• শিরোনাম

    ঝড়ের গতিতে ঝড় দেখা

    পাভেল রহমান | ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৯:২১ অপরাহ্ণ

    ঝড়ের গতিতে ঝড় দেখা

    ১৯৯২ সালে নিউ ইয়র্ক এপি হেড অফিস , ৫০ রকফেলার প্লাজায় ১১ তালায় কম্পিউটারে অন্য ফটো এজেন্সির ছবি দেখে নিউজ শুনে রোহিঙ্গা আগমনের খবর প্রথম পেলাম । নিউ ইয়র্কে এপি হেড কোয়ার্টারে ফটো এডিটর বিন আলাবিসো আমাকে নিউ ইয়র্ক কিংবা ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে কাজ করার ব্যাপারে আমার মতামত জানতে চাইছিলেন । কর্ম ক্ষেত্রের ব্যাপারটিতে আমি ছিলাম পরিষ্কার । আমি সব সময়ই একজন নিউজ ফটোগ্রাফার । যেখানে কঠিন শ্রম এবং জীবনের ঝুঁকি নিত্য সঙ্গী । আমার ছবিতে যেমন পানির কল ঠিক হয়ে যায়, রাস্তা ঠিক হয়ে যায়, রুগীর জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি হাসপাতালে ছুটে যান, দেশের গনতান্ত্রিক আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায় , দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে যায় , আমি সেই সব ছবি তুলতে চাই ।
    হোয়াইট হাউস আমার কর্মক্ষেত্র হতে পারে না । সেটি হতে পারে পৃথিবীর প্রচ- ক্ষমতাবান এক রাষ্ট্রপতির সানিদ্ধে থাকার সুযোগ কিন্তু তাঁর চেয়ে অসহায় মানুষের পাশে কাজ করার আনন্দই আলাদা । আর কর্ম প্রতিষ্ঠানটি যদি হয় আন্তর্জাতিক এক নম্বর ফটোনিউজ এজেন্সি ।
    হাঁ আমি এসোসিয়েট প্রেস বা এপি ‘ র কথা বলছি । আমেরিকান বার্তা সংস্থায় ৩০ বছর কর্মরত ছিলাম আমি ।

    যে কথা বলছিলাম, রোহিঙ্গা আগমনের খবরে আমি আমেরিকা থেকে ফিরে এলাম দেশে , শুরু করলাম টেকনাফ আর কক্সবাজারে ছুটাছুটি প্রায় একনাগাড়ে দেড় মাস পরে থাকলাম কক্সবাজার। কক্সবারের প্রতি আকর্ষণ অন্য দশজনার মত আমারও । শুধু রোহিঙ্গা বা সাইক্লোনই নয় ১৯৮৫ সালে আঘাত হেনে বিধ্বস্ত করেছিল উড়ির চড়ে । সেই উড়ির চড়েও পৌঁছে ছিলাম সর্বপ্রথম আমি । বিধ্বস্ত উড়ির চড়ে এক নাগাড়ে ১৫ দিন কাজ করছিলাম কোন রকম নিয়মিত খাদ্য ছাড়াই শুধু মাত্র রিলিফের বিস্কুট খেয়ে । উড়ির চড়ে সাইক্লোনে মৃত্যু মুখ থেকে ফিরে স্বামী স্ত্রীর মহামিলন ঘটে ছিল আমার ক্যামেরার সামনেই । পাহাড়ে ছিল শান্তিবাহিনীর , আর সেই বাহিনীর ছবি তুলেছিলাম আমি । চট্টগ্রাম কক্স বাজারে পাহাড়ের ধ্বস ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা । এসবই আমার চোখে আমার ক্যামেরায় দেখেছিলো সাড়া বিশ্ব ।

