• শিরোনাম

    নাফ নদ নির্ভর হাজারো জেলে তালিকা থেকে থেকে বাদ

    নুরুল আমিন সিকদার, টেকনাফ | ৩০ এপ্রিল ২০১৯ | ১:০০ পূর্বাহ্ণ

    নাফ নদ নির্ভর হাজারো জেলে তালিকা থেকে থেকে বাদ

    নাফ নদ নির্ভর জেলেদের হাহাকার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্তে প্রশাসনের কড়াকড়িতে আড়াই বছরের বেশি সময় নাফ নদী থেকে মাছ শিকারে বঞ্চিত রয়েছে জেলেরা। এরই প্রেক্ষিতে নাফ নদী নির্ভর জেলেদের তালিকা তৈরী করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ তালিকা তৈরীতে দেখা মেলে ব্যাপক কারচুপি। বেশ কিছু প্রকৃত জেলেদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত না করে, জেলে নয় এমন ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট মেম্বার চেয়ারম্যানদের গাফেলতি কারণে হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া প্রায় ১২ শ জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে হাজার হাজার জেলে তালিকার বাইরে রয়েছেন।
    রফিক আহমদ (৫০)। বয়সের অর্ধেকের বেশি প্রায় ৩০ বছর ধরে নাফ নদীতে মাছ শিকার করে সংসার চালাতেন। নাফ নদী তাঁর ও পরিবারের একমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদক ছিল। নাফ নদী থেকে মাছ শিকার করে বাজারে বিক্রির টাকায় ছেলে মেয়ের ভরণপোষন হতো। হঠাৎ তাঁদের জন্য মানবিক দূর্যোগ হয়ে এসেছে লাখো রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে সৃষ্ট সহিংসতায় ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে পানির ¯্রােতের মতো এদেশে পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। পাচার হয় ইয়াবা। এই দুই কারণে তখন থেকে প্রশাসন নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ রেখেছে। কোনো মুহুর্তে মাছ শিকার সম্ভ হচ্ছেনা। অনাহারে ও অর্ধাহারে রয়েছেন রফিক। তিনি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার নজির হোসেনের ছেলে।
    উত্তরপাড়া মৃত অজি উল্লাহর ছেলে মোহাম্মদ হোসেন। কর্মঠ এক জেলে। নাফ নদীতে মাছ শিকারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তার ঘরে হাহাকার বিরাজ করছে। ছেলে মেয়েদের শিক্ষা চিকিৎসা প্রায় বন্ধ।
    জীবনের অধিকাংশ সময় মাছ শিকার করায় অন্য কোনো কাজকারবার তার জানা নেই। তাই এ পেশায় দিনাতিপাত করার একমাত্র হাতিয়ার। শুধু ওই দুইজন নয়, শুধুমাত্র হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ২৮০ বা ৩’শ জন জেলে রয়েছে। নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ থাকায় জেলেদের সুযোগ সুবিধা প্রদানের জন্য গেলো বছরে তালিকা অন্তর্ভুক্তিকরণ করে মৎস্য অধিদপ্তর। এই অন্তর্ভুক্তিকরণে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের শুধুমাত্র দুই নম্বর ওয়ার্ড থেকে অন্তভূক্তি হয়েছে ৭৬ জন জেলে। বাকিরা এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারেনি। আবার তালিকায় অনেকেই জেলে নন এমন ব্যক্তিরা তালিকায় অন্তভূক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রকৃত একাধিক জেলে। তাদের মধ্যে রফিক জানান লম্বাবিলের আজিজুর রহমানের ছেলে আবু তাহের, মোহাম্মদ সুলতানের ছেলে মোহাম্মদ আলী জেলে না হয়ে তালিকায় অন্তভূক্তি হয়ে বিশেষ ভিজিএফের সুবিধা গ্রহণ করেন। অথচ আসল জেলেরা না খেয়ে অর্ধহারে ও অনাহারে মারা যাচ্ছেন। তারা ভিজিএফ পাচ্ছেন না। অপর দিকে নকল জেলেরা ভিজিএফের সুবিধা নিচ্ছেন। এসব যাচাই বাছাই করার দাবী জানান তিনি। নাফ নদী নির্ভর বেশ কয়েক হাজার জেলে থাকলেও অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন মাত্র ১১৪১ জন জেলে। এর বাইরেও হাজার জেলে তালিকাভুক্তিকরণ বা রেজিস্ট্রারের বাইরে রয়েছেন।
