• শিরোনাম

    গ্রামের নাম পানির কোয়া

    বাল্য বিয়ে যেখানে নিত্য নৈমিত্তিক

    শহীদুল্লাহ্ কায়সার | ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ১০:৩০ অপরাহ্ণ

    বাল্য বিয়ে যেখানে নিত্য নৈমিত্তিক

    বিহাহের গেইট

    পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর আর বাঁকখালীর মোহনা। পূর্বে জোয়ার-ভাটার বাঁকখালী নদী। মাঝখানে ছোট ছোট ঘর। প্রায় তিন দশক আগে এখানে প্রথম কয়েকটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেন কয়েকজন বাসিন্দা। এরপর হুহু করে বাড়তে থাকে ঘরের সংখ্যা। পরিণত হয় শহরের ভেতরেই এক গ্রাম। গ্রামটির নাম উত্তর নুনিয়াছড়া পানির কোয়া। যে গ্রামে বসবাসকারীর সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি হবে না।

    সবাই কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা। তবুও তাঁদের জীবনে পড়েনি নগরায়নের ছাপ। অশিক্ষা আর কুসংস্কার যেন এই গ্রামের বাসিন্দাদের ছাড়ছে না। বাল্য বিয়ে এখানে স্বাভাবিক ব্যাপার। গ্রামটিতে বাল্য বিয়ে রীতিমতো মহামারির আকার ধারণ করেছে। শুধু মেয়ে শিশু নয়। কিশোর ছেলেরাও শিকার হচ্ছে বাল্য বিয়ে নামক এই অপরাধের।

    গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে বাল্য বিয়ে কোন খারাপ বিষয় নয়। যেন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকানো শেষ হলেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আর কিছুটা আয় রোজগার করতে পারলেই ছেলেদের জন্য ঘরে বউ নিয়ে আসা হয়। সবকিছুই হয় পারিবারিক ও সামাজিক সম্মতিতে। শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া এই গ্রামের বাসিন্দারা বিশ^াস করেন মেয়েদের পড়া-লেখা করিয়ে লাভ নেই। একটু বড় হলেই বিয়ে দিতে হবে।

    পাশাপাশি ছেলেদেরও বেশি পড়ালেখা করানো উচিৎ নয়। বেশি পড়ালেখা করলে মা-বাবার দেখভাল করবে না। এই কারণে কিশোর বয়সেই ছেলেদের কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। যাতে আয় করে পরিবারকে সহায়তা করতে পারে। পরিবারের চাপে বাল্য বিয়েই নয়। এই গ্রামের শিশুদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের মতো ঘটনাও ঘটছে। প্রেমের নামে ছোট-ছোট ছেলে মেয়েরা ঘর থেকে পালিয়ে যায়। অন্য কোন জায়গায় গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করে। এরপর আবার নিজ গ্রামে ফিরে আসে। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপে গত ২০ অক্টোবর একটি বাল্য বিয়ে বন্ধ করা হয়। তবে তা স্বল্প সময়ের জন্য। ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। বর এবং কনের পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে ৩ বছরের একটি চুক্তি হয়। যে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, ৩ বছর পর নির্ধারিত পাত্রের সঙ্গেই কিশোরি মুন্নির বিয়ে সম্পন্ন হবে। যদিও স্থানীয় এক বাসিন্দা বললেন, চুক্তির কথাটি লোক দেখানো। ইতোমধ্যে স্থানীয় এক কাউন্সিলরের সহায়তায় পৌরসভা থেকে মেয়ের নামে জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করা হয়েছে। যাতে মেয়ের বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়।

    কিশোরি শারমিন আক্তার মুন্নির বিয়ের মাত্র ৩ দিন আগেও এলাকাটিতে আরো একটি বাল্য বিয়ে হয়। যেটি নিরোধ করা যায়নি। স্থানীয় বদিউল আলমের অপ্রাপ্ত বয়স্ক (নাম প্রকাশ করা হয়নি) মেয়ের বিয়ে হয় স্থানীয় এক ছেলের সঙ্গে। তারও কয়েক মাস আগে আরো এক চতুর্থ শ্রেণি পড়–য়া মেয়ের বিয়ে হয়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে এলাকাটিতে বাল্য বিয়ে হচ্ছে।

    পানির কোয়া নামক এলাকাটিতে বাল্য বিয়ের এতোই স্বাভাবিক যে, বাসিন্দাদের কাছে এটি কোন অপরাধ নয়। ২০ অক্টোবর এই প্রতিবেদক গ্রামটিতে গেলে স্থানীয় অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। কেউই বিষয়টিকে অস্বাভাবিক মনে করেন না। অনেকেই উল্টো বলেন, স্কুলে দেয়ার সময় মেয়ের বয়স কম দেখানো হয়। কিন্তু মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত। তাই বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আবার অনেকেই বলেন, সামাজিকভাবে এখানে বাল্য বিয়ে হয় না। বাল্য বিয়ের শিকার অধিকাংশ ছেলে-মেয়েই প্রেম পরবর্তী পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। এলাকাটির একমাত্র সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে, হাজি হাছন আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে গিয়ে জানা যায়, এই বিদ্যালয়ে পড়–য়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জীবনের প্রাথমিক স্তরেই সীমাবদ্ধ। প্রাথমিকের পাঠ চুকিয়ে মেয়েদের সংসার জীবনের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। ছেলেরা কাজে জড়িয়ে পড়ে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