• শিরোনাম

    অভিযান চলবে দলীয় নেতারাও ছাড় পাবেন না

    চার বছরে সরকারের টার্গেট সুশাসন ও দুর্নীতি দমন

    দেশবিদেশ অনলাইন ডেস্ক | ২৮ অক্টোবর ২০১৯ | ৭:৫৬ অপরাহ্ণ

    চার বছরে সরকারের টার্গেট সুশাসন ও দুর্নীতি দমন

    দুর্নীতি দমন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ লক্ষ্যে দলীয় বা আত্মীয় পরিচয় না দেখে দুর্নীতিসহ সব অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবেন। নানা অপকর্মে জড়িত বিতর্কিত, অনুপ্রবেশকারী ও ‘হাইব্রিড’ নেতাদের বাদ দিয়ে দুঃসময়ে মাঠে থাকা পরিচ্ছন্ন নেতাদের দলের নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের জবাবদিহির আওতায় এনে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরির চেষ্টা করে যাবেন তিনি। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে এমনটা জানিয়েছেন।

    নাম প্রকাশ না করে আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর গণভবনে যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেখ হাসিনা হতাশা প্রকাশ করে দলের দুর্নীতিবাজ নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তাদের কত টাকা লাগে? তারা এত টাকা দিয়ে কী করবে?’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি গত ১১ বছরে অনেক কষ্ট করে বাংলাদেশকে একটা মর্যাদার জায়গায় নিয়ে গেছি। সারা বিশ্ব বাংলাদেশের এই উন্নতিতে বিস্মিত। দলের গুটিকয়েক নেতার কারণে এ অর্জন ম্লান করে দিতে পারি না। এই অর্জন ধরে রাখতেই হবে। তার জন্য আমার যা যা করা দরকার করব। আমার কোনো আত্মীয় যদি দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তাকেও ছাড় দেওয়া হবে না।’

    দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় গত মাসে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার ও সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথকে। একই অভিযোগে যুবলীগের আরো কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের ব্যাংক হিসাব তলব ও জব্দের পাশাপাশি তাঁদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার।

    সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়। গত শনিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে দলের সব পর্যায় থেকে বিতর্কিত নেতাদের বাদ দেওয়ার জন্য নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত কমিটিতে যাতে বিতর্কিতরা কোনোভাবেই স্থান না পান সে ব্যাপারে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর জাতীয় সম্মেলনে নির্দেশটি অনুসরণ করা হবে বলে জানা গেছে।

    বিরোধী দল বিএনপি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী এই অভিযানকে লোক-দেখানো অভিহিত করলেও জনগণ বিষয়টিকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরাও মনে করছেন, এতে তাঁদের ভাবমূর্তি বাড়ছে।

    এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সুধীসমাজের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবীরা। তাঁদের মতে, মধ্যম কিংবা উন্নত আয়ের দেশে পৌঁছতে চাইলে শুধু অবকাঠামোর উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিলেই হবে না, নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের জন্য শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা বিধানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। অন্যদিকে এই পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে গতকাল রবিবার আশ্বস্ত করেছেন দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী।

    আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা তিন মেয়াদে এখন পর্যন্ত যে উন্নয়ন করেছেন তার পুরোপুরি সুফল জনগণ পাচ্ছে না ক্ষমতাসীন দলের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য। তারা সরকারে থাকার সুবিধা নিয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অপকর্ম করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ফলে দৃশ্যমান ব্যাপক উন্নয়ন হলেও এর সুফল ঘরে তুলতে পারছে না সরকার। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি সরকারের অর্জন যাতে ম্লান না হয় এবং জনমতকে পক্ষে টানতে বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা এবং দলকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া, যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে বিরূপ কোনো পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়।

    জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলমান দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে হলে রাজনীতির নৈতিক মান উন্নত করতে হবে। রাজনীতির নৈতিক মান উন্নত করতে হলে এটির সূচনা রাজনৈতিক দলের ভেতরেই করতে হবে। দলগুলোর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা, গণতন্ত্র থাকলে রাজনীতির মান উন্নত হতে পারে। এতে সরকার ভালো হতে পারে, দেশের অবস্থা ভালো হতে পারে।’

    তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আসন্ন জাতীয় সম্মেলন সামনে রেখে একটি পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। নেতা নির্বাচনের ক্ষমতা শেখ হাসিনার হাতে দেওয়া আছে। প্রতিটি পদে দেখা যায় ২০ থেকে ৩০ জন প্রার্থী। এখানে শেখ হাসিনা যদি মনে করেন, তিনি দুর্নীতিতে যুক্ত কাউকে কমিটিতে রাখবেন না, যদি তিনি দুর্নীতিবাজদের কমিটিতে স্থান না দেন, তবে আওয়ামী লীগ কিছুটা শক্তিশালী হবে।’

    জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পরপরই গণভবনে দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ডেকেছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য কী হবে, তা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতি, মাদক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখাবেন। তিনি সেই যে লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় আমরা সম্প্রতি দেখতে পাচ্ছি ব্যাপকভাবে শুদ্ধি অভিযানে প্রশাসনকে কাজে লাগাচ্ছেন। কাউকে তিনি ছাড় দিচ্ছেন না। আত্মীয়-স্বজন ছাড় পাচ্ছেন না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রধানমন্ত্রীর বার্তা বুঝতে পেরেছে। এর আগের মেয়াদগুলোতে যেমন দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে কথার কথা হিসেবে ব্যবহার করা হতো, এবারে কিন্তু সেই অবস্থা নেই।’

    তিনি বলেন, ‘সুশাসন ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশ বা জাতি উন্নয়নের সুফল ঘরে তুলতে পারে না। এখনই সুশাসনের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার সঠিক সময়। সরকারের মাত্র এক বছর চলছে। বাকি আছে আরো চার বছর। সরকারের মাঝামাঝি সময়ে অভিযান শুরু করলে শেষ করতে পারতেন না। এই অভিযান সফলভাবে শেষ করতে পারলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’

    লেখক, বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইনের শাসনের ঘাটতি, গণতান্ত্রিক শাসনের অভাব ও পরিবেশ বিপর্যয়—এই তিনটি বিষয় যদি থাকে, তবে দেশ মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হলেও সেই দেশ সুখ-শান্তির দেশ হবে না। টাকা থাকবে, আয় থাকবে; কিন্তু নাগরিকদের সুখ ও শান্তি থাকবে না।’

    ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার চালায়। দল ঠিক করে দেয় সরকারের নীতি কী হবে, সরকার কিভাবে চলবে। কিন্তু আমাদের এখানে দল নয়, ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিক করে দেন দল কিভাবে চলবে। আমাদের এ ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’

    আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। এই অভিযানে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না, তা স্পষ্ট করে বলেছেন তিনি। ইতিমধ্যে তা প্রমাণিতও হয়েছে।’

    আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আমরা লোক-দেখানো শুদ্ধি অভিযান করছি না। আমরা প্রমাণ করব, আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা প্রমাণ করবেন অপকর্মের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর অবস্থানে আছেন।’ তিনি বলেন, ‘কে কোথায় বসে কোন অপকর্ম করছেন, অপরাধ করছেন তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সময়মতো টের পাবেন, বুঝতে পারবেন। ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নেত্রী ঘরেরটা শেষ করে পরকে ধরবেন। সব আসবে। সব অপরাধী ধরা পড়বে এই জালে।’

    তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আওয়ামী লীগ পর পর তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার কারণে দলে যেসব অনুপ্রবেশকারী উইপোকা ও ছারপোকা ঢুকেছে, তাদের বের করতে হবে। তিনি জানান, দলের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে, সম্মেলন সামনে রেখে তাদের পদ-পদবি থেকে বাদ দিতে হবে। সংগঠনকে পরিষ্কার করতে হবে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মাতারবাড়ী ঘিরে মহাবন্দর

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