্ছে। কালারমারছড়ায় পেট্রোবাংলার তেলের ডিপো ও সিঙ্গেলে মুরিং এর দুটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং(এসপিএম) প্রকল্পে কালারমারছড়া ইউনিয়নে ৬ মাসে প্রায় তিনশ’ পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে। তাদের মধ্যে একশ’র বেশি পরিবার চকরিয়ার কাকরায় আশ্রয় নিয়েছে। ১শ’৫০টি উঠেছে এসপিএম প্রকল্প সংলগ্ন আশ্রয়ন প্রকল্পের ঝুপড়ি ঘরে। বাকিরা আত্মীয়দের বাসায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নতুন করে উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগছে আরো প্রায় একশ’ পরিবার। পাহাড় কেটে প্রকল্প করায় পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
    বসতি ও জীবিকা হারানো মানুষের কথাঃ
    ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং(এসপিএম) প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সোনাপাড়ার মোহাম্মদ শাহাব উদ্দীন তাদের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি পুকুরে মাছ ও পাহাড়ে পান চাষ করতাম, ফল বিক্রি করে পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাতাম। প্রকল্পের কারণে আমাদের পুকুর ও পানের বরজ মাটি ফেলে ভরাট করে সব গাছপালা কেটে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় হত। এখন কিছু নেই। এখন আমাদের বাড়িঘর ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে উচ্ছেদ করা হলে আমরা কোথায় যাব?’
    ক্ষতিগ্রস্ত খতিজা বেগম বলেন, ‘যে জায়গায় প্রকল্প হচ্ছে সেখানে আমরা ৫০ বছর ধরে বাস করছি। আমাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দিয়ে গাছপালা, পানের বরজ কেটে দিেেয়ছে, বাড়ি ঘর ভেঙে দিয়ে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ধান, পানের চাষ করতে পারছি না। আমরা খাব কী? থাকব কোথায়?’
    উচ্ছেদ হওয়া ৮০ বছরের ছালে আহমদ ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার বাপ-দাদাসহ প্রায় একশ’ বছর ধরে এ এলাকায় বসবাস করে আসছি। প্রকল্প আমার ১৪ কানি জমি অধিগ্রহণ করেছে। এখনো একটি টাকাও দেয়নি। খাস জমিতে বাস করা প্রায় ৪শ’ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কেউ কেউ নামমাত্র ক্ষতিপূরণ পেলেও বেশিরভাগই পায়নি। ক্ষতিপূরণ যা দিচ্ছে, তা-ও নগণ্য। আমরা আর সহ্য করতে পারছি না।’

    খতিয়ানভুক্ত জমির মালিক সেতারা বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য জমি নিলে আমার আপত্তি নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী গরীব ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বললেও কিছু সুবিধাভোগী আমাদের সাথে প্রতারণা করছে। আমার খতিয়ানভুক্ত জমির উপযুক্ত মূল্য ও বাড়িঘরের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই জায়গা ভরাট করে দিচ্ছে।’ সরেজিমিন গিয়ে সেতারা বেগমের কথার সত্যতা পাওয়া যায়। একই রকম অভিযোগ করেন আরেক খতিয়ানভুক্ত জমির মালিক ছনোয়ারা বেগম।
    ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়ার আশঙ্কার মাঝেই অবারো উচ্ছেদ আতঙ্ক
    কালারমারছড়া ইউনিয়নের সোনার পাড়ায় রাস্তার দু’পাশে পেট্রোবাংলার অধিগ্রহণ করা জায়গায় কয়েকশ’ পরিবার রয়েছে। সোনার পাড়ার পশ্চিমে খতিয়ানভুক্ত প্রায় ১শ’৪১ একর জায়গা দখল করে সেখানে কাজ শুরু­ করে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। কিন্তু জায়গার মালিকদের ক্ষতিপূরণের নোটিশ দেওয়ার কথা থাকলেও এখনও কিছুই পাননি বলে জানালেন জমির মালিকরা। ফলে ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া নিয়ে দু’চিন্তার মধ্যেই রয়েছেন তারা।

