মঙ্গলবার ৯ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

একাত্তরে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসামী মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাসেম

প্রথমবার মৃত্যু থেকে বেঁচেও আবারো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন

দীপক শর্মা দীপু   |   রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯

প্রথমবার মৃত্যু থেকে বেঁচেও আবারো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অগনিত মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস অনেকে জানেন না। জানেনা বর্তমান প্রজন্মের সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধেও প্রকৃত ইতিহাস। এই মুক্তিযুদ্ধ কারা করেছিল। কেমন করে অংশগ্রহণ করেছিল তারা। আর স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে তাঁদের অবদান কি তাও জানা নেই। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও লেখা হয়নি অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস। কক্সবাজারে তালিকাভুক্ত সাড়ে তিনশত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। ইতিমধ্যে অনেকে মারা গেছেন।
এই সাড়ে তিনশত মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে কয়জনের ইতিহাস প্রজন্মদের জানা আছে এবং কয়জনের ইতিহাস লেখা হয়েছে। যে সব মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন তারা তাদের ইতিহাস দেখে যেতে পারেননি। আর যারা বেঁচে আছেন তারাও হয়তো বেশিদিন আর বেঁচে থাকবেন না। অন্তত তাদের জন্য ইতিহাস লেখা না হোক সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের তাদের স্মৃতি নিয়ে লেখা অনস্বীকার্য।

যেসব মুক্তিযোদ্ধার ঘটনাবলী কেউ কখনো লেখেনি তাঁদের একজন হচ্ছেন আবুল কাসেম। যিনি ডাঃ কাসেম নামেই বেশী পরিচিত। তিনি কক্সবাজারের উখিয়ার হলদিয়া পালং ৯নং ওয়ার্ডের পশ্চিম মরিচ্যা গ্রামের প্রয়াত মকতুল হোসেনের পুত্র। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তখন তিনি পালং মডেল হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। এসময় তিনি স্কুলের জি.এস’র দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষন আর অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষনা শুনে তিনি মনস্থির করেন তিনি পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। পাকিস্থানীর কবল থেকে দেশকে স্বাধীন করতে যুদ্ধে যাবেন। দেশের চেয়ে মৃত্যু তার কাছে বড় নয়। ‘‘যুদ্ধে প্রাণ দেব তবু দেশের তরে লড়বো’’- মনে এমন শক্তি সঞ্চয় করে তিনি যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত।
বঙ্গবন্ধু সব অফিস আদালত বন্ধ রাখার ঘোষনা দিলেও কিছু পাকিস্থানপন্থী কর্মকর্তা কর্মচারি সেই ঘোষনা মানেননি। এমন একটি ঘটনা হচ্ছে দারিয়ারদিঘী ফরেষ্ট এর ফরেষ্টার এসএম শফিকুর রহমান নিয়মিত অফিস করেন আর স্থানীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে নানাভাবে নির্যাতন করেন। একদিন স্থানীয় ১০/১২ জন বাঙ্গালীকে বেঁধে রাখেন ফরেষ্ট অফিসে। এমন খবর পেয়ে আবুল কাসেম তার স্কুলের অর্ধ শতাধিক ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে ফরেষ্ট অফিস থেকে সাধারণ মানুষদের মুক্ত করে নিয়ে আসেন। এসময় ফরেষ্টার ও গার্ডরা বন্দুক উঁচিয়ে গুলি করতে চাইলে আবুল কাসেম সহ অন্যান্যরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়ে এসব বন্দুক ছিনিয়ে নেন।

পাক সরকার এই খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়। আবুল কাসেমকে প্রধান আসামী করে রাষ্টদ্রোহী মামলা করা হয়। এই মামলার অন্যান্য আসামীরা হচ্ছেন ধোয়া পালং এর হাজি আবদুল গনির পুত্র নুরুল হাকিম, পাগলির বিলের আলী আকবর, রামুর ধেছুয়া পালং এর সৈয়দ আকবরের ছেলে মির আহমেদ হেলালী, ধেছুয়া পালং এর মকবুল আহমদের পুত্র সোনা আলী, ধেছুয়া পালং মহব্বতের পুত্র সৈয়দ আহমদ, মরিচ্যা পালং এর গোলাম হোসেনে পুত্র আমির হামজাসহ আরো অনেকে।
রাষ্ট্রদোহী মামলার পর আবুল কাসেমসহ অন্যরা আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু আবুল কাসেম ভাবলো আত্মগোপন করে পালিয়ে থাকলে যুদ্ধে যাওয়া হবেনা আর দেশও স্বাধীন করা যাবেনা। তিনি এই সময় তার সহযোদ্ধাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন এই বলে, ‘ ভীতু হয়ে বাঁচার চেয়ে দেশের জন্য লড়াই করে মরাই হবে বড় প্রাপ্য ও প্রশান্তি। তারা এবার দেশ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে সংঘবদ্ধ হয়। কি করে তারা যুদ্ধে যাবে এমন ভাবনার সময় তার বড় ভাই ক্যাপেটন আবদুস ছোবহান পালিয়ে থাকা এসব মুক্তিকামী ছাত্রদের খুঁজে নিলেন। পাহাড়ে থাকা সোনাইছড়ি প্রাইমারী স্কুলে ১৫ দিন ট্রেনিং দেয়া হয়।
এরপর এসব স্কুল ছাত্ররা অন্যান্য বড়দের সাথে ক্যাপ্টেন ছোবহানের নেতৃত্বে যুদ্ধে নেমে পড়েন। একের পর এক অপারেশন চালাতে থাকেন। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন ছোবহান দুইজনকে গোয়েন্দার দায়িত্ব দেন। এই দুইজন হচ্ছেন আবুল কাসেম ও নির্মল কান্তি দাশ। তারা ছদ্মবেশে উখিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় ক্যাপ্টেন ছোবহান তাদের বলেছিলেন, ‘‘ সাবধান, মানুষের সাথে মিলেমিশে শত্রুদের অবস্থান, গতিবিধি ইত্যাদি সংগ্রহ করে এক সপ্তাহের মধ্যে আমার কাছে রিপোর্ট প্রদান করবে।’’

