• শিরোনাম

    বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় নিউ জিল্যান্ডের তরুণী

    দেশবিদেশ অনলাইন ডেস্ক | ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৯:৩৫ অপরাহ্ণ

    বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় নিউ জিল্যান্ডের তরুণী

    চীনা বংশোদ্ভূত নিউ জিল্যান্ডের নাগরিক এমিলি অ ইয়ং। বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারী বিশেষ করে পোশাক কারখানায় কর্মরত নারীদের ঋতুস্রাবকালীন ভ্রান্ত ধারণা ও সংক্রমণ দূর করতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। দিয়ে যাচ্ছেন সেবা। তৈরি করছেন সচেতনতা। সম্প্রতি নিউ জিল্যান্ডভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্টাফ-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘ঋতুস্রাবকালীন দারিদ্র্য বিশ্বজুড়েই এক সমস্যার নাম, সেকারণে এ নিয়েই কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।’

    বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঋতুস্রাব নিয়ে শ্রমজীবী ও দরিদ্র নারীদের মধ্যে নানা ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। ঋতুস্রাব চলাকালীন নিজেদেরকে ‘অস্পৃশ্য’ বলে মনে করেন অনেকে। এ নিয়ে লজ্জায় ভোগেন তারা, বিভিন্ন জটিলতাকে নীরবে সহ্য করে যান। তাছাড়া, অর্থের অভাবে স্বাস্থ্যকর স্যানিটারি প্যাড তারা কিনতে পারেন না। ঘরোয়াভাবে অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে শিকার হন নানা সংক্রমণের। এসব নারীদেরই পাশে দাঁড়িয়েছেন এমিলি।

    এমিলির বয়স মাত্র ২৬ বছর। রীমি নামের একটি চ‍্যারিটি ট্রাস্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এ ট্রাস্টের লক্ষ্য হলো, অসহায় নারীদের ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্যকর পণ্য সরবরাহ ও তাদের শিক্ষা প্রদান করা। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন পরিবেশবাদী, পোশাক কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীরা। অ-ইয়ং বলেন, ‘আমি করপোরেট দুনিয়ায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে পারতাম, অনেক অর্থ উপার্জন করতে পারতাম। কিন্তু আমি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছি। কারণ আমি উপলব্ধি করেছি, যে সুযোগ-সুবিধা ও দক্ষতা আমার আছে, তা আমাকে দেওয়া হয়েছে।’

    অ ইয়ং-এর বাবা ছিলেন চীনা শরণার্থী। ৬০ এর দশকে দুর্ভিক্ষ চলার সময় চীন থেকে পালিয়ে আসে তার বাবার পরিবার। এমিলির মা ছিলেন নিউ জিল্যান্ডের নাগরিক। ছোটবেলাতেই মাকে হারিয়েছেন। বাবা আর সৎ মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন এমিলি। পড়াশোনা করেছেন মাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে, উন্নয়ন অর্থনীতি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে ক্রসরোড ফাউন্ডেশনের হয়ে হংকং-এ বেশ কয়েক বছর কাজ করেছেন তিনি।

    একটি প্রগতিশীল দেশ ও পরিবারে জন্ম হওয়াকেই নিজের সুবিধাপ্রাপ্তির কারণ বলে মনে করেন এমিলি। তিনি মনে করেন, সুবিধা-বঞ্চিত ও গৎবাঁধা ধারণায় বিশ্বাসী পরিবারে জন্ম নিলে তিনি আজ এ জায়গায় আসতে পারতেন না। এমিলি অং ইয়ং জানান, তার সৎমা একজন চিকিৎসক। তার কাছ থেকেই নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে শিক্ষা পেয়েছেন। পালমারস্টন নর্থ গার্লস স্কুলে পেয়েছেন লৈঙ্গিক সমতাজনিত দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা।

    বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারীদের ঋতুস্রাবকালীন পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এমিলি জানান, স্যানিটারি প্যাডের বদলে অস্বাস্থ্যকর কাপড় (ন্যাকরা) ব্যবহার করা হয়। এমন পরিবেশে তারা থাকেন যে, সে কাপড়ে ইঁদুরের বিষ্ঠা থেকে শুরু করে ফাংগাস পর্যন্ত সব কিছুই থাকতে পারে। বেশিরভাগ সময় না ধুয়েই ঋতুস্রাবের সময় সে কাপড় পরে ফেলেন তারা। এমিলি বলেন, ন্যাকরা পড়ার কারণে নারীদের গোপনাঙ্গে সংক্রমণ তৈরি হয়। তারা তখন কাজে যেতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে তাদের ঝামেলা তৈরি হয়। এ বিষয়গুলো এমিলি অ ইয়ংকে খুবই ব্যতিত করেছে।

    এমিলি অং ইয়ং জানান, ঋতুস্রাবকালীন দারিদ্র্য নিয়ে তিনি সর্বপ্রথম কাজ করেছেন ২০১৫ সালে। হংকংয়ের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের হয়ে সিরীয় শরণার্থীদের সহায়তা করেছেন। তিনি জানান, জর্ডানে তাদের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে শুনেছেন, স্যানিটারি পণ্যের অভাবে শরণার্থী শিবিরের নারীরা কিভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলো।

    এমিলি অ ইয়ং বিশ্বাস করেন, শিক্ষাই পারে সচেতনতা তৈরি করতে। সেজন্য ঋতুস্রাবকালীন দারিদ্র্য দূর করতে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মরত নারীদের ক্লাস নিয়েছেন তিনি। এমিলি বলেন, ‘যতবারই আমরা ঋতুস্রাব নিয়ে ক্লাস নিয়েছি, ততোবারই দেখেছি নারীরা কাঁদছে। কারণ, এর কারণে তাদের শরীরের কী ক্ষতি হচ্ছে সেটা তারা প্রথমবারই জানতে পেরেছে। এমনকি মায়েরাও মেয়েদের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ করেন না। তাদের কাছে ঋতুস্রাবের সময়টা অশুচির।’

    এমিলি অ ইয়ং জানান, কিছু কিছু কারখানা এখন তাদের নারী শ্রমিকদের জন্য স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা রাখতে শুরু করেছে। কারণ, এক্ষেত্রে কারখানারই লাভ। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা ন্যাকরা ব্যবহারের সংক্রমণজনিত কারণে প্রতি মাসে ছয়দিন ছুটি কাটাতে বাদ্র হয়। এতে উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়, যা স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা রাখার মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব।

    চ্যারিটি ট্রাস্ট রীমির মাধ্যমে নতুন স্যানিটারি পণ্য তৈরি করতে চান এমিলি। এগুলো এমনভাবে তৈরি করা হবে যা সাংস্কৃতিকভাবে উপযোগী, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং সাশ্রয়ী। এর জন্য ২০১৯ সালের প্রথম কয়েক সপ্তাহ হংকংয়ে কাটাবেন তিনি। এ ধরনের স্যানিটারি পণ্য তৈরিতে সহায়তা করতে পারবেন, এমন মানুষদের খুঁজবেন এমিলি। এরপর জানুয়ারির শেষের দিকে পণ্যের নকশা তৈরি করতে অকল্যান্ড যাবেন।

    এমিলি অ ইয়ং জানান, ব্যর্থতাকে তিনি ভয় করেন না। কারণ, তিনি জানেন, বিশ্বের সফল মানুষরা হোঁচট খেতে খেতেই সফলতা পেয়েছেন। হাসতে হাসতে এমিলি বলেন, ‘আমি যদি ব্যর্থ হই, তবে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে আরও ভালো কিছু করতে পারব।’

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