    এর মধ্যেই আবারো উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগছেন সোনার পাড়ার তিন হাজার নারী পুরুষ। কালারমারছড়া ইউনিয়নের সোনার পাড়া রাস্তার পূর্ব পাশে ১২নম্বর পাহাড়ি মৌজায় ১শ’৯১ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলা পাহাড়ি মৌজায় যে জায়গার উপর তেলের ডিপো নির্মাণ করতে যাচ্ছে, সেখানে চারশ’র বেশি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে গত ৬ মাসে তিনশ’র বেশি পরিবার উচ্ছেদ হয়ে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা। তাদেরকে নামে মাত্র বাড়ীর ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
    ক্ষতিপূরণের আবেদন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের হুমকি
    ওই এলাকায় প্রায় দু’হাজার পানের বরজ, বিভিন্ন ফলের গাছ এবং সবজী বাগানসহ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলেও জানান স্থানীয়রা। তাই সোনার পাড়া, চিকনি পাড়া এবং নয়া পাড়ার লোকজন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য লিখিত আবেদন করেছেন।
    তাদের আবেদনে জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও আশ্বাস দেন। কিন্তু হঠাৎ করে পেট্রোবাংলার লোকজন নিয়ে স্থানীয় বন-বিভাগের কর্মকর্তারা এসে পাহাড়ের বসত ভিটার ফলের গাছ ও পাহাড় কেটে মাটি সমতল করার কাজ শুরু করেছে। জমির মালিকরা এতে বাধা দিলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও বন বিভাগ তাদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায়।

    ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন না দিয়ে কেন তাদের গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা শামসুল হক বলেন, ‘উপরের নির্দেশে এখানে গাছ কাটা হচ্ছে।’
    ক্ষতিগ্রস্তদের কর্মসূচি ও জনপ্রতিনিধির ভাষ্যঃ
    এ অবস্থায় ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে প্রায় দু’ হাজার নারী-পুরুষ ২৪ জুলাই নয়া পাড়া, চিকনি পাড়া ও সোনার পাড়ার ক্ষতিগ্রস্তরা সোনার পাড়া রাস্তার ওপর মানববন্ধন আয়োজন করেন। তাদের দাবি, ‘আগে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ, পরে উচ্ছেদ’। কিন্তু এখনও দাবি বাস্তাবায়ন হচ্ছে না বলে জানান ক্ষতিগ্রস্তরা। কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারেক বিন ওসমান শরীফ বলেন, ‘পাহাড়ে যারা বসবাস করছেন তারা অত্যন্ত অসহায় ও গরিব। পেট্রোবাংলা তাদের উচ্ছেদ করলে আগে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন করতে হবে। এটা আমি অনেক আগে থেকেই বলে আসছি এবং তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে আমি জেলা প্রশাসককেও জানিয়েছি, যাতে ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পায়। কিন্তু এখন গরিব ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে অন্যায় করা হচ্ছে।’

    মহেশখালী কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, ‘দেশের উন্নয়নে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সবাই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন। যদি কেউ বাদ পড়েন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে কেউ অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পরিবেশবাদি সংগঠন বাপার মহেশখালীর সদস্য সচিব আবু বকর বলেন, ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং(এসপিএম) প্রকল্পে ইআইএ(পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা) ভারতের ইন্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিঃ এবং বাংলাদেশের ্ইকিউএসএম কনসাল্টিং লিঃ করলেও কোন প্রকার ইআইএ রিপোর্টটি প্রকাশ হয়নি। প্রায় ৫শ পরিবার উচ্ছেদ হতে পারে। পাহাড় ও ব্যাপক গাছপালা কাটায় বন ধবংসের পাশাাপশি বানর,হরিণসহ বিভিন্ন প্রকার পশুপাখি হুমকীর মুখে রয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি না হয় এমন জায়গায় প্রকল্প নেওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন।
    কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও আশ্বাসঃ
    মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামিরুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পূনবার্সন ও ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা বিতরণের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আশরাফুল আফসার প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষার এক সেমিনামে বলেন, কালারমারছড়ায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। যারা এখনো ক্ষতিপূরণ পায়নি তাদের দ্রুত নিশ্চিত করা হবে।

    স্থানীয়রা বলছেন, অতীতে নানা রকম আশ্বাস তারা পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ক্ষতি হয়েই চলেছে। এখন তারা পরিবেশের ক্ষতি না করে উন্নয়ন এবং প্রকল্পের জন্য দখল করা জমি ও সম্পদের জন্য দ্রুত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চান।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