বৃহস্পতিবার ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

নিভে গেল মানবিকতা ও জ্ঞানের বাতিঘর

তোফায়েল আহমদ   |   শনিবার, ০৫ অক্টোবর ২০১৯

নিভে গেল মানবিকতা ও জ্ঞানের বাতিঘর

সেদিন মঞ্চে প্রবীণ মহাথেরর পার্শ্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সত্যপ্রিয় মহাথের তার বক্তৃতায় বলেন-‘ আপনারা ইতোমধ্যে জেনেছেন, বিগত ২৯ সেপ্টেম্বর রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ায় বৌদ্ধ বিহার সমুহে তান্ডবলীলা চালিয়ে আগুনে সর্বস্ব ধ্বংশ করে দেয়া হয়েছে। এমন তান্ডবলীলায় আমরা হতবাক।’
তিনি বলেন-‘কিছু বলার ভাষা আমার নেই। আমার নিজের জীবনও সেই রাতে বিপন্ন হয়েছিল। কোন রকমে পালিয়ে রক্ষা পেয়েছিলাম। ১৯৭১ সালের পাক হানাদাররাও এই বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে হাত দিতে সাহস করেনি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪০ বছর পর আমাকে নিগৃহিত হতে হলো বাঙ্গালী স্বজাতির কাছেই। এ দুঃখ আমি রাখব কোথায়-প্রশ্ন এই প্রবীণ বৌদ্ধ ভিক্ষুর।’
২০১২ সালের ৮ অক্টোবর রামু খিজারি হাই স্কুল মাঠে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীকে পার্শ্বে রেখে অনেকটাই ক্রন্দনরত কন্ঠে বলেছিলেন সদ্য প্রয়াত দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা সত্যপ্রিয় মহাথের। আমার এখনও কেবল কানে বাজে বয়োবৃদ্ধ এ ভিক্ষুর সেই কথাটি। সেদিন বড় ভান্তে যখন মঞ্চে উঠছিলেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁকে সন্মান দিয়ে তুলে নিয়েছিলেন। বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাতে ফেসবুকে বড় ভান্তের প্রয়ানের কথাটি শুনে মনে হয়েছে যেন-একজন অত্যন্ত আপনজনকে হারালাম।
সেই ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের ভয়াল ঘটনার পর উপর্যুপরি কয়েক মাসতো প্রতিদিনই রামু সীমা বিহারে গিয়েছি। একটি বড় চেয়ারে বসে থাকতেন তিনি। ভক্তদের সময় দিতেন,পরামর্শ দিতেন। বলতেন অমূল্য বাণীর কথা, মনিষীদের কথা। মনে হচ্ছে, সত্যিই একজন জ্ঞানের পাহাড়-মানবিকতার বাতিঘর আজ নিভে গেল। সীমা বিহারে গেলেই বড় ভান্তে আমাকে দেখা মাত্রই ডাক দিতেন-‘এই যে কালের কন্ঠ হাজির।’
প্রধানমন্ত্রীর সাথে মঞ্চে বক্তৃতা দেয়ার একটি ছবি আমি বাঁধাই করে ভান্তের জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। নবনির্মিত সীমা বিহারে এ বছরের প্রথমার্ধে যখন যাই তখন অপরাহ্ন ১২ টার আগে বড় ভান্তে খাবার (ছোয়াইন) খাচ্ছিলেন। আমি এবং আমার এক সঙ্গীকে দেখে ঈশারায় চেয়ারে বসতে বললেন। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি দেখিয়ে দিচ্ছিলেন দেয়ালে আমার দেয়া সেই বাঁধানো ছবিটির দিকে। আবারো বললেন-এইতো কালের কন্ঠ। ভান্তের কাছে যেন ছিলাম আমি নিজেই একজন ‘কালের কন্ঠ।’ আমার নামই ‘কালের কন্ঠ।’ আবার মাঝে মধ্যে নামটা ধরেও ডাকতেন। এমন বয়সে কি রকম প্রখর স্মৃতি শক্তি ছিল তাঁর।
আমার মনে পড়ে, ২৯ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াল হামলার ঘটনার পর পরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর অসুস্থ বড় ভান্তে বিমান যোগে কক্সবাজার থেকে রাজধানী ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (পিজি হাসপাতাল) নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্ত্তি করা হয়েছিল। এর আগের দিন যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রামুর সীমা বিহার পরিদর্শনে গিয়ে ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এসময় ভিক্ষুর অসুস্থতার কথা জানতে পেরে মন্ত্রী তাঁকে সরকারি খরচে চিকিৎসা করা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
রামু সীমা বিহার পরিচালনা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তরুন বড়ুয়া জানান, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এই প্রবীণ ধর্মীয় নেতা গত ২৯ সেপ্টেম্বরের সহিংস ঘটনার সময় ৩০০ বছরের পুরানো সীমা বিহারটি অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেয়ার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। একই বছরের ২ নভেম্ব^র এশিয়ার তিনটি দেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভিক্ষুকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু শারিরিক ও মানসিক কারনে তাঁর যাওয়া হয়নি।
ভিক্ষু বিহারটির অধ্যক্ষ হিসাবে এখানেই একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী গড়ে তুলেছিলেন। এ লাইব্রেরীতে ৫ হাজার ধর্মীয় গ্রন্থ ছিল। এটিও সেই অগ্নিকান্ডে পুড়ে গেছে। এরপর থেকে উচ্চ রক্ত চাপ সহ নানা রোগে তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়েন। মাঝে-মধ্যেই পা ফুলে যেত। ভিক্ষুর ঘনিষ্টজনদের মতে, সেই যে ২৯ সেপ্টেম্বর রাতের মনোবেদনায় তিনি ভেঙ্গে পড়েছিলেন, সেই বেদনা আর তাঁকে ছাড়েনি। যে বেদনায় নিরবেই তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যান। কি জানি হয়তোবা মনোবেদনা নিয়েই বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাতে (৪ অক্টোবর ২০১৯) তিনি এক প্রকার অভিমান করেই পরপারে চলে গেলেন। পরপারে ভাল থাকুন, একুশে পদকে ভূষিত জ্ঞান-গরিমার বাতিঘর পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের।
ঃ লেখক -তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজারে দৈনিক কালের কন্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি।

Comments

comments

Posted ১:০৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৫ অক্টোবর ২০১৯

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সেই মা সেই ছবি
সেই মা সেই ছবি

(537 বার পঠিত)

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক : তাহা ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
০১৮১২-৫৮৬২৩৭
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com