    কিন্তু আজ বলবো ১৯৯১ সালে ২৯শে এপ্রিল চট্টগ্রামের উপকূলে আঘাত হানা এক সাইক্লোনের কথা । সে সময় এখনকার মত সাইক্লোনের নাম করন করা হতো না । মাস আর তারিখেই পরিচিতি ছিল সাইক্লোনের । কিন্তু আমি কখনই সাইক্লোন কিংবা ভয়াবহ কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতের জন্য প্রতীক্ষায় থাকিনাই । ছুটেছি জীবন বাজী রেখে ঝড়ের আগেই ঝড়ের দিকে ছুটেছি ছবির খোঁজে । সেই ২৮সে এপ্রিলের রাতে সাইক্লোনের ছবি তুলতে ছুটেছিলাম চট্টগ্রাম উপকূলের দিকে এবং সাড়া বিশ্বে প্রচার করেছিলাম আমি সেই ছবি অবিশ্বাস্য সব বাঁধা বিপত্তি পেড়িয়ে ।

    ১৯৯১ সালের ২৯সে এপ্রিল যে সাইক্লোন আঘাত করেছিল সে কারনেই ২৮সে এপ্রিল সকাল থেকেই ঢাকার আকাশে ছিল দুর্যোগের ঘন ঘটা । দিল্লী অফিস থেকে এপি ফটো এডিটর বারবারা ওয়ালটন টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে নির্দেশ নামা দিয়ে চলেছেন । তিনি বলছিলেন ‘ একটা শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড় তোমাদের বাংলাদেশ উপকূলে ধেয়ে যাচ্ছে । তুমি প্রস্তুতি নেও । ‘ আমি ঢাকায় কালার ডার্ক রুম , ছবি পাঠানোর ফটো ট্রান্সমিটার , পর্যাপ্ত কালার ফিল্ম , ক্যামেরা লেন্স , কালার কেমিক্যাল সহ সব কিছু নিয়ে বিকেলের মধ্যে আমি তৈরি হয়ে যাই ।
    কিন্তু সাইক্লোনের মত বিশাল একটি নিউজ কাভারেজ সহজ নয় । কঠিন ব্যস্তবতা রয়েছে ফিল্ডে । সে সময় পথের সঙ্গী হিসেবে একজন নিউজ পারসন খুব জরুরী । যিনি সহযোগিতায় থাকবেন । তেমনি একজনকে খুঁজছিলাম আমি । মাত্র কদিন আগে জাতীয় নির্বাচন কাভারেজে এসেছেন বেস কজন বিদেশী ফটো সাংবাদিক । আমার ঘনিষ্ট হংকং এর এশিয়া উইকের ক্যাস সাইক্লোন কাভারেজে আসতে চায় কিন্তু ইলেকশন কাভার করতে এসে সাইক্লোন কাভারেজের পারমিশন নিতে হবে হংকং অফিসে । ইচ্ছা থাকলেই তো আর যাওয়া যায় না । চাই বাজেট চাই পারমিশন । কিন্তু ক্যাসের প্রশ্ন ‘ সাইক্লোন কি সত্যি আঘাত করবে ? ‘ আমি বললাম ‘ আল্লাহ ছাড়া কেউ থামাতে পারবে না সাইক্লোনকে ।

