• শিরোনাম

    স্বজন হারিয়ে বাকরুদ্ধ আত্মীয়রা

    চকরিয়ায় বাসের ধাক্কায় মা-মেয়ে ও লেগুনা চালকসহ ৭যাত্রী নিহত

    মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া: | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

    চকরিয়ায় বাসের ধাক্কায় মা-মেয়ে ও লেগুনা চালকসহ ৭যাত্রী নিহত

    ফেনী থেকে যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিল স্টার লাইন পরিবহণের বাস (নং-ঢাকা মেট্টো-ব-১৫-০৬৩৮)। বাসটি চকরিয়ার বরইতলীর নতুন রাস্তার মাথা এলাকায় পৌঁছলে বিপরীতমুখি লেগুনার (ম্যাজিক গাড়ি) এক পাশে ধাক্কা লাগে। ওই ধাক্কায় ম্যাজিক গাড়িটির একপাশ ভেঙ্গে যায়। পরপর দ্বিতীয় দফায় ম্যাজিক গাড়িকে দ্রুতগতির বাসটি ধাক্কা দিলে ছারপোকা হিসেবে পরিচিত ম্যাজিকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এদূর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে নেয়ার পথে নিহত হয় মা-মেয়ে ও ছাত্রসহ সাতজন। আহত হয় চার যাত্রী।
    গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার বরইতলী রাস্তার মাথা এলাকায় মর্মান্তিক দূর্ঘটনাটি ঘটে।
    নিহতরা হলেন-চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের লালব্রীজস্থ পূর্ব বৃন্দাবলখিল এলাকার মঞ্জুর আলমের ছেলে মো.জহির আলম (৩২), হারবাং পাহাড়তলী এলাকার ছৈয়দ আলমের ছেলে মীর কাশেম (২৭), চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের উপর পাড়ার রুহুল কাদেরের ছেলে ও কক্সবাাজর পলিটেকনিক কলেজের হোটল এন্ড ট্যুরিজম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শফিকুল কাদের তুষার (২২), চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির স্টেশন এলাকার আহমদ হোসেনের ছেলে ও লেগুনা চালক খায়ের আহমদ (৪০), চুনতি শাহ সাহেবের দরগাহ গেইট এলাকার মোস্তাক আহমদের স্ত্রী রোখেয়া বেগম (৫৫) এবং তার মেয়ে ও প্রবাসী আবুল হাশেমের স্ত্রী জায়তুন নাহার (৩০) এবং চুনতির পূর্ব সিকদার পাড়া এলাকার মৃত যতীন্দ্র মোহন সিকদারের স্ত্রী বাসন্তী সিকদার (৬৫)। আহতদের স্থানীয় ও চট্টগ্রামের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
    প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার শামীম উদ্দিন বলেন, আমার চোখের সামনেই হৃদয়বিদারক দূর্ঘটনাটি ঘটেছে। আমি দোকানে মালামাল বিক্রয় করছিলাম। এসময় কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছিল যাত্রীবাহি বাস স্টার লাইন। এই গাড়িটি চালানো হচ্ছিল বেপরোয়া গতিতে। চোখের পলকেই ওই গাড়িটি বিপরীত দিক থেকে আসা ম্যাজিক গাড়িকে দু’দফায় ধাক্কা দেয়। এসময় সড়কে রক্ত ছিটকে পড়তে দেখি। সাথে সাথে দোকান থেকে বের হয়ে গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি নিথর হয়ে পড়ে আছে ৭-৮জন নারী-পুরুষ। ওইসময় ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়া লোকজন নিথর কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
    সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ১১টায় দুর্ঘটনার পর চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোকজনের ভীড়। সে ভীড়ের মাঝে কয়েকটি মরদেহ। দুর্ঘটনায় কয়জন মারা গেছে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিলনা কারো কাছ থেকে। কেউ বলছিলো ৪ থেকে ৬জন। আবার কেউ বলছিলো ৮ থেকে ৯ জন। হাসপাতাল থেকে চিরিংগা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে পাওয়া যায় ৫টি মরদেহ। এই পাঁচটির মধ্যে ৩টি মরদেহ চকরিয়া হাসপাতাল