বৃহস্পতিবার ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

গ্রামের নাম পানির কোয়া (শেষ পর্ব )

দীনতা আর প্রযুক্তি যেখানকার বাল্য বিয়ের কারণ

শহীদুল্লাহ্ কায়সার   |   বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯

দীনতা আর প্রযুক্তি যেখানকার বাল্য বিয়ের কারণ

ফাইল ছবি

কক্সবাজার শহরের এক প্রান্তের গ্রাম পানির কোয়া। এ কারণে এই গ্রামে অতি প্রয়োজন ছাড়া যান না ভিন্ন এলাকার মানুষ। ফলে গ্রামের মানুষের জীবন মান নিয়ে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিয়মিতই এই গ্রামে ঘটে বাল্য বিয়ের ঘটনা। যার অন্যতম কারণ দীনতা। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারও বাল্য বিয়ের জন্য কম দায়ী নয়। পানির কোয়ায় পঞ্চম শ্রেণি অর্থাৎ ১০ বছর হলেই কন্যা শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হয়। স্থানীয়দের ভাষায় মেয়ে ডঅঁর (অর্থাৎ বড়) অইয়ে (হয়েছে)। ঘরে ঢুকিয়ে নাও। কিছুদিন গৃহস্থালির কাজ শিখে বিয়ে দিতে হবে। এ জন্য প্রাথমিক স্কুলের গ-ি পার হওয়ার পর কন্যা শিশুদের বছর দুয়েক ঘরে রাখা হয়। এ সময় ঘরের মানুষ ছাড়া পরপুরুষের অর্থাৎ বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয় না। এরপর শুরু করা হয় পাত্র দেখে বাল্য বিয়ের আয়োজন। বাল্য বিয়েও দেয়া হয় রীতিমতো ঘটা করে। গ্রামের মানুষসহ প্রতিবেশি উত্তর নুনিয়াছড়ার ধনাঢ্যদের কাছ থেকে নেয়া হয় আর্থিক সহযোগিতা। এরপরই সামাজিকভাবে বাল্য বিয়ের আয়োজন করা হয়।
প্রাথমিকের পাঠ চুকিয়ে কিংবা পড়ালেখা ছেড়ে দেয়ার পর শুধু গৃহস্থালির কাজ নয়। টাকা আয়ের পথেও নামতে হয় গ্রামের শিশুদের। এই গ্রামের পাশেই রয়েছে উত্তর নুনিয়াছড়া শিল্পাঞ্চল। যেখানে ১ ডজনের বেশি শুকনো মাছের ফ্যাক্টরি আছে। এসব ফ্যাক্টরিতে কন্যা শিশুরা মা-বাবার সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। শুরুর দিকেই এসব শিশুদের দেয়া হয় প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। বিনিময়ে আদায় করা হয় ১২ ঘণ্টার কায়িক শ্রম। একটু বড় হয়ে মাছ শুকানোর কাজ পুরোপুরি আয়ত্তে এলে প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে দেয়া হয় মেয়েদের। ছেলেদের দেয়া হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। মাছ থাকলে কাজ। আর কাজ করলেই টাকা। এই নিয়মেই ফ্যাক্টরিগুলো শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে থাকে।
শুধু দীনতা নয়। আধুনিক প্রযুক্তিও বাল্য বিয়ের জন্য সমভাবে দায়ী। ইদানিং এই গ্রামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের হাতে থাকে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন। এই ফোনই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফোনে বিভিন্ন ধরনের প্রেম বিষয়ক ভিডিও ও সংবাদ পড়তে তারা মজা পায়। ফলে প্রেমের নামে শিশুরা বাল্য বিয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এমন তথ্য দিলেন গ্রামটির অদূরে থাকা হাজি হাছন আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল অদুদ।

এই প্রতিবেদককে তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমার বিদ্যালয়ে ৪৬৭ জন ছাত্রছাত্রি আছে। তাদের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণিতে ৪৯ জন অধ্যয়নরত। তাঁদের মধ্যে ১০-১৫ জনের বেশি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। বাকিরা শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়বে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষকের মতে, উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতেই একজন ছাত্রছাত্রিকে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ভর্তি ফিস দিতে হয়। পানির কোয়ার অভিভাবকদের পক্ষে যে ব্যয় বহন করা অসম্ভব। বাল্য বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্লাস ৪ এবং ৫ এর শিক্ষার্থীদের আমরা এই বিষয়ে কাউন্সেলিং করি। পাশাপাশি তাদের মা-বাবাদেরও বাল্য বিয়ের কুফল সম্পর্কে অবহিত করে চলেছি।

কক্সবাজার পৌরসভার ১ ও ২ নং ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) সিরাজুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, বাল্য বিয়ে নিরোধ করার জন্য আমরা চেষ্টা করি। বিয়ে পড়ানোর আগে বর ও কনের জন্মনিবন্ধন, ভোটার আইডি কার্ড (এনআইডি), পাসপোর্ট, স্কুল সার্টিফিকেট গ্রহণপূূর্বক যাচাই করি। উল্লিখিত কাগজপত্র না থাকলে শৈশবে টিকা (ভ্যাকসিন) দেয়ার কার্ডও হলেও আমাদের দেখাতে হয়। এরপর স্বাক্ষীদের স্বাক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কাবিননামা সম্পাদন (বিয়ে রেজিস্ট্রি) করি।

উত্তর নুনিয়াছড়ায় বাল্য বিয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকাটিতে বাল্য বিয়ের হার খুব বেশি। ২০ অক্টোবর ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প- করে দেয়া বিয়েটি পড়ানোর জন্য আমাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। দারিদ্র এবং শিশুদের আধুনিক মোবাইল ফোনের সাহায্যে ইন্টারনেটে আসক্তির কারণে এই এলাকায় বাল্য বিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না।
২০ অক্টোবর ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প- করে দেয়া বিয়ের কনের সৎ পিতা আবুল কালাম বলেন, মেয়ের সঙ্গে বাগদানকৃত যুবকের ৫ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক। ওর সমবয়সীদের অনেকেই পড়ালেখা করে। মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হচ্ছে। এলাকার অবস্থা বুঝে স্কুলে পাঠাচ্ছি না। বিয়ের উপযুক্ত হওয়ায় ঘরে ঢুকিয়ে নিয়েছি। তাঁর পালিত মেয়ের ভোটার আইডি কার্ড এবং জন্মনিবন্ধন সনদ নেই বলেও জানান আবুল কালাম।

স্থানীয় দোকানদার মোঃ জসিম এই প্রতিবেদককে জানান, অভাবের কারণে এই পাড়ার মেয়েরা অল্প বয়সেই পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। এরপরই তাদের বিয়ে দেয়া হয়।
স্থানীয় আরেক দোকানদার মোহাম্মদ তৈয়ব জানান, অভাবের কারণে বেশিরভাগ মেয়ে পড়ালেখা ত্যাগ করে। যোগ দেয় সামুদ্রিক মাছ ভিত্তিক বিভিন্ন কাজে। যাদের পরিবার একটু সচেতন ও স্বচ্ছল, শুধু তারাই উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখা করে।
পানির কোয়া যুব সমাজ নামে একটি সংগঠনের সভাপতি স্থানীয় যুবক শাহাবউদ্দিন। এই প্রতিবেদক তাঁর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি সেটি ঠিক। আজ (২০ অক্টোবর) ফর্দ (বাগদান) করেছে। তিন বছর পর বিয়ে হবে।

Comments

comments

Posted ৯:২৩ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক : তাহা ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
০১৮১২-৫৮৬২৩৭
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com