    ওকে আর সময় দেয়া নয় । আমি ছুটলাম বুড়িগঙ্গায় । ওখানে নদী নৌকায় যাত্রী পারাপার ছাতা নিয়ে কটা ছবি তুলে ফেললাম । ওয়ার্ল্ড নিউজে সাপোর্ট করবে সেই ছবি । ‘ বাংলাদেশে সাইক্লোন আঘাত করতে যাচ্ছে ‘ এমন নিউজের সাথে ম্যাচ করার জন্য ঐ ছবি । এর মাঝে কথা হলো ইউ এন বি ‘র রিপোর্টার সাইফুল হুদার সাথে । ক্যাস যদি না যায় তাহলে হুদা থাকবে ইউ এন বির পক্ষে । রাত ৮ টায় মহা বিপদ সংকেত ১০ ঘোষণা এলো আবহাওয়া অফিস থেকে । আমি ব্যাগ ঘুছিয়ে ফেললাম ।
    রাত ১০ টা ৩০ মিনিটের চট্টগ্রাম মেইল । অভিজ্ঞতা বলে এসব সময় টিকিট সহজলভ্য । কারন সবাই যখন টিকিট ক্যানসেল করবে আমরা তখন ট্রেন ধরবো । আমাই জানি বাসা থেকে রওয়ানা হবার মুহূর্তে বাবা বলবেন ‘অন্য বারের মত, ‘ ঝড়টা আগে আঘাত করুক তারপর না হয় যাস । বাবা বললেন , ‘ সবাই নিরাপদে আশ্রয় নিতে ঘরে ফিরছে , আর তুই ঘর থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছিস বিপদে ।’ বাবাকে কি বলে সান্তনা দেই । যদি বলি ‘ চিন্তা করবেন না ‘ । তা কি তিনি শুনবেন ? নিউজ ফটোগ্রাফির ব্যাপারটি যে এমনই , স্পটে না গেলে যে ছবি হবে না । এটা তো রিপোর্ট নয় । যে শুনে কাজ হয়ে যাবে ?

    পৌঁছে গেলাম কমলাপুরে । ৪ সীটের একটা বাথ বুক করা ছিল আগেই। ওরা কেউ না এলে ৪ সাইট আমি একাই যাবো । কিন্তু প্রতীক্ষার আগেই এলো ইউ এন বি’ র সাইফুল হুদা , গাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে এলো ক্যাস । জানালা দিয়ে দেখি কেউ একজন বিদেশী দৌড়ে আসছেন আর গার্ড হুইসেল দিয়ে ট্রেন ছাড়ার সবুজ পতাকা উড়াচ্ছে । ছুটে আসতে দেকে ক্যাস কে তুলে নিলাম আমাদের কামড়ায় ।
    আমরা তিনজন একসাথে হতেই সাইক্লোন সাইক্লোন আতঙ্ক টা কমে এলো আমাদের মাঝে । একা এমন একটা সাইক্লোনের মত এসাইনমেনেটে এক ধরনের স্নায়ু চাপ থাকে । তবে সঙ্গী থাকলে রিলেক্স থাকা যায় । যা কাজের জন্য জরুরি । আড্ডায় আডডায় আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম অজানা ভয়াবহ এক বিপর্যয়ের দিকে । আমরা যতই চট্টগ্রামের পথে এগিয়েছি ততই পশ্চিমের আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায় । শুরু হয়ে যায় দমকা আর ঝড়ো হাওয়া । সেই সাথে বৃষ্টির দাপট । রাত ১টার পরপরই বাতাসের গতিবেগ আরও বেড়ে যায় । ধাবমান ট্রেনের গতিকে নিয়নত্রনে নিতে থাকে ঝড়ের গতি । ঝড়ো বাতাসের প্রচ-তায় আমাদের বহনকারী চট্টগ্রাম মেইল আখাউরা স্টেশনে আটকে যায় । ট্রেনের মোটা আর পুরু জানালায় বসে বাইরে দেখি ঝড় নয় বাইরে এক ভয়াবহ প্রলয় । সামনে যা পায় ছিন্ন ভিন্ন ঘর বাড়ী সব সব আকাশে তুলে আবার স্বজোরে আছড়ে ফেলে মাটিতে । একসময় দাঁড়িয়ে থাকা সর্প তুলল ট্রেনটা বাতাসের ধাক্কায় নিজেই উঠলো দুলে ! আমরা সবাই বিস্ময়ে অনুভব করতে লাগলাম আমাদের দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটা কেমন বাতাসে দুলছে !! অবিশ্বাস্য , ভাবা যায় ?

