শুক্রবার ২৭শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

৯ অক্টোবর সংঘদান ও পেটিকাবদ্ধ অনুষ্ঠান : রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে আনা হয়েছে মৃতদেহ

বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের আর নেই

আল মাহমুদ ভূট্টো,রামু   |   শনিবার, ০৫ অক্টোবর ২০১৯

বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের আর নেই

বাংলাদেশী বৌদ্ধদের তৃতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ও উপসংঘরাজ,কক্সবাজারের রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহা বিহারের অধ্যক্ষ, একুশে পদকপ্রাপ্ত, উপসংঘরাজ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথেরো আর নেই। দীর্ঘ ৭০ বছরের ভিক্ষু জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) দিনগত রাত পৌনে একটার দিকে ঢাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ (পিজি) হাসপাতালে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। এ মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের বৌদ্ধ সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে।
শুক্রবার বিকাল ৩টায় পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র মরদেহ রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে আনা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টায় পূণ্যদান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়াত ভিক্ষুকে বিহারে প্রবেশ করানো হয়। আগামী ৯ অক্টোবর সংঘদান ও পেটিকাবদ্ধ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

গতকাল শুক্রবার (৪ অক্টোবর) বেলা পৌনে তিনটার দিকে এই বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু সত্যপ্রিয় মহাথেরর মরদেহ রামুতে পৌঁছলে শোকাহত হাজারো বৌদ্ধ নারী-পুরুষ সহ সর্বস্তরের জনতা ও প্রশাসনিক কর্তকর্তা এবং রাজনীতিবিদরা প্রবীণ এ বৌদ্ধ ভিক্ষুর মরদেহ’র প্রতি সম্মান ও ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। পৌনে তিনটার দিকে প্রয়াত ভিক্ষুর মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সটি রামু বাইপাসে পৌঁছালে হাজারো বৌদ্ধ নারী-পুরুষেয় মাঝে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ফুলেল শ্রদ্ধায় রামু বাইপাস এলাকা থেকে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুর মরদেহ উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের মেরংলোয়া গ্রামে রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে নিয়ে আসা হয়। এ সময় বৌদ্ধরা প্রবীণ ধর্মীয় গুরুকে এক নজর দেখতে ভিড় করে বিহার প্রাঙ্গনে। বৌদ্ধ সম্প্রদায় ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুকে দেখতে যান। পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র মরদেহ রামু বাইপাস এলাকায় পৌঁছালে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ছুটে যান কক্সবাজার সদর- রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল, উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, রামু থানার ওসি মো. আবুল খায়ের,ওসি তদন্ত এস.এম. মিজানুর রহমান, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফরিদুল আলমসহ রামুর গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বৌদ্ধ নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে মরদেহ রামু বাইপাস থেকে রামু সীমা বিহারে নিয়ে আসা হয়।

তাঁর শিষ্য রামু সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, হঠাৎ করে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কেবিন ব্লকের ৩২০ নম্বর কক্ষে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ২১ সেপ্টেম্বর করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিও) নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার একটু উন্নতি হওয়ায় গত মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) তাকে পুনরায় কেবিনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে একটার দিকে তিনি পরলোক গমন করেন। ২০১৫ সালে সমাজ সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য প্রয়াত এই বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু একুশে পদক লাভ করেন।
জানাগেছে, সত্যপ্রিয় মহাথের ১৯৩০ সালের ১০ জুন কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের পশ্চিম মেরংলোয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হরকুমার বড়–য়া এবং মাতার নাম প্রেমময়ী বড়–য়া। তিনি তার বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠতম। তার পিতৃদত্ত নাম বিধু ভূষণ বড়–য়া। ১৯৫০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসাবে উপসম্পদা গ্রহণ করে সত্যপ্রিয় মহাথের নাম ধারণ করেন। এর পর তাঁর গুরু ভান্তে আর্য্যবংশ মহাথেরর সঙ্গে তিনি চলে যান উখিয়ার ভালুকিয়া বৈজয়ন্তি বিবেকারাম বৌদ্ধ বিহারে। ওই বিহারের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহন করেন পন্ডিত সত্যপ্রিয় । সেখানে কয়েক বছর থাকার পর তিনি পড়াশুনার জন্য মির্জাপুর পালি কলেজে চলে যান। এর পর ১৯৫৪ সালে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য মিয়ানমারে চলে যান। প্রায় ১০বছর পর ১৯৬৪ সালে মিয়ানমার থেকে ফিরে সেই থেকে রামু সীমা বিহারে অবস্থান গ্রহন করেন। সেই থেকে দীর্ঘ ৭০ বছরের ভিক্ষু জীবনে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সত্যপ্রিয় মহাথের ১৯৫৫ সালে মিয়ানমারের ধর্মদূত পালি কলেজে অগ্রমহাপন্ডিত উ. বিশুদ্ধায়ু মহাথের ও প্রজ্ঞালোক মহাথেরর কাছে পালি ভাষা ও বিনয় শিক্ষা লাভ করেন। এ মহান পূণ্যপুরুষ পৃথিবীর বহু ভাষায় পারদর্শী। বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ ত্রিপিটকের বিভিন্ন অধ্যায় থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন সত্যপ্রিয় মহাথের।
এছাড়া ২০০৬ সালে বাংলাদেশী বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংগঠন বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সভাপতির পদ লাভ করেন। তিনি সমাজসেবায় একুশে পদক, ২০১৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ ছাত্র সংসদ কর্তৃক শান্তি পুরস্কার, ২০১০,সমাজসেবায় অবদানের জন্য মায়ানমার থেকে ‘অগ্গমহাসদ্ধর্মজ্যোতিপতাকা’, ২০০৩ সম্মাননা সহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।

এছাড়া তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রাখেন শ্রীমৎ সত্যপ্রিয় মহাথের। যুদ্ধ-চলাকালীন তিনি এলাকার সহস্রাধিক অসহায় ও নির্যাতিত মানুষকে ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পুড়িয়ে দেওয়া ঐতিহ্যবাহি পুরাতন সেই কাঠের বিহারে আশ্রয় দেন। এ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাঁর বাকবিতন্ডাও হয়।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সাধারণ সম্পাদক রাজু বড়–য়া জানান, শুক্রবার বিকাল ৩টায় পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র মরদেহ বিহারে আনা হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টায় পূণ্যদান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়াত ভিক্ষুকে বিহারে প্রবেশ করানো হয়। এসময় বিহারের নির্ধারিত আসনে শয়নদান করা হয় প্রয়াত ভিক্ষুকে। শয়নদান অনুষ্ঠানে পূণ্যদান করেন, বিজয় রক্ষিত মহাথের, প্রিয়রতœ থের, সারমিত্র মহাথের, সুনন্দপ্রিয় থের, করুণাশ্রী থের, প্রজ্ঞাবোধী থের, শীলপ্রিয় থের ও প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু। আগামী ৯ অক্টোবর সংঘদান ও পেটিকাবদ্ধ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

এ বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথেরর প্রয়াণে গভীর শোক,সমবেদনা ও তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেছেন রামু কক্সবাজার আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল।
তিনি বলেন, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় গুরু পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের শুধু একজন ধর্ম সংস্কারক নন,তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ট সমাজ সেবক। তাঁর মৃত্যুতে শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নয়, বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনদিন পূরণ হবার নয়।

দেশবিদেশ/নেছার

Comments

comments

Posted ১:১৬ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৫ অক্টোবর ২০১৯

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক : তাহা ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
০১৮১২-৫৮৬২৩৭
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com