শুক্রবার ২৭শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

চাকমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও উন্নতি

তারেকুর রহমান   |   বুধবার, ১১ মে ২০২২

চাকমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও উন্নতি

বাংলাদেশ বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠী ৪৫টি। তন্মধ্যে সর্ববৃহৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলো চাকমা। চাকমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, লোক সাহিত্য, সাহিত্য ও ঐতিহ্য আছে। তাদের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রের নাম পিনোন-হাদি। এই বস্ত্র বিভিন্ন নকশায় বোনে তারা। পোশাকের উপরের অংশকে হাদি আর নিচের অংশকে পিনোন বলে। পিনোনের সঙ্গে চিবুকি নামক সুন্দর নকশাযুক্ত আচল থাকে। হাদির সঙ্গে তারা ব্লাউজ পরিধান করে থাকেন। আর চাকমা আদিবাসী পুরুষরা টন্নে হানি, জুন্নাছিলুম, ধুতি ইত্যাদি পরিধান করে থাকেন।

চাকমা নারীদের কোমর জড়ানো পিনোন আর হাদিতে আলাদা পরিচয় ও ঐতিহ্য বহন করে। পিনোন-হাদিতে তাদের মানায় বেশ আর নৃত্যতে প্রাণ জুড়ায়।

কক্সবাজারে বসবাসরত চাকমা জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান উৎস জুম চাষ। পাহাড়ী অঞ্চলে চাষাভুষা করে তারা সংসার চালায়। সনাতন পদ্ধতিতে তারা চাষাবাদ করে আসছিল। কিন্তু এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন। গরু-মহিষের হাল ছেড়ে এখন ব্যবহার করছেন কলের লাঙল ও ট্রাক্টর। প্রান্তিক এলাকাগুলোতে সীমিত পরিমাণে জুমচাষ হলেও এখন এর ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে। লেখাপড়া করে চাকুরির দিকে ঝুঁকছে অনেক আদিবাসী নারী-পুরুষ। চাকমাদের মধ্যে শিক্ষার হারও দিন দিন বাড়ছে।

কক্সবাজারের উখিয়া জালিয়াপালংয়ে মনখালী চাকমা পল্লীতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারে কেউ না কেউ শিক্ষিত। এখনো লেখাপড়া করছেন বেশির ভাগ ছেলে-মেয়ে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই চাকমা পল্লী থেকে বেড়ে উঠা ছেলে-মেয়েরা অধ্যয়ন করছেন। পেশাশ্রেণি হিসেবে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশেও এই পল্লীর সন্তানরা নিয়োজিত রয়েছেন। শুধু তা নয়, মেডিক্যালে পড়ার স্বপ্নও পূরণ হয়েছে মনখালী চাকমা পল্লীতে বেড়ে উঠা বালকের।

মনখালী চাকমা পল্লীর মুক্তিযোদ্ধে অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মংপোছা বলেন, ‘চাকমাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা এসব চর্চা করি। বিজুসহ বিভিন্ন উৎসবে চাকমা মেয়েরা পিনোন-হাদি পরিধান করে। আর পুরুষেরা টন্নে হানি, জুন্নাছিলুম, ধুতিসহ নানা ধরণের পোশাক পরিধান করে।

তিনি বলেন, ‘দিন দিন আধুনিকতার ছোঁয়া চাকমা পল্লীতেও চলে এসেছে। আগে আমরা গরু-মহিষ নিয়ে হাল চাষ করতাম। এখন মেশিনের ট্রাক্টর নিয়ে হাল চাষ করি। এমনকি মেশিনের সাহায্য ধান থেকে চাল বের করা হচ্ছে। আমাদের ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজমুখী হচ্ছে। চাকমা পল্লীর শিক্ষার হার আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে।

সরকারি চাকুরীজীবী লতাইনু চাকমা বলেন, ‘মা-বাবাকে সাহায্যের পাশাপাশি অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি। অনেকদূর হেঁটে হেঁটে স্কুল কলেজে যেতে হয়েছে। কষ্ট আর পরিশ্রমের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে সুযোগ পেয়েছি। আমি ছাড়াও আরো অনেকজন বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরি করছে। আগে এলাকায় চাকমা ছেলে-মেয়েরা খুব কম লেখাপড়া করতো। এখন দিন দিন বাড়ছে শিক্ষার হার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন এই চাকমা পল্লীর ছেলেরা পড়ছে।

চাকমা পল্লী থেকে বেড়ে সরকারি চাকুরীজীবী বাশিমং চাকমা বলেন, ‘বাবা-মা আমাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন। তাই তারা কষ্ট করে আমাদের মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করেন। তারই ফল হিসেবে আমরা সরকারি চাকরি করে মা-বাবার মুখে হাসি ফুটাতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করছি।

সদ্য মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পাওয়া নেপাল চাকমা বলেন, ‘পরিশ্রমের মাধ্যমে সবই সম্ভব। মা-বাবা যে রাতদিন খেটে আমাদের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন, তাদের কষ্টের ফল হিসেবে আমার পরিবারে একজন বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত, আরেকজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং আমার কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ হয়েছে। আমরা আমাদের ঐতিহ্য ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’

আগে চাকমা পল্লীতে অভিভাবকেরা অসচেতন থাকায় শিক্ষার হার কম ছিল। কিন্তু এখন দিন দিন বাড়ছে শিক্ষার হার। প্রতিদিন দলবেঁধে স্কুলে যায় কোমলমতি ছেলে-মেয়েরা। অজপাড়া গাঁ এই চাকমা পল্লী থেকে সৃষ্টি হয়েছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ থেকে শুরু করে ডাক্তার, ব্যাংকার ও শিক্ষক। তারাও পিছিয়ে নেই। তারা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যের সাথে শিক্ষা-দীক্ষায় নিজেদের প্রমাণ করেছেন উন্নত শিখরে।

Comments

comments

Posted ১২:১২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১১ মে ২০২২

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

প্রকাশক
তাহা ইয়াহিয়া
সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
01870-646060
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com