    পকেট রেডিওতে ঝড়ের তা-বের খবরে প্রাণ হানির খবর প্রচার শুরু করেছি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র । আগামী সকাল আমাদের জন্য কঠিন একটা এসাইনমেনট ওয়েট করছে । বাকি সময় টুকু একটু রেস্ট না নিলে আমরা কাজ করতে পারবো না । যদিও ছবি তোলার উত্তেজনায় কিসের ঘুম কিসের কি । সহযাত্রী ক্যাস , ঝড়ের ব্যাপারে ছিল সন্ধিহান সেখানে সেও উত্তেজিত । আমরা একটা ছক কেটে ফেললাম কাল সকালে কোথায় কোন কোন স্পটে যেতে হবে । তারপর ঘুমানোর চেষ্টা । আখাউরা স্টেশনেই সকাল ৮টা বেজে গেলো । স্টেশন কত্পক্ষ জানালেন ট্রেন সিগন্যাল ব্যবস্থা ঝড়ে বিকল হয়ে পরেছে । ট্রেন ছাড়লে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে । তারপরও যাত্রীদের কথা বিবেচনায় ট্রেন ছাড়ার সিধান্ত হলো তবে খুবই শ্লাথ গতিতে চট্টগ্রাম অভিমুখে ।
    পাহারতলি স্টেশনে ঢুকতেই চোখে পড়লো শত শত পাতা বিহীন গাছ । গাছের পাতা সব উড়ে রাজপথে । যতদূর চোখ যায় শুধু পাতা বিহীন গাছ দাঁড়িয়ে । ডাল পালা, ন্যাড়া সব গাছের ফাঁকফোকর গলিয়ে সুদূর টাইগার পাশ দেখা যায় । আমাদের অনুভূতি কষ্টে ভোরে যায় । পরিবেশের এমন বিপর্যয়ে সহজেই বুঝতে পারছি আমরা ঘটনা স্থলের কাছাকাছি ।
    চট্টগ্রাম স্টেশনে নেমেই আমরা ছুটলাম হালি শহরের দিকে । মাইক্রো ড্রাইভার আনোয়ার জানালেন তিনি আমাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ নিয়ে যেতে পারেন । আমরা সবাই সময় নষ্ট না করে দ্রুত পৌঁছে যেতে চাই । কিন্তু চট্টগ্রামের সাংবাদিক ইত্তেফাক এর ওসমান গানি মনসুর কে আমাদের খুব প্রয়োজন । স্টেশন মাস্টারের ফোনে লাইন পাওয়া গেলো না ।

    আমরা ছুটলাম হালি শহরের দিকে। কিছুদূর এগুতেই দেখি মন্সুরও ছুটছে হালিসহরের দিকে । মন্সুর সব সময়ই ভালো একজন গাইড । তাঁকে পেয়ে আমাদের কাজে উৎসাহ বেড়ে গেলো । একটু এগুতেই গত রাতের ঝড়ে বিধস্থ একটা গাছ রাস্তা আটকিয়ে । আমরা গাড়ি রেখে হাঁটতে সুরু করলাম । ক্যামেরা ব্যাগ নিয়ে হাটা পথে । হাইস্কুলের মাঠের কোনটায় চোখ আটকিয়ে যায় । দ্রুত পা চালাই ।
    ১২ কি ১৩ বছরের একজন কিশোরী ফ্রক গায়ে , মরে পরে আছে । প্রথম ছবিটা কি মর্মান্তিক ভাবে উঠে এলো আমার ক্যামেরায় ? । মেয়েটির জন্য এতোটা বেলাতেও কেউ এলো না এখনো ? আহ , কষ্ট পেলে যে চলে না আমাদের । এগুতে থাকি সামনে । তখনো সাগরের জমাট রয়েছে পানি বসত বাড়ীর ছাড়ি দিকে । এক সময় নামতে হলো বুক সমান পানিতেই । বাড়ীর পাশে বড় একটা গাছ তারই নিচে চাপা পরে আছে কেউ । আমি সতর্ক তাকিয়ে দেখি তিনি মৃত হয়েছেন আগেই । ল-ভ- পুরো এলাকা । কান্নার আওয়াজ পাই আরেক টু বাঁয়ে পুকুর ঘাটের পাশের বাড়িটায় । আমার সাথে যারা তারা সবাই নির্বাক । কারো মুখে কোন কথা নাই । একসময় নরম মাটিতে কোদালের শব্দ এসে কানে । তাকিয়ে দেখি ৩/৪ বছরের ছোট্ট দুটি বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে আছে বাবারা । গায়ের গামচ্ছায় সন্তানের কাফন । একই গর্তে যতেœ করে শোয়ানো তারপর মাটি চাঁপা। অবস্থা সম্পন্ন পরিবারের বড় ঘরটা শক্ত ভেবে যে কজন মাথা গুঁজেছিল জীবন বাঁচাতে তারা ১১ জনই মরে গিয়ে প্রমান করলো বাড়িটা কখনই শক্ত ছিলনা ।