থেকে নেয়া হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশও বলতে পারছিলোনা আসলে কয়জন মারা গেছে। লাশের সংখ্যা নিয়ে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি ও ছড়িয়ে পড়ে গুজব। ফলে, দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায় লেগুনায় চালকসহ যাত্রী ছিলো ১১জন। আহত হয় চারজন। আবার হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে ফেরার পরও লাশের সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছিলোনা। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও লোকজনের সহায়তায় বাড়িতে নিয়ে যাওয়া আরো দুটি মরদেহ ফাঁড়িতে আনলে সংখ্যা বিভ্রাটের অবসান ঘটে। নিশ্চিত হওয়া যায় সাতজন মারা গেছে। এলাকার কয়েকশ লোক ছাড়াও হতাহতের আত্মীয়রা পুলিশ ফাঁড়িতে জড়ো হয়। তারা নিকট আত্মীয়দের মৃতদেহ দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সৃষ্টি হয় শোকাবহ পরিস্থিতির।
    দুর্ঘটনায় পতিত গাড়ি দুটি জব্দ করে ফাঁড়িতে আনা হয়। ওই গাড়ির মধ্যে স্টার লাইন বাসের নাম্বারটি হাতের লেখা ছিলো আর লেগুনা বা ম্যাজিক গাড়ির কোন নাম্বার প্লেটই খোঁজে পাওয়া যায়নি।
    স্থানীয় লোকজন জানায়, আজিজনগর থেকে বানিয়ারছড়া পর্যন্ত মহাসড়কটির ভালো হলোও সড়কটি আঁকাবাকা, উচু-নিচু পাহাড় ও সমতল এলাকা দিয়ে গেছে। এই অংশের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ সাইন বোর্ড নেই। হাতেগোনা কয়েকটি থাকলেও তা সহজে নজড়ে পড়েনা। বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্টানের সামনে স্পীড ব্রেকার বা জেব্রা ক্রসিং না থাকায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো হয়। এতে দুর্ঘটনা নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়ালেও স্থানীয় হাইওয়ে পুলিশ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
    চকরিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জুয়েল চৌধুরী বলেন, দূর্ঘটনার খবর শুনেই প্রথমে হাসপাতালে পরে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে যায়। দুটি স্থানে গিয়েও মৃতদের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা যাচ্ছিলনা। কয়েকজনের মরদেহ আত্মীয়রা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ায় সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ফলে, গ্রামের ঠিকানা নিয়ে বাড়িতে গিয়ে মৃতদের পরিচয় ও সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করতে হয়। বিকাল ৩টায় নিশ্চিত হওয়া যায় দূর্ঘটনা ৭জন মারা গেছে।
    চিরিংগা হাইওয়ে পুলিশ জানায়, দূর্ঘটনায় পতিত দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ম্যাজিকটি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। এই গাড়ির চালকও মারা গেছে। বাসের চালক-হেলপার পালিয়ে গেছে। নিহতদের পরিবারের লোকজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
    যেভাবে দূর্ঘটনা:
    স্টার লাইন পরিবহণের বাস ফেনী ও চট্টগ্রাম থেকে যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছিল। বাসটি কক্সবাজারের প্রবেশমুখ চকরিয়ার বরইতলী নুতন রাস্তার মাথা সংলগ্ন সেতু এলাকায় পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে যাত্রী নিয়ে আসা লেগুনা (ম্যাজিক) গাড়িটি সামনে পড়ে। ওইসময় ম্যাজিকটি একপাশ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো। দ্রুত গতির বাসটি ম্যাজিকের বাম পাশে ধাক্কা দিলে কাত হয়ে পড়ে ছোট গাড়িটি। ওইসময় দ্বিতীয় দফায় ম্যাজিককে ধাক্কা দেয় বাসটি। ফলে, ছারপোকাখ্যাত ম্যাজিকটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। হতাহত হয় ১১জন।
