• শিরোনাম

    শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নতুন দিগন্ত উন্মোচন

    দক্ষিণ সুদানে যেভাবে প্রশংসিত বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরা

    দেশবিদেশ অনলাইন ডেস্ক | ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৬:৫৯ অপরাহ্ণ

    দক্ষিণ সুদানে যেভাবে প্রশংসিত বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরা

    ‘কুষ্ঠরোগী হিসাবে পরিবার এবং গ্রাম আমাদেরকে ত্যাগ করে। সবাই আমাদেরকে ভুলেই গিয়েছিল, আমাদের দুর্দশার অন্ত ছিল না। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিত্সা সামগ্রী নিয়ে দেবদূতের মত হাজির হলো।’

    এ মন্তব্য দক্ষিণ সুদানের আগক কুষ্ঠরোগী নিরাময় কেন্দ্রের একজন নারী কুষ্ঠরোগী মাজেট ভিওলা’র। স্থানীয় নারী নেত্রী মিস আলেক্স ভিওলার মন্তব্য, ‘ পরিবার-পরিজন রেখে একজন নারী কিভাবে সম্মুখসারীতে যুদ্বরত থাকতে পারেন সেটা আমার কাছে কল্পনার অতীত ছিল। বাংলাদেশি নারীদের সংস্পর্শে এসে আমি অভিভূত হয়েছি। দক্ষিণ সুদানের সামর্থ্যবান নারীদেরকে আমরা সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য উদ্ধুদ্ধকরবো।’

    সম্প্রতি দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ‘আনমিস’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের সম্পর্কে স্থানীয় নারীদের এই অভিমত তুলে ধরা হয়।

    বিশ্বের যুদ্বপীড়িত দেশগুলোতে শান্তিস্থাপনের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার সমন্বিত উদ্দ্যোগের অংশ হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান আগে থেকেই প্রশংসিত। এ কার্যক্রমে পুরুষ সহকর্মীদের পাশপাশি বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরাও গুরুত্বপূর্ণূ ভূমিকা রেখে চলেছেন এবং সম্প্রতি এতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে তাদের অধিকতর অংশগ্রহণে।

    সেনা সদরের তথ্য অনুসারে বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশেরে অন্যান বাহিনী ছাড়াও সেনাবাহিনীর ৬৮ জন নারী সদস্য কমর্রত আছেন। দক্ষিণ সুদানে কর্মরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সদস্যের সংখ্যা ২৭ জন। এদের মধ্যে অফিসার-১১ জন এবং নারী সৈনিক-১৬। দক্ষিণ সুদানে গত বছরে ১০ অক্টোবর প্রথমবারের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সৈনিক শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেয়।

    জানা যায়, দক্ষিণ সুদানের বাহার-আল-গাজাল এলাকায় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৩ (ব্যানব্যাট-৩) এর সাথে নিয়োজিত নারী শান্তিরক্ষীরা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যুদ্ধপীড়িত নারী ও শিশুদের সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের প্রশংসিত কর্মকান্ডের কথা আনমিস মিডিয়া- যেমন ওয়েবসাইট, ফেসবুক, বেতার এবং সংবাদপত্রে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

    দক্ষিণ সুদানে কন্টিজেন্ট কমান্ডারের নিবিড় তত্বাবধানে পরিচালিত নারী শান্তিরক্ষীদের এ দলে রয়েছেন মেডিকেল অফিসার লেঃ কর্ণেল মাসুমা তাসনিম, নারী শান্তিরক্ষীদের (ফিমেল এনগেইজমেন্ট টিম) কমান্ডার মেজর আফরোজা এবং লজিষ্টিক অফিসার মেজর তাজরিনসহ ১৬ জন নারী সৈনিক। দক্ষিণ সুদানে মোতায়েনের আগে ইউনিট এবং বিপসট ( বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিম সাপোর্ট অপারেশসন ট্রেনিং)-এ তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়।

    সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দক্ষিণ সুদানে মিশন এলাকায় যাওয়ার পর থেকে তারা শান্তিরক্ষী বাহিনীর বিভিন্ন অপারেশন কার্যক্রমের পাশাপাশি যুদ্ধপীড়িত জনগণকে সহায়তাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। তাদের এই দক্ষতা ইতোমধ্যেই সেখানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত আনমিস সদর দপ্তর, সেক্টর সদর দপ্তর ও ফিল্ড অফিসসহ সবার মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণ বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদেরকে শুধুমাত্র সাদরেই গ্রহণ করেননি বরং এই নারী দলের কার্যক্রমকে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করে তারা নিজেদের নারী জনগোষ্ঠিকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হয়েছে। এ বছর ২৯ মে তারিখে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে দক্ষিণ সুদানের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রধান, এসআরএসজি ( সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ অফ দ্য সেক্রেটারি জেনারেল ) মিঃ ডেভিড শেহরার দক্ষিণ সুদানের পশ্চিমাঞ্চলে সংঘর্ষ ও সংঘাত অবসানে ব্যানব্যাট ৩ এর সফলতা উল্লেখ করে নারী শান্তিরক্ষীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, নারী শান্তিরক্ষীরা যুদ্বপীড়িত নারীদের সমস্যা অনুধাবন এবং সমাধানে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের সাফল্যের বিষয়টি বিবেচনা করে তিনি বাংলাদেশসহ সকল শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশসমুহকে আরো বেশি সংখ্যায় নারী শান্তিরক্ষী পাঠানোর আহবান জানান।

