সোমবার ২৭শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

ঘাতক পিকআপ জব্দ, চালক-হেলপার এখনও অধরা

মুকুল কান্তি দাশ, চকরিয়া   |   বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ঘাতক পিকআপ জব্দ, চালক-হেলপার এখনও অধরা

সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধনুষ্টান উপলক্ষে বাড়িতে ঠাঙ্গানো হয়েছিলো সামিয়ানা। বুধবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রায় দেড়-দুই হাজার পাড়া-প্রতিবেশিদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিলো শাকান্ন ভোজের। কিন্তু ঘাতক একটি পিকআপ গাড়ির চাপায় এক সাথে পাঁচ সন্তানের মৃত্যুতে সব কিছুই পন্ড হয়ে গেছে। সুরেশ চন্দ্র সুশীলের বাড়িসহ আশপাশের এলাকায় চলছে শোকের মাতন।

হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বাবা মারা গেলে অন্তোষ্টিক্রিয়া থেকে শুরু করে শ্রাদ্ধনুষ্টান সবকিছুই করতে হয়ে সন্তানদের। এই জন্য গতকাল মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আট ভাই-বোন ক্ষুদান্ন দান (ধান, সুই ও ফুল) অনুষ্টানের জন্য আট ভাই-বোন যায় সড়কের পাশে একটি বট গাছের নিচে। যথারীতি তারা ক্ষুদান্ন অনুষ্টানটিও শেষ করে বাড়ি ফেরার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু একটি পিকআপ তাদের বাবার শেষ অনুষ্টান শ্রাদ্ধও করতে দিলো না। সন্তানের পরিবর্তে তাদের কাকা চিত্তরঞ্জন সুশীলকে করতে হলো ভাইয়ে শ্রাদ্ধনুষ্টান।

বুধবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডস্থ হাসিনা পাড়ায় মৃত ডা.সুরেশ চন্দ্র সুশীলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মৃত সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধনুষ্টান উপলক্ষে বাড়িতে ঢুকার পথে একটি তোরণ নিমার্ণ করা হয়েছিলো। সেই তোরণের কাপড় খুলে ফেলা হয়েছে। শুধু বাড়ির উঠানে একটি সামিয়ানা ঠাঙ্গানো রয়েছে। এর মধ্যে চলছে মৃত ডা.সুরেশ চন্দ্র সুশীলের শ্রাদ্ধনুষ্টান। শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতিই পালন করা হচ্ছে। কোন আড়ম্বতা নেই। চারিদিকে শুধু কান্নার শব্দ। মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্লাবন সুশীলকে বাবার শ্রাদ্ধনুষ্টান করার জন্য নিয়ে আসা হলেও সে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় সে বাবাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে পারেনি। চেয়ার নিয়ে এক পাশে বসে রয়েছে মৃত সুরেশ সুশীলের স্ত্রী মৃণালিনী বালা সুশীল মানু। অন্যপাশে স্বামীহারা স্ত্রী ও সন্তানরা কান্নাকাটি করছে। এই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

মৃত ডা.সুরেশ চন্দ্র সুশীলের মেঝ ভাই চিত্তরঞ্জন সুশীল বলেন, বড় ভাইয়ের শ্রাদ্ধনুষ্টান উপলক্ষে গত সোমবার রাতে এসেছি। ভাইকে এভাবে বিদায় জানাতে হবে ভাবতেও পারিনি। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সন্তানদেরই বাবার শ্রাদ্ধনুষ্টান করার নিয়ম। সেখানে আমাকে বড় ভাইয়ের শ্রাদ্ধনুষ্টান করতে হবে চিন্তাতেও ছিলো না।

মৃত ডা.সুরেশ চন্দ্র সুশীলের মৃণালিনী বালা সুশীল কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্বামী গেছে, সন্তানরাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমারও বাঁচার ইচ্ছে নেই। আমি এই ছোট-ছোট নাতি-নাতনিদের মুখ দেখতে পারছিনা। ওদের দিকে থাকাতে পারছিনা। এসময় তিনি তার গুরুতর আহত তিন সন্তানকে বাঁচানোর জন্য সবার সহযোগিতা চান।

প্রত্যক্ষদর্শী বেঁচে যাওয়া ছোট বোন মুন্নি সুশীল বলেন, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃত বাবার শ্রাদ্ধনুষ্টান করার আগে ক্ষুদান্ন ও ক্ষৌড়কর্ম করতে হয়। এই উপলক্ষে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমিসহ আমার ভাই অনুপম, নিরুপম, দিপক, চম্পক, স্মরণ, রক্তিম, প্লাবন ও বোন হীরা সুশীল ক্ষুদান্ন দান করতে বাড়ির অদুরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পূর্ব পাশের্ব বট গাছের নিচে যায়। মুলত সুর্য উদয়ের আগেই এই কাজটি সম্পন্ন করতে হয়। আমরা সবাই ক্ষুদান্ন শেষ করে বাড়ি ফেরার জন্য রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিলাম। দুই সারি করে আমরা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিলাম। প্রথম ভাইয়েরা। দ্বিতীয় সারিতে আমি, ছোট বোন হীরা ও ছোট ভাই প্লাবন। এসময় চকরিয়া থেকে কক্সবাজারমুখি একটি সবজি বোঝাই পিকআপ আমাদের ভাইদের চাপা দেয়। এর পরপর ভাইয়েরা সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলো। পরে ওই পিকআপটি পিছনের দিকে বেক করে আবারও ভাইদের চাপা দিয়ে কক্সবাজারের দিকে পালিয়ে যায়।