    স্বপ্নভঙ্গ:
    বরইতলীর বাসিন্দা ব্যবসায়ী রুহুল কাদেরের দ্বিতীয় সন্তান শফিকুল কাদের তুষার। মেধাবী এই ছাত্র তুষার এসএসসি পাসের পর ভর্তি হয় কক্সবাজার পলিটেকনিক কলেজে। ওই কলেজে হোটেল এন্ড ট্যুরিজম বিষয়ে প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে দ্বিতীয় সেমিস্টারে উত্তীর্ণ হয়। মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পড়ালেখায় ফাঁকি দেয়নি কোনসময়। দুদিন পূর্বে কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরে তুষার। গতকাল মঙ্গলবার বরইতলী বাড়ি থেকে বের হয়ে ম্যাজিক গাড়িতে উঠে হারবাংস্থ খালার বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিল। সেখান থেকে ফিরে কলেজে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলো তার। কিন্তু সড়ক দূর্ঘটনা সকল পরিকল্পনা ও স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে রুহুল কাদেরের পরিবারের।
    পাঁচ মাসের সংসার:
    হারবাংয়ের মো.জহির আলম। দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। বাড়ি ফিরেছেন আটমাস পূর্বে। ঘরে ফিরে বিদেশ থেকে আয় করা অল্প পুঁিজ নিয়ে নিজের এলাকাতেই একটা মুদির দোকান দেন। এই ব্যবসা চালুর পর পারিবারিকভাবে একই এলাকার ফারজানা আক্তারকে বিয়ে করেন পাঁচ মাস পূর্বে। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় সংসার কি তা বুঝার আগেই স্বামীকে হারিয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ফারজানা। মঙ্গলবার বরইতলীর একতা বাজার থেকে মালামাল ক্রয় করে ম্যাজিক গাড়িতে উঠে দোকানে ফেরার পথে প্রাণ হারায় জহির।
    হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে স্বামীর লাশ আনতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন ফারজানা। এসময় তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। একথা বলতে না বলতে মুর্ছা যান ফারজানা।
    মা-বোন হারিয়ে তানজিনার আহাজারি:
    সড়ক দুর্ঘটনায় মা রোকেয়া বেগম ও বড় বোন জায়তুন নাহার মারা গেছে শুনেই স্কুল থেকে চিরিংগা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে আসেন তানজিনা। মা-বোনের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেই কয়েক দফা সঙ্গা হারান তানজিনা। জ্ঞান ফিরলেই চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করছিলো। আহাজারির ফাঁকাফাঁকে আত্মীয়দের জড়িয়ে ধরে বলছিলো আমাকে এখন আদর করবে কে? পড়বে বলবে কে? স্কুলে যাওয়ার টাকা দেবে কে? জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কন্ঠে তানজিনা বলেন,আমি আধুনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেনীতে পড়ি। সকালে মা আমাকে স্কুলে যাওয়ার ও কোচিংয়ের টাকা দিয়ে চকরিয়া সদরে যায় বড় বোনকে নিয়ে। সেখান থেকে ফেরার পথেই দুর্ঘটনার শিকার হয়। আমি এলাকার লোকজন থেকে জেনেই স্কুল থেকে পুলিশ ফাঁড়িতে ছুটে আসি। মনে করেছিলাম মা-বোন দুর্ঘটনায় আঘাত পেয়েছে। কিন্তু এখানে এসে দেখি আমার অতি আপনজন মা ও মেজ আপা আমাকে ফেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে। এসময় কয়েকজন আত্মীয় তানজিনাকে শান্তনা দিতে গিয়ে তারাও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

    দেশবিদেশ /১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮/নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