    এভাবেই আমাদের ক্লান্তি ধরে আসে । ক্ষুধায় খুঁজি বিশ্রাম । কোথাও খাওয়া জোটে না । পানি নাই বিদ্যুৎ নাই খওয়া নাই । এমন চট্টগ্রাম দেখিনি আগে । আমরা দলবেঁধে স্টেশনে হোটেল গুলিতে হানা দিয়ে খাবার খুঁজি । কিন্তু হায় ৃ।।
    এভাবে বিকেল এলো । বিদ্যুৎ নেই , বেদবুনিয়া ভূ-উপ গ্রহ বিধস্থ – টেলিফোন বিচ্ছিন্ন , কি করে ছবি পাঠাই । দিল্লী অফিস নিশ্চয়ই এতক্ষণে অস্থির হয়ে পরেছে ।ছবি না পাঠানোর অস্থিরতা আমারও কম নয়।
    বিকেলে আবার নামলো মুষল ধারায় । আমরা গাড়ি নিয়ে আটকে গেলাম রাস্তায় । মনসুর ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ গোলাম রব্বানি সাহেব রেড ক্রিসেন্টের প্রধান । তাঁর ওয়ারলেসে খোঁজ নিতে হবে বড় ক্ষয় ক্ষতি ঘটেছে কোথায় ? কমিউনিকেসনের কারনে ছবি পাঠানো না গেলেও বসে থাকার কোন সুযোগ নাই । ছুটতে হবে হন্যে হয়ে অন্য কোথাও । রেড ক্রিসেন্তের ওয়ারলেস ভেসে এলো কুতুবদিয়ার টাটকা খবর । ‘ কেউ বেঁচে নাই ‘ সাহায্য পাঠান ।’
    আমরা ছুটবো কুতুবদিয়া, কিন্তু গাড়ির তেল ? বিদ্যুৎ নেই পাম্পে তেল উঠবে কি করে । ড্রাইভার আনোয়ার তেল আনলো পরদিন সকালে । রাতের খাওয়া পেলাম আমরা আগ্রাবাদে । ভেজা কাপড়ে খালি পায়ে দুপুর আর রাতের খাওয়া একসাথে । কুতুবদিয়ার পথে এলাম আমরা কক্সবাজার , কস্তুরি ঘাটে । সাম্পানে পাড়ি দিতে হবে বাঁক খালি নদীর বিপদ জনক চ্যানেল । সাঁতার না জানার আতঙ্ক নিয়ে উঠতে হবে বোটে । মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমান ভাইয়ের সহায়তায় মন্সুর ভাই জোগাড় করলেন ফিসারিজের ছোট্ট স্পীড বোট ।
    সময় কম ছুটতে হবে তাই দুপুরের খাবার হিসাবে কেনা হল এনার্জি বিস্কুট এর কলা । ছোট্ট স্পীড বোটে ৪ জন আমরা ড্রাইভার সহ ৫ । কক্সবাজার কস্তুরী ঘাট থেকে মহেশ খালি চ্যানেল ক্রস করে কুতুবদিয়া । পথ কম নয় কিন্তু সময় কম !
    বাঁকখালি নদীর মহেশখালী চ্যানেল পাড়ি দিতেই বিপদের মুখে পড়লাম আমরা , আমাদের বোটটা চ্যানেলের খাড়িতে উথাল পাতাল পাগলা ঢেউয়ে আছাড় খেতে লাগলো। আমরা ভিন দেশি, কিন্তু আমাদের চে বেশি আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন ড্রাইভার । খাস চিটাগনিওন ভাষায় তিনি বলে চলেছেন, ‘ আরাঁ তো ওনরে আগে হইলাম ইক্কার তো নুয়ানি বললাই।এহন তো আরাঁ ডুবি যাইমবো,(আমরা তো আপনাকে আগেই বলছিলাম, এদিকে না আসার জন্য,এখন তো আমরা ডুবি যাব) ‘ আমি ঐ বিপদে ভাবলাম আল্লাহ কে ডাকি এবং হাতে গোনা কটা দোয়া পড়তে লাগলাম । পায়ের গাম বুট খুলে ফেল্লাম । ক্যামেরার ব্যাগটাও সরিয়ে রাখলাম পাশে । মন্সুর ভাই জানতেন আমি সাঁতার জানি না । এক সময় মন্সুর ভাই চিৎকার করে আমাকে বলতে লাগলেন ‘ বোট উলটালেও ডুব বে না , আপনি যে ভাবেই হোক বোট ধরে রাখবেন ’ । আমি শক্ত হাতে বোট ধরে রাখার চেস্টা করি । আকস্মিক আমার মাথায় একটা আইডিয়া এলো । আমি চিৎকার করে ড্রাইভারকে বলতে লাগলাম ‘ আপনি বোটের ইঞ্জিনটা বন্ধ করে দিন । ঢেউ আমাদের যেদিকে খুশী নিয়ে যাক ।’ ড্রাইভার আমার কোথা শুনলেন । তিনি দেরি করেননি। স্টার্ট বন্ধ করে ফেললেন মুহূর্তে । আমাদের বোটটা ছিটকে বেড়িয়ে এলো উথাল পাতাল ঢেউ থেকে । শান্ত হয়ে ভাসতে লাগলো আমাদের বোটটা । আমরা মহাবিপদের হাঁত থেকে বেঁচে গেলাম ।
    বেঁচে গেলাম সত্যি কিন্তু আমাদের কুতুবদিয়ার মিশন তো ব্যর্থ হয়ে গেলো । মনটা যখন ভরাক্রান্ত তখন দুরে বেশ দুরে চকোরিয়ার প্রান্তে দেখি একটা রেখা । ৩০০ মিলিমিটার টেলে লেন্স ক্যামেরায় দেখি কিছু মানুষ পানিতে দাঁড়িয়ে । আমরা এগিয়ে গেলাম বোট নিয়ে । তাইত প্রায় ৫০ জন শিশু মহিলা বৃদ্ধ । আমাদের দেখেই বাঁচার আকুতি নিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো সবাই । আমরা ভয় পেলাম আমাদের ৪ জনার বোটে বুঝি উঠবে একসাথে । মন্সুর ওদের সাবধান করলো । বললেন , ‘ আমরা সাংবাদিক, আমাদের কাছে খাবার কিংবা পানি কিছুই নাই , আমরা আপনাদের খবর নিতে এসেছি । ওরা আমাদের কথা বিশ্বাস করলো , ওরা জানালো কাল রাতে তাঁরা ঝড়ে ভেসে এসেছে কুতুবদিয়া থেকে , এখন পযন্ত তাঁরা পানির ভিতর দাঁড়িয়ে । ‘ আমি লক্ষ্য করলাম ওরা সবাই বিধ্বস্ত , ক্লান্ত । ওদের চোখে মুখে তারই ছাপ । আমাদের বোটটা ওদের কাছ ঠে একটু দূরেই থামানো হয়েছে । আমি বোট থেকেই দ্রুত ছবি তুলতে শুরু করলাম এবং দেখলাম একজন মায়ের কোলে ১০ দিনের শিশু । ছবিতে ১০ দিনের শিশু এবং তাঁর মাকে মুখ্য করে আমি ফ্রেম করলাম ছবিটি , আমি ঐ ফ্রেমে বিভিন্ন বয়েসের ক্লান্ত মুখ গুলিকে একই রকম গুরুত্ব দিলাম । ছবি তোলার মুহূর্তে একটি গুরুত্ব পূর্ণ প্রতিক্রিয়া আমার মাঝে ঘটেতে থাকে যা থেকে আমি ছবিটার ম্যারিট বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে উঁটি । এই ছবির তোলার মুহূর্তেও সেই একই প্রতিক্রিরা ঘটলো আমার মাঝে ।

