• শিরোনাম

    জেলেদের সহায়তায় ১০ দুর্ধর্ষ জলদস্যুকে আটক করলো র‌্যাব

    শহীদুল্লাহ্ কায়সার | ০৬ নভেম্বর ২০১৮ | ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

    জেলেদের সহায়তায় ১০ দুর্ধর্ষ জলদস্যুকে আটক করলো র‌্যাব

    বঙ্গোপসাগরে জলদস্যু দমনে মাঝি-মাল্লারা এখন একাট্টা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতেও এখন তারা ভয় পাচ্ছে না। গতকাল সোমবার (৫ অক্টোবর) সকালে এমনি একটি অভিযানে মাঝি-মাল্লার সহায়তায় ১০ দুর্ধর্ষ জলদস্যুকে আটক করলো র‌্যাব-৭। উদ্ধার করলো জলদস্যুদের কাছে থাকা ৬ টি দেশীয় একনলা বন্দুক এবং ৩৭ রাউন্ড কার্তুজের গুলি।
    পাশাপাশি ডাকাতদের কবল থেকে রক্ষা করলো দুইটি ফিশিং বোটের ২৮ জন মাঝি-মাল্লাকে। ৩ জন জেলেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আহতদের মধ্যে মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা এলাকার আব্দুল মজিদের হাত জলদস্যুদের ছোড়া গুলির আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। অন্য দুইজনকেও বেদম প্রহার করে জলদস্যুরা। আহত হলেও ভাগ্যক্রমে তিন জেলে আশঙ্কামুক্ত। আটককৃত জলদস্যুরা হলো আব্দুল গফুর, সাইফুল ইসলাম, তারেক, আবুল হোসেন, সৈয়দুল আলম, করিম, জুয়েল, ও নুরুল হক। উল্লেখিত জলদস্যুদের ঠিকানা এবং দুই জলদস্যুর নাম জানা যায়নি।
    চলতি বছরের ২০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র ও গুলিসহ মহেশখালীতে ৪৩ জলদস্যুর আত্মসমর্পণ করে।
    এর অর্ধমাসের মধ্যে ৪ অক্টোবর ঘটতে যাচ্ছিল দুর্ধর্ষ জলদস্যুতার ঘটনা। বিষয়টি র‌্যাব কর্মকর্তাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। যে কোন মূল্যে বঙ্গোপসাগরকে জলদস্যু মুক্ত করতে শীঘ্রই বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার চিন্তা করছে র‌্যাব। এমনটিই জানালেন একজন র‌্যাব কর্মকর্তা।
    এ দিকে, র‌্যাব ১০ জলদস্যুকে আটক করেছে। এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে গতকাল সকালে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়াস্থ ৬নং ঘাটে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়। জলদস্যুদের কবলে পড়া ট্রলার মালিকসহ সাধারণ মানুষ প্রতীক্ষা করতে থাকে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল আটককৃত জলদস্যুদের ৬নং ঘাট থেকে শহরে প্রবেশ করানো হবে। এ কারণেই ৬নং ঘাটের উপর থাকে সবার দৃষ্টি। কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমানসহ ফিশিং বোট মালিক সমিতির নেতারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১২ টা ১০ মিনিটে একটি স্পিড বোট নিয়ে আটককৃত জলদস্যুদের পাশাপাশি উদ্ধারকৃত জেলেদের নিয়ে ৬নং ঘাটে পৌঁছে র‌্যাবের আভিযানিক দল।
    এ সময় জলদস্যুদের ছোড়া গুলিতে আহত জেলে আব্দুল মজিদ এই প্রতিবেদককে জানায়, সে সেলিম বহদ্দারের মালিকানাধীন এফবি রমজান নামক ট্রলারে জেলের কাজ করে। তাদের ট্রলারে মাঝি-মাল্লা রয়েছে ১৩ জন। ওই ১৩ জনকে নিয়ে ৪ অক্টোবর (রবিবার) রাত ১১ টার দিকে বঙ্গোপসাগরের ‘ন ধারা’ নামক অংশে যায়। সেখানে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরেই একদল ডাকাত তাদের বোট ঘেরাও করে। এরপর বোটের পাটাতনে উঠে অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে ফেলে। বেশ কিছুক্ষণ জেলেদের মারধরও করে জলদস্যুরা। একপর্যায়ে ট্রলারে থাকা মাছ ধরার জাল জেলেদের শরীরে পেঁচিয়ে নৌকার পাটাতনের নীচের কোল্ড স্টোরেজে ঢুকতে বাধ্য করে। আব্দুল মজিদ এতে রাজি না হওয়ায় তার হাতে গুলি করে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে বাধ্য করার চেষ্টা করে। এ সময় তাকে মারধর করা হয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল মজিদ জানায়, ডাকাতের দল যে কোন মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখে ট্রলারে থাকা কাঁথার মধ্যে একটি মোবাইল লুকিয়ে রেখেছিল সে। ডাকাতের আক্রমণের পরই ওই মোবাইলে ট্রলার মালিককে সংবাদ দেয়া হয়। পরবর্তীকালে ট্রলার মালিকরা র‌্যাবের সাথে যোগাযোগ করলে র‌্যাব অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। জলদস্যুরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে কোন গুলি ছুড়েছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল মজিদ জানায়, জলদস্যুরা র‌্যাবের উপর আক্রমণ করেনি।