    টেকনাফ মৎস্য অফিস থেকে জানা গেছে, পূর্বে জেলেদের সংজ্ঞা ছিল, বছরে নূন্যতম ৬ মাস সাগরে বা নদীতে মাছ শিকার করলে তাদেরকে জেলা বলা হবে। সম্প্রতি এ সংজ্ঞাকে ৩ মাস করা হয়েছে। যে সব জেলে এই সংজ্ঞার আওতায় আসবে তাদেরকে পরবর্তীতে রেজিষ্টার বা তালিকাভুক্তি করা হবে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া জেলেরা দীর্ঘদিন ধরে মাছ শিকার করতে না পেরে অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছে। কিছুদিন আগে শাহপরীরদ্বীপে অভাব অনটনের কারণে এক জেলে আতœহত্যা করেছে। জেলেরা জানান, যে জন্য মাছ শিকার বন্ধ রেখেছে, তা মোটেও সফল হয়নি সরকার। ঠিকই রোহিঙ্গারা নাফ নদীর এপার ওপার করছে। সেই সাথে ইয়াবার বড় বড় চালান এ দেশে ঢুকেছে। তারা দ্রুত মাছ শিকারে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
    হোয়াইক্যং ২ নং ওয়ার্ড বঙ্গবন্ধু জেলে পরিষদের সহ সভাপতি আলী আজগর বলেন, ‘গুটি কয়েকজন জেলেদের তালিকাভুক্ত করে দু‘য়েকবার ভিজিএফ দেওয়া হয়েছে। যা অপ্রতূল। জেলে নয়, তাদের বাদ দিয়ে প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্ত করে প্রতিমাসে সরকারের বরাদ্দ দেওয়ার দাবী জানান। অন্যথায় দ্রুত মাছ শিকারে ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।’
    খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইয়াবা ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অজুহাতে টেকনাফের নাফ নদীতে মাছ শিকার বন্ধ থাকায় অর্ধাহারে অনাহারে জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় ১০ হাজার জেলে। গত আড়াই বছর পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার ফলে রোহিঙ্গারা দলে দলে এদেশে পালিয়ে আসার প্রেক্ষিতে বন্ধ রাখা হয়েছে জেলেদের মাছ শিকার। একটানা মাছ শিকার বন্ধ থাকার ফলে নাফ নদ নির্ভর জেলে পরিবারগুলোতে নেমে আসে দূর্দশা। জীবন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে। বিকল্প কোন আয়ের উৎস না থাকায় জেলে পরিবারের মধ্যে চলছে হাহাকার।
    টেকনাফে বেশ কয়েকটি জেলে পাড়া রয়েছে। এরমধ্যে হোয়াইক্যংয়ের লম্বাবিল, হ্নীলার হোয়াব্রাং, নাটমুড়া পাড়াস্থ জেলে পাড়া, জাদীমুরা, খারাংখালী, টেকনাফের জাইল্যাপাড়া, কায়ুকখালী পাড়া, নাজির পাড়া, সাবরাংয়ের চৌধুরীপাড়া, নয়াপাড়া, শাহপরীরদ্বীপের জাইল্যা পাড়া, খারিয়াখালী, মাঝের পাড়া অন্যতম। হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আনোয়ারী বাদ পড়া জেলেদের অন্তর্ভূক্তের দাবি জানান।
    বিজিবি জানিয়েছে সরকারের নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত কোনো ধরণের মাছ শিকারের কোন সুযোগ নেই।
    টেকনাফের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জেলেরা নাম নদীতে মাছ শিকার করতে না পেরে দূর্বিসহ জীবনযাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন ১৪৪১ জন জেলেকে রেজিস্ট্রাড করা হয়েছে। তাদেরকে ইতিমধ্যে সাহায্য সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। যে সব জেলে বাদ পড়েছে তাদেরও পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি জেলেদের মাছ শিকারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হয়েছে।
    এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রবিউল হাসান জানান, বিভিন্ন কারণে জেলে সম্প্রদায়েরা মাছ শিকার করতে পারছেনা। তবে মন্ত্রণালয় থেকে মতামত জানতে চাইলে জেলেদের পক্ষে (মাছ শিকারের জন্য) সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সেবাদানকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানদের জেলেদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