    আমরা আমাদের ছোট্ট বোটে শিশু সহ মাকে তুলে নেই । যদিও ওটা ছিল খুবই কষ্টের একটা সিধান্ত । বিপদে পরা এতো মানুষের মাঝে তাঁদের কে বোটে তোলা । কারন শিশুটিকে বাঁচাতে হবে সেই সাথে তাঁর মাকে । তাঁর মায়ের সাথে আরও অন্তত দুটি শিশু কন্যাকে অন্যদের মাঝে রেখে আসতে হয়েছে । কারন আমাদের বোটে স্থান সংকুলন। শুধু তাই নয় । বোট ওজন বাড়লে কক্সবাজার ফিরতে দেরি হবে । দেরি হলে দিনের আলো থাকবে না তাতে আমরা ঝড়ে বিধ্বস্ত আলোবিহীন কক্সবাজার খুঁজে পাবো না । তাছাড়া অন্ধকারে ভাসমান বাঁশ কিংবা মৃত লাশ স্পীড বোটের প্রপ্লারে আঘাত করলে আমরা বিপদে পরতাম । আর অন্ধকারে পথ হারাতাম ।
    আমরা রাতের আগেই পৌঁছে ছিলাম কক্সবাজার ঘাটে । কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলো মা ও শিশুকে । সেই সময়কার মাননীয় জেলা প্রশাসককে উদ্ধার করা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য প্রতি নজর রাখার অনুরোধ করা হলো । আমরা কক্সবাজার থেকে ছুটলাম ঢাকার পথে রাত ১১টার ট্রেন ঢাকা মেইল ধরতে । ঝড়ে বিধস্থ চট্টগ্রাম অঞ্চলে নেই বিদ্যুৎ , নেই টেলিফোন । আমাদের হাতে সে সময় কোন সেটলাইট ফোন ছিল না যা দিয়ে আমরা ঝড়ের খবর আর ছবি পাঠাতে পারি বিশ্বে ।