    উদ্ধারকৃতদের জেলেদের মধ্যে আরেকজন হলো রামু উপজেলার রয়ের ঘোনার আব্দুস ছবির পুত্র নুরুল আলম (২৮)। গতকাল এই প্রতিবেদককে নুরুল আলম জানায়, কয়েকদিন আগে সে বখতিয়ার বহদ্দারের ( ট্রলার মালিককে স্থানীয় ভাষায় বহদ্দার ডাকা হয়) বোটে জেলের কাজ পেয়েছে। রবিবার রাতে এফবি রমজানের পাশেই তাদের বোটটি মাছ ধরার জন্য নোঙর ফেলেছিলো। রাত ১১ টার দিকে একটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকার সাহায্যে জলদস্যুরা এফবি রমজান এবং তাদের বোটকে আক্রমণ করে। জলদস্যুর দল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ পরিচালনা করে। এক অংশ উঠে এফবি রমজানের পাটাতনে অন্য অংশ তাদের বোটের পাটাতনে। জলদস্যুদের মারধর থেকে বাঁচার জন্য তাদের বোটের দু’জন জেলে সাগরে লাফ দেয়। বেশ কিছুক্ষণ সাঁতরে তারা অদূরে থাকা অন্য একটি বোটে উঠতে সক্ষম হয়। জলদস্যুর দল আক্রমণ করেছে, এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে অন্য মাঝি-মাল্লারা মাছ ধরা বন্ধ করে দেয়। এরপর একজোটে হয়ে আক্রমণের শিকার বোট দু’টির দিকে ছুটতে থাকতে। এক পর্যায়ে মারণাস্ত্রের ভয় উপেক্ষা করে তারা জলদস্যুদের ঘিরে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে সকাল পর্যন্ত জলদস্যুরা পালিয়ে যেতে পারেনি। সকালে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব জলদস্যুদের আটক করে বলেও জানায় নুরুল আলম। আহত অন্য জেলে হলো কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদ-ি ইউনিয়নের বাঁচা রাখাইন (৪৫)।
    র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্পের ইন-চার্জ মেজর মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বলেন, ‘আটককৃতরা জালাল বাহিনী, মাহবুব বাহিনী এবং আহমদ বাহিনীর সদস্য। বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী এবং কুতুবদিয়া চ্যানেলে ডাকাতি করে।’ অভিযানের আগে অন্য একটি বোট নিয়ে কয়েকজন জলদস্যু পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলেও জানান তিনি।
    কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার কামাল জানিয়েছেন, সাগরের যে অংশ থেকে জলদস্যুদের আটক করলো র‌্যাব। সেই অংশে নিয়মিত ডাকাতি সংঘটিত হয়। এ জন্য সাগরের ওই অংশে র‌্যাব এবং কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
    উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের কাছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহেশখালীর বড় মহেশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কুতুবদিয়ার রমিজ বাহিনী, মহেশখালীর রমিজ বাহিনী, নুরুল আলম ওরফে কালাবদা বাহিনী, আইয়ুব বাহিনী এবং আলাউদ্দিন বাহিনীর আত্মসমর্পণ করে। উল্লেখিত ৬ বাহিনীর মধ্যে কুতুবদিয়ার রমিজ বাহিনী প্রধান রমিজসহ তার ১ সহযোগী, আনজু বাহিনী প্রধান আনজুসহ তার ১০ সহযোগী, কালাবদা বাহিনী প্রধান নুরুল আলম ওরফে কালাবদাসহ তার ৬ সহযোগী, জালাল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ইসমাইলের নেতৃত্বে বাহিনীর ১৫ সদস্য, আইয়ুব বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড আব্দুল মন্নান ওরফে কালুর নেতৃত্বে বাহিনীর ৯ সদস্য এবং আলাউদ্দিন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন রয়েছে আত্মসমর্পণকারিদের তালিকায়।
    এ সময় তাদের হাতে থাকা দেশি-বিদেশি ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৭ হাজার ৬’শ ৩৭ রাউন্ড গোলাবারুদ হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে বেলজিয়ামের তৈরি একটি এসএমজি, ১টি বৃটিশ পয়েন্ট ত্রি এইট রিভলবার, ২টি দেশীয় তৈরি পিস্তল, ৫২টি দেশি-বিদেশি একনলা বন্দুক, ২টি দেশি-বিদেশি দুই নলা বন্দুক, ১৯টি ওয়ান শ্যুটার গান, ১৫টি ত্রি কোয়ার্টার গান এবং ২টি পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেল। ওই ঘটনার এক পক্ষকাল পরেই বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেলে সংঘটিত হচ্ছিল দুর্ধর্ষ ডাকাতি।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