    শান্তিরক্ষী নারী সৈনিকরা তাদের পুরুষ সহকর্মীদের পাশাপাশি সকল দায়িত্ব- যেমন অস্থায়ী ক্যাম্প পরিচালনা, সীমানা নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তা টহলসহ সকল ধরনের অপারেশনাল কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নির্মমতা নব্য প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ সুদানের সব শ্রেণীর জনগনের জীবনের প্রানোচ্ছলতকে ম্লান করে দিয়েছিল। তারা বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের কাছে পেয়ে প্রাণখুলে তাদের সুখ দুঃখের কথা প্রকাশ করছেন, যা সম্ভবত পুরুষ শান্তিরক্ষীদের জন্য জন্য অত্যন্ত কঠিন হতো। নারী শান্তিরক্ষীরা আগ্রহভরে তাদের সমস্যাগুলো শুনে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে উদ্দ্যোগী হয়। এ রকম উল্লেখযোগ্য কর্মকান্ডের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন এলাকায় অসুস্থদেরকে চিকিত্সা দেওয়া , পশুপালকদের তাদের গবাদি পশু চিকিত্সা ও মানবিক সহায়তা দেওয়া এবং খেলাধুলার সামগ্রী বিতরণ।

    বাংলাদেশী নারি শান্তিরক্ষীদের স্থানীয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আগক কুষ্ঠরোগী নিরাময় কেন্দ্রের অবহেলিত রোগীদের সহায়তার জন্য গত ২৪ ডিসেম্বর ক্রিসমাস উদযাপন এবং মানবিক সহায়তা ও চিকিত্সা সহায়তার আয়োজন করে। ব্যানব্যাট-৩ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশী নারী শান্তিরক্ষীদের সাথে ওই কেন্দ্রের রোগীরা নেচে গেয়ে দিনটি আনন্দের সাথে উদযাপন করেন। বাংলাদেশী নারী সেনাসদস্যরা রোগীদের খোঁজখবর এবং মতবিনিময়ের পাশাপাশি চিকিত্সা সহায়তা দিয়ে মৃতপ্রায় কেন্দ্রটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চারে সক্ষম হন।

    মাজক নামক স্থানে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের সহায়তায় নারী পশুপালকরা যেভাবে উপকৃত হয়েছে তা ক্যাথলিক রেডিও নেটওয়ার্ক (CRN)-এর এক সংবাদে উঠে আসে। এতে একজন স্থানীয় নারী পশুপালককে উদ্ধৃত করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এতদিন জানতাম না কেন আমাদের অসংখ্য গবাদি পশু মারা যায়। আজ আমাদের চক্ষু উন্মোচিত হয়েছে, আমরা ব্যানব্যাটের নারীদের নিকট হতে যে ঔষধ এবং পরামর্শ পেয়েছি সেগুলো আমাদের জন্য অবশ্যই সহায়ক হবে।’

    নারীদের সমতা নিয়ে আন্দোলনরত স্থানীয় নারী নেত্রীরা বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের কর্মকান্ডে উদ্বুদ্ধ। ওয়াও আইনসভার ডেপুটি স্পিকার ও স্থানীয় নারী নেত্রী মিস আলেক্স ভিওলার নেতৃত্বাধীন নারী সংগঠনগুলো বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষী দলের সাথে মতবিনিময় সভাসহ বিভিন্ন সহযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারা বাংলাদেশি নারীদের সৈনিক পেশার মত এমন কঠিন পেশায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দক্ষিণ সুদানের মত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে দায়িত্ব পালনে অর্জিত সফলতা দেখে অনুপ্রাণিত। তারা স্থানীয় নারীদের বাংলাদেশি নারীদের পাদাংক অনুসরণ করে দক্ষিণ সুদানের সেনাবাহিনীতে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করেন।

    সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা আনার নৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের ক্রমবর্ধমানহারে সম্পৃত্ত দ্ধকরার জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলো বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৩ এর সাথে নিয়োজিত নারী শান্তিরক্ষীগণের কর্মতত্পরতা। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্রমোন্নতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও সর্বক্ষেত্রে নারীদের অধিকতর অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। দক্ষিণ সুদানের যুদ্ধক্লান্ত ও বিপর্যস্ত সমাজে যেখানে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সেখানে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীরা তাদের জন্য আশির্বাদ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের সমন্মিত কর্মদক্ষতা দক্ষিণ সুদানের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সার্বিক কৌশল নির্ধারণসহ ক্ষতিগ্রস্থ নারী ও শিশুদের সমস্যা সমাধানের উপায় নির্ধারনে একটি সেতুবন্ধন রচনায় সক্ষম হয়েছে। দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘের তত্বাবধানে বৃহত্তর এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

    দক্ষিণ সুদানের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অফ জেনারেল স্টাফ তাঁর সাম্প্রতিক সফরে বিষয়টি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন এবং বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের প্রদর্শিত দক্ষতা এবং অর্জিত সুনামের প্রশংসা করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আনমিস-এর এসআরএসজি, ফোর্স কমান্ডার এবং ডেপুটি ফোর্স কমান্ডারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও বাংলাদেশী নারী শান্তিরক্ষীদের কার্যকর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

    দেশবিদেশ/নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মাতারবাড়ী ঘিরে মহাবন্দর

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