    জীবনকে বাজী রেখেই আমরা স্টেশন ছেঁড়ে যাওয়া চলন্ত ট্রেন ধরে ফেলেছি চট্টগ্রাম স্টেশনেই । পরদিন ঢাকা পৌঁছেই ফিল্ম ডেভলাপ করে তা কোলকাতার বিমানের ফ্লাইটে উঠিয়ে দিলাম । উড়াল দিল বিমান কোলকাতায় । কোলকাতায় এপি ফটো এডিটর বারবারা ওয়ালটন হোটেল অভেরয় থেকে সাড়া বিশ্বে ছড়িয়ে দিলেন ১৯৯১ সালের ২৯সে এপ্রিল চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা ঝড়ের ছবি । সারাবিশ্বের মিডিয়ার প্রথম পাতা দখল করে নিলো আমার তোলা ছবি , যার একটি আমেরিকার বিশ্ব বিখ্যাত নিউজ ম্যাগাজিন ‘ নিউজ ইউকের প্রচ্ছদে স্থান পেলো । সেই মা ও শিশু ছবিটি !

    আমার চোখেই বিশ্ববাসী সেই দিন দেখেছিলো আমাদের প্রিয় স্বদেশকে।
    লেখক ঃ পাভেল রহমান, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফটো সাংবাদিক।

    দেশবিদেশ/নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    শেকড় থেকে শিকড়ে

    ০৩ অক্টোবর ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