সেইদিন ছিল উখিয়ার রুমখার সাপ্তাহিক হাটবাজার। লোকে লোকারণ্য। কিন্তু এতো মানুষের ভীড়েও দালাল বাহিনী তাদের চিনে ফেলে। ২০ জনের একটি বাহিনী এসে ধুরুংখালী থেকে আবুল কাসেম ও নির্মল দাশকে ধরে ফেলে। কৌশলে পালিয়ে আবুল কাসেম পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়। নির্মলও পালিয়ে স্থানীয় নাপিত পাড়ায় একটি বাসায় লুকিয়ে থাকে। তখন রাজারকার বাহিনী ঘর জ¦ালিয়ে দেয়, ঘরে গুলি করে। একসময় নির্মল নরপশুদের হাতে ধরা পড়ে। তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় ভুট্রো মহাজনসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিকামী মানুষকে ধরে নিয়ে যায়। অসহ্য নির্যাতনের পর টেকনাফের নাইট্যং পাহাড়ের চুড়ায় তাদের নিয়ে গিয়ে হত্যা নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
সেই সময় আবুল কাসেম নিশ্চিত মৃত্যুরমুখ থেকে বেঁচে যায়। তখন সহযোদ্ধারা ভাবলো মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়া আবুল কাসেম হয়তো আর যুদ্ধে অংশ নেবেনা। পালিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাদের ভাবনাকে হার মানিয়ে তিনি পরের দিন ক্যাম্পে ফিরে এলেন।
প্রথম ধাক্কার মৃত্যুভয় তাকে কাবু করতে পাারেনি। দ্বিতীয়বারের মতো মৃত্যুকে বরণ করতে দেশের তরে যুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। অকুতোভয় এই ভয় বীর মুক্তিযোদ্ধার মনে দ্বিগুন সাহস নিয়ে একের পর এক অপারেশনে অংশ নেন।
ক্যাপ্টেন আবদুস ছোবহানের নেতৃত্বে গেরিলা পদ্ধতিতে শুরু হয় অভিযান। আবুল কাসেমও গেরিলা অভিযানে অংশ নেন। জোয়ারিয়ানালা লালব্রিজ অপারেশন, ঈদগাঁও ব্রিজ

অপারেশন, টেকনাফ থানা অপারেশন, লামা থানা অপারেশন, ডুলাহাজারা সেতু অপারেশন, রামু থানা অপারেশন, উখিয়া থানা অপারেশন, মহেশখালী, কুতুবদিয়া থানা বিজয়, পালং বহুমুখী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপনসহ ১১ টি অপারেশনে অংশ নেন আবুল কাসেম। এসব অপারেশনে অংশ নেন শমশের আলম চৌধুরী, এডভোকেট আহমদ হোসেন, মোক্তার আহমদ, জাফর উল্লাহ চৌধুরী, বখতার আহমদ চৌধুরীসহ আরো অসংখ্য যোদ্ধা।
উখিয়া টেকনাফের বিভিন্ন স্থান থেকে শত্রুপক্ষের ৬ জন আটক করা হয়। এর মধ্যে দুইজন পালিয়ে গেলেও পানেরছড়া ঢালায় (বর্তমান সেনানিবাসের গেইট) ৪ জনকে হত্যা করে আবুল কাসেমসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা। সর্বশেষ কক্সবাজার শহর শত্রুমুক্ত করা অভিযান ও প্রথম পতাকা উত্তোলনে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারি আবুল কাসেম ছিলেন ১ নং সেক্টরের ৭৯৩৯ নং রেজিমেন্টালের কমান্ডার ক্যাপ্টেন আবদুস ছোবহান গ্রুপের ৪ নং প্লাটুনের ১২ নং সেকশনের সেকশন কমান্ডারের ট্্্আুইসি ছাত্র। ####

Comments

comments

Posted ১২:২১ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক : তাহা ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
০১৮১২-৫৮৬২৩৭
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com