• শিরোনাম

    গণক্ষ্যাপামো বন্ধ করুন, দেশকে বাঁচান

    নাইমা নিগার | ২৪ জুলাই ২০১৯ | ১০:২৮ অপরাহ্ণ

    গণক্ষ্যাপামো বন্ধ করুন, দেশকে বাঁচান

    আজকাল খবরেরে কাগজ খুললেই মনে হয় পুরো জাতি যেন একধরনের গণক্ষ্যাপামো বা গণপাগলামিতে ভুগছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Mass Madness’! এই গণক্ষ্যাপামোর আগে বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে দেখা গেছে, যদিও এর সঠিক এবং পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে, মানুষ যখন কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ ছাড়া দলবদ্ধভাবে অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে, তখনই তাকে ম্যাস ম্যাডনেস বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পীড়ন বা উদ্বেগ থেকে এমনটি হয়ে থাকে। তবে উচ্ছৃঙ্খল জনতার আচরণ থেকেও ম্যাস ম্যাডনেসের সূত্রপাত বিচিত্র কিছু নয়।

    ম্যাস ম্যাডনেসের জনপ্রিয় দুটি কেসের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমটি হচ্ছে বহুল আলোচিত সালেম উইচ ট্রায়াল (Salem Witch Trial,1692-93). ১৬৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের সালেম নামের এক গ্রামে অজ্ঞাত কারণে কিছু নারী হিস্টেরিয়ায় আক্রান্ত হতে থাকলে তাদের ডাইনি খেতাব দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এভাবে ওই বছরে প্রায় ২০০ নারীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে গ্রামের অধিবাসীরা বুঝতে পারে, তাদের সেই আদালতের রায় ভুল ছিল। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে তানজানিয়ায়। ইতিহাসে এটি তানজানিয়া লাফটার এপিসোড (Tanzania laughter epidemic 1962) নামে পরিচিত। ১৯৬২ সালে তানজানিয়ার একটা স্কুল ১৫ দিন বন্ধ ছিল। কারণ অজ্ঞাত এক কারণে স্কুলটির শিক্ষার্থীরা হাসি থামাতে পারছিল না, যা পরে আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে।

    এই দুটো ঘটনার সঙ্গে আমি সম্প্রতি আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনার মিল খুঁজে পাই। হঠাৎ করে ছেলেধরা গুজবের নামে দেশে গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সম্প্রতি কুমিল্লার এক স্কুলে ২৫ জন বাচ্চা হাসতে হাসতে অজ্ঞান হয়ে গেল। ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের পুরো জাতি এখন ম্যাস ম্যাডনেসে আক্রান্ত কি না? দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সম্ভাব্য কিছু কারণ তুলে ধরা যেতে পারে:

    ১. চারদিকের খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, সড়ক দুর্ঘটনা মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। তার ওপর রয়েছে আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা। এ কারণে মানুষ বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। বিচারহীনতার বড় একটা উদাহরণ হচ্ছে ক্রসফায়ার। যেখানে আজকাল খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায় অমুক খুন বা অমুক ধর্ষণ মামলার আসামি ক্রসফায়ারে নিহত। এসব খবরে তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তি পাওয়া গেলেও তা দিন দিন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। আদালতের ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। আর এই ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যা পরোক্ষভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকেও উৎসাহিত করছে। যার নিষ্ঠুর পরিণাম এই গণপিটুনি।

    ২. বর্তমানে মানুষের এই হিংস্র আচরণের পেছনে আমাদের গণমাধ্যমের ভূমিকাও একটু ভেবে দেখা উচিত। পত্রিকা, নিউজপোর্টাল কিংবা টেলিভিশন খুললেই যখন আপনি কেবল খুন, ধর্ষণ, গণপিটুনির খবরই বারবার পড়বেন, তখন একজন সধারণ মানুষ হিসেবে আপনার মনের অবস্থাটা কী হতে পারে? খবরের কাগজ খুললে যেন মনে হয় এই দেশে মানুষ মারামারি, খুন ধর্ষণ ছাড়া আর কোনো খবর নেই। এগুলোই যেন দেশের স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের দেশে কি কোনো ভালো কাজ হচ্ছে না? আমি মনে করি, ভালো খবরের তুলনায় গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রচার পায় বেশি। কারণ, সমাজের প্রত্যেক মানুষ যেমন আলাদা, তেমনি প্রত্যেক মানুষের মন-মানসিকতাও ভিন্ন। ভালো খবর যেমন একশ্রেণির মানুষকে প্রভাবিত করে, উজ্জীবিত করে, তেমনি নেতিবাচক খবরও কিছু-না-কিছু মানুষকে নেতিবাচকভাবে উত্তেজিত করে, প্রভাবিত করে। খবর প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে তাই আমাদের আর সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করি। তার মানে এই নয়, নেতিবাচক খবর করা যাবে না। বরং যেকোনো ঘটনার উৎস সন্ধানে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষায়িত বাহিনীর মতোই।