এসময় ঘটনাস্থলে মারা যায় চার ভাই অনুপম, নিরুপম, দিপক, চম্পক। গুরুতর আহত হয় স্মরণ, রক্তিম, প্লাবন ও ছোট বোন হীরা। পরে স্থানীয় লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করে মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে গুরুত্বর আহত স্মরণ ও রক্তি কে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওখানে গতকাল মঙ্গলবার রাতে ভাই স্মরণ সুশীল মারা গেছে। আরেক ভাই রক্তিম সুশীল মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছে। জানিনা ওই ভাইকে বাঁচাতো পারবো কিনা। এসব কথা বলতে বলতে মাঝে-মধ্যে হুশ হারিয়ে ফেলছে মুন্নি সুশীল।

একমাস আগে স্মরণের ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সন্তান জন্ম নেয়ার ২১ দিনের মধ্যে নামকরণ করতে হয়। কিন্তু ২১ দিনের মধ্যে বাবা মারা যাওয়ায় সেই নামকরণ অনুষ্টানটিও করা হয়নি স্মরণের। এছাড়াও আগামী মাসে তার বিদেশ যাওয়ার কথাও ছিলো। স্বপ্ন ছিলো বিদেশ গিয়ে টাকা উপার্যন করে একটু স্বাবলম্বী হবে। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো।

প্রায় ৮-১০ বছর আগে পরিবারকে স্বচ্ছল করতে কাতার গিয়েছিলেন দিপক সুশীল। বাবা ডা.সুরেশ চন্দ্র সুশীলের অন্তোষ্টিক্রিয়া করতে না পারলেও শ্রাদ্ধনুষ্টান করার জন্য দেশে ফিরেছে ৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু বাবার শ্রাদ্ধ করতে এসে তার ছোট্ট সন্তানকেই করতে হচ্ছে বাবা দিপক সুশীলের শ্রাদ্ধ।

মৃত ডা.সুরেশ চন্দ্র সুশীলের স্ত্রী মৃণালিনী বালা সুশীল মানু বলেন, গত ২৯ জানুয়ারি সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সাথে আমার ছেলে চম্পক ও প্লাবনের সাথে কথাকাটা হয়। পরে অনুপম সুশীল এসে তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেয়। কিন্তু এই সমঝোতাও মানেনি ওই যুবকরা। ওইদিন রাতে ২০-৩০জন যুবক এসে বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ঘরের টিনের তৈরী বেড়াও ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু কারা সেই যুবক তাদের নাম প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের হুমকি দেয়া হয়েছিলো এলাকা চেড়ে চলে যাওয়ার। আমরা অনেকটা আতংকের মধ্যে দিন কাটিয়েছি।

এই ঘটনার সাথে গাড়িতে চাপা পড়ে সন্তানদের মৃত্যুর মধ্যে কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা বুঝতে পারছিনা। তবে আমার সন্তানদের যারা হত্যা করেছে আমি তাদের সঠিক বিচার দাবি করছি।

মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) শাফায়েত হোসেন বলেন, ঘাতক পিকআপটি জব্দ করা হয়েছে ওই গাড়ির চালক-হেলপারকে আটক করতে সোর্স লাগানো হয়েছে। এঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের ছোট ভাই প্লাবন সুশীল বাদি হয়ে অজ্ঞাত দেখিয়ে চকরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।

তবে, মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে নিহতদের কাকা (চাচা) চিত্ত রঞ্জন সুশীল বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে এখনও থানায় কোন এজাহার দিই নাই। আমার দুই ভাইপো ও এক ভাতিজি হাসপাতালের জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। মামলার বিষয়ে আমরা অবগত না।

এদিকে, বুধবার দুপুরে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-১)আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জাফর আলম, চকরিয়া উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান, ডুলাহাজারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর। এসময় চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউএনও জেপি দেওয়ার প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার করে মোট ১ লাখ ২৫ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দিয়েছেন।

চকরিয়া উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা (ইউ্এনও) জেপি দেওয়ান বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে। আর ওই পিকআপের চালক-হেলপারকে আটক করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে।

এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন কক্সবাজার জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট দীপংকর বড়–য়া পিন্টু, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন, জেলা পুজা উপদযাপন পরিষদের সভাপতি উজ্জল কর, সাধারণ সম্পাদক বেন্টু দাশ, চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, চকরিয়া উপজেলা পুজা উদযাপন পরিষদ।

তারা এটি কি নিছক দূর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

Comments

comments

Posted ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

প্রকাশক
তাহা ইয়াহিয়া
সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
01870-646060
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com