    আমার মতে, মানুষের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের মূল কারণ হচ্ছে পারিবারিক শিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই খুব কম বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের ভালোটার কদর শেখায়। যে দেশে বেশির ভাগ মানুষ তাদের ভালো খবর নিজের কাছে রাখতে চায়-এই কুসংস্কারের ভয়ে যে তা অন্যের নজর লাগবে, সে দেশে ভালো কাজের কদর আমরা করব কীভাবে। অনেক অভিভাবক তাদের ছেলেমেয়ে খারাপ ফলাফল করলে কিংবা পড়ালেখা না করতে চাইলে যেভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশা ব্যক্ত করেন, তার এক ভাগ উৎসাহও তারা তাদের ছেলেমেয়েদের ভালো দিকগুলোর ক্ষেত্রে দেখান না। আর এই নেতিবাচক মনোভাব আমাদের নেতিবাচক খবরের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ায়। আর যেভাবেই হোক, যে-কারণেই হোক গণমাধ্যম বেশি করে নেতিবাচক খবর প্রচারে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

    একটা গণমাধ্যম মানুষের মনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটা উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে কিছু গবেষণার ফলাফল। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৩ সালের দিকে সমাজ-মনোবিজ্ঞানী বান্ডুরা ‘বোবো ডল’ নামের একটি গবেষণায় একটা ভিডিও চিত্রে ‘বোবো’ নামের একটা পুতুলের প্রতি কিছু মানুষের আক্রমণাত্মক আচরণ তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ওই ভিডিও দেখা মানুষজন আক্রমণাত্মক আচরণে উদ্বুদ্ধ হয়।

    গণমাধ্যম কীভাবে আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার আরেকটা উদাহরণ হচ্ছে কপিকাট ইফেক্ট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু গণমাধ্যমের রিপোর্টের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক দেশে খুন, ধর্ষণ ও সুইসাইডের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রভাবের কারণে অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সুইসাইড প্রিভেনশন সংস্থা তাদের মিডিয়াগুলোকে সুইসাইডের খবরের পরিমাণ এবং বিষয়বস্তু প্রচারের ধরন পরিবর্তন করতে বাধ্য করে। তাই বলতে চাই, প্রতিটা খবর প্রচার বা প্রকাশ করা গণমাধ্যমের যেমন দায়িত্ব, তেমনই তার ভাষা বা প্রচারের পরিমাণ, ধরন কতটুকু কেমন হওয়া উচিত, তাও ভেবে দেখার সময় এসেছে!

    ৩. আমার মতে, আমাদের দেশের আজকের এই পরিস্থিতির মূলে রয়েছে বাড়তি জনসংখ্যা ও বেকারত্ব। সরকারের উচিত দ্রুত এই বাড়তি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- জনসংখ্যানীতিতে সরকার অবস্থান বদলেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর আবারও পুরোনো স্লোগানে ফিরে গেছে। ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’। এক দশকের বেশি সময় ধরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মূল স্লোগান ছিল- ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’। সরকারের এই অবস্থান পরিবর্তন দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ওপর প্রভাব ফেলবে বলে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন। আমার কথা হলো, এভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা কি কোনো বিশেষজ্ঞের মতামত নিয়েছেন?
    আমাদের মতো যারা মনোবিজ্ঞানের বা সোশ্যাল সায়েন্স চর্চা করি, পড়াই, গবেষণা করি, তারা নিশ্চয়ই মাসলোর হায়ারার্কি সম্পর্কে জানি। একটা মানুষকে তার পরিপূর্ণ মানবিক বিকাশ লাভের জন্য জীবনের কিছু স্তর পার হতে হয়। আর এই স্তরের প্রথম দিকে আছে মানুষের মৌলিক চাহিদা- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা। এসব মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে মানুষ পরের স্তরে যেতে পারে না। পরের স্তরে রয়েছে, আত্ম-মূল্যবোধ এবং আত্ম-উপলব্ধি। এই বাড়তি জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে না আনা পর্যন্ত এবং বেকারত্ব দূর না করা পর্যন্ত বাংলাদেশের ১০ ভাগ মানুষও এই পর্যায়ে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।

    ৪. এখন বলতে চাই, এই যে আজ মানুষের মূল্যবোধের এতো অবক্ষয়ের দ্বায়ভার কি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এড়াতে পারে? হঠাৎ করেই যে নতুন শিক্ষাপদ্ধতি আরোপ হয় বা পরীক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়, সেগুলো প্রকৃত কোনো শিক্ষাবিদ বা মনোবিদের সঙ্গে আলোচনা করে করা হয়? নাকি এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয় স্তাবকতা ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিকেই! স্কুলে শিশুদের খেলাধুলার জায়গা নেই, ব্যবস্থাও নেই। না আছে অন্য কোনো সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা। কিন্তুখেলাধুলা একটা শিশুর বুদ্ধির বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশের শিশুদেরর সঠিকভাবে বুদ্ধির বিকাশের সুযোগ কম থাকে, সেই দেশের মানুষের ভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব।

    সবশেষে বলতে চাই, এই দেশটাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, পপুলেশন সায়েন্টিস্ট, শিক্ষাবিদ ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নাহলে এই দেশের নতুন প্রজন্মকে সুস্থ ধারায় ধরে রাখা সম্ভব হবে না। আর তা না হলে দেশকেও বাঁচানো যাবে না।

    নাইমা নিগার
    সহকারী অধ্যাপক
    মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
    এবং পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম, যুক্তরাজ্য
    ইমেল: naima.nigar@du.ac.bd
    মোবাইল: +৪৪ ৭৫৮৫ ২৪৬৩৬৮

    [মত-দ্বিমতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব]

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