শুক্রবার ২৭শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

জীবনের তরে স্মৃতির বাতিঘরে

মরিচ্যা স্কুলের যে স্মৃতি রয়েছে গেঁথে

তোফায়েল আহমদ   |   বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

মরিচ্যা স্কুলের যে স্মৃতি রয়েছে গেঁথে

মরিচ্যা পালং উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্টিত না হলে আজকের এ লেখাটিও আমার লেখা হতনা। সেই ১৯৭০ সালে ষষ্ট শ্রেণীতে ভর্ত্তি হয়েছিলাম। অর্থাৎ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের উষালগ্নের এ সময়টি তখন ছিল উথাল-পাতাল। তদানীন্তন পূর্ব বাংলার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ১৯৬৮ সালে যাত্রা শুরু করে স্কুলটি। যে স্কুলটি যাত্রার মাত্র ২/৩ বছরের মাথায় এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অসাধারণ অবদানও রাখে। এই স্কুলেরই অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র শহীদ নির্মল বড়–য়া একাত্তরে আজকের বাংলাদেশটির জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। এই স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরাও অংশ গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাঙ্গালী যখন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল-সেই রক্তাক্ত সংগ্রামের পথে।
মরিচ্যা পালং হাই স্কুলের ছাত্র নির্মল বড়–য়া এদেশের শহীদ পরিবারের তালিকাভুক্ত একজন অন্যতম শহীদ। এই স্কুলের ছাত্র আলী আকবর বাঙ্গালী অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। আমাদের মরিচ্যা পালং এলাকারই এক গর্বিত সন্তান সেনাবাহিনীর অনারারি ক্যাপ্টেন আবদুস সোবহান তখন কক্সবাজারের পূর্ব সীমান্তজুড়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্ধর্ষ কমান্ডার। পাক বাহিনীর সাথে বেশ কয়েকটি সন্মুখযুদ্ধে লড়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। ক্লাসে আমার এক বছরের সিনিয়র ভাই অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আলী আকবর বাঙ্গালী ক্যাপ্টেন সোবহানের দলের একজন কনিষ্ট যোদ্ধা ছিলেন। আলী আকবর বাঙ্গালী সরকারের তালিকাভুক্ত ভাতা ভোগকারি মুক্তিযোদ্ধা।
মরিচ্যা পালং হাই স্কুলের অন্যতম শিক্ষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম আজাদ ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৬৮ সালে কক্সবাজারের রামু ও উখিয়া থানার মাঝখানে এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্টান স্থাপনের চিন্তা যারা করেছিলেন হয়তোবা তাঁরাও স্বপ্ন দেখতেন একটি নতুন দেশ আর লাল-সবুজের একটি পতাকা আমরা ছিনিয়ে আনব। যে দেশটির অর্জনের রক্তাক্ত ইতিহাসের পাতায় এই শিক্ষা প্রতিষ্টানটির শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রতিষ্টান গড়ার কাজে নানাভাবে জড়িত মহান ব্যক্তিদের অবদানের কথাও থাকবে। এ প্রতিষ্টান গড়ার কাজে যেসব ব্যক্তি ছিলেন তাঁদেরই অন্যতম একজন প্রয়াত আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ এডভোকেট একে আহমদ হোছাইন। যিনি মুক্তিযুদ্ধে ভুমিকা রাখার কারনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিয়ে চিরশায়িত হয়েছেন।
আমার প্রয়াত পিতা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একজন সংগটক হাজী পেটান আলী সওদাগর ছিলেন এ প্রতিষ্টানটির একজন জমি দাতা। প্রতিষ্টানেরই অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন, প্রয়াত মোক্তার আহমদ, আবদুর রহিম চৌধুরী, হাছর আলী মাষ্টার সহ আরো অনেকেই। এই প্রতিষ্টানেরই অন্যতম একজন উদ্যোক্তা হলদিয়া পালং ই্উনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা বাদশাহ মিয়া চৌধুরী। আমার স্মৃতির এ পাতায় মুক্তিযুদ্ধে নানা ভাবে ভুমিকা পালনকারি এ প্রতিষ্টানটির আরো অনেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা। যাঁদের সবার নাম-পরিচয় উল্লেখ করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক যাঁরা ইতিমধ্যে না ফেরার দেশের বাসিন্দা হয়েছেন-তাঁদের প্রতি।
মরিচ্যা পালং হাই স্কুলের স্মৃতির কৌটা ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে আমার সবচেয়ে বেশী মনে পড়ছে একজন সাধারণ মানুষের কথা। তিনি ছিলেন স্কুলটির পিয়ন। নাম ছিল নুর আহমদ। বয়ষ্ক এ ব্যক্তি ছিলেন পাগলির বিল গ্রামের বাসিন্দা। আমরা তাকে ডাকতাম জেঠা। শিক্ষকের জেঠা এবং শিক্ষার্থীদেরও জেঠা। বিশ্বস্থ এবং কর্মঠ লোক ছিলেন তিনি। সকল ছাত্র এবং ছাত্রীর নাম ছিল তার মূখস্থ। অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহারের মানুষ ছিলেন সকলের জেঠা নুর আহমদ। সেই সাত সকালে ঘর থেকে এসে স্কুলের কাজে যোগ দিতেন। আর রাতে ফিরতেন ঘরে। মাসিক বেতনইবা কত ছিল। কিন্তু এই নুর আহমদ প্রতিষ্টানটির জন্য যেন জান-কুরবান দিতেও কুন্ঠাবোধ করতেন না।
স্কুলটির প্রতি এমন একজন ছোট মানুষের দরদের বিষয়ে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে স্কুলের শিক্ষক জিতেন্দ্র বড়–য়া জানান-‘জেঠা নুর আহমদ স্কুল থেকে বিদায় নেয়ার আগে একদিন নাকি তাকে (মাষ্টার জিতেন্দ্র) বলেছিলেন-আমার মৃত্যুর পর স্কুলটির পার্শ্বে একটু ছোট্ট জায়গায় হলেও আমাকে কবরস্থ করার চেষ্টা করবেন। আমি সেই কবর থেকেই শুনতে পাব আমার প্রাণ-প্রিয় প্রতিষ্টানের শিক্ষার্থীদের কলকাকলি।’ একজন দরিদ্র মানুষ যার পেটে ভাত নেই অথচ তিনিই কিনা স্কুলটির সাথে না ফেলার দেশেই সারাজীবন ধরে কাটাতে চেয়েছিলেন। প্রয়াত জেঠা নুর আহমদ- আপনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, ধন দৌলত নয় ‘শিক্ষাই অমর’। এমন শিক্ষা আপনি শিখিয়ে গেলেন, আপনাকে সালাম জানাই।
আমি এই স্কুলের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র। ১৯৬৮ সালে স্কুলটির যাত্রা শুরু হয় জুনিয়র হাই স্কুল হিসাবে। মরিচ্যা পালং জুনিয়র হাই স্কুলটির ক্লাশ হত আজকের হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের উত্তর পার্শ্বের প্রাইমারি স্কুল সংলগ্ন মাটির দেয়ালের একটি ঘরে। তার উত্তর পার্শ্বে ছিল প্রাইমারি স্কুল। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের একটি অফিসই ব্যবহার হত জুনিয়র হাই স্কুল সহ দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্টানের। দক্ষিণ পার্শ্বে ছিল খেলার মাঠ। আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্ত্তি হই তখন আমাদের ক্লাশে মেয়ে বলতে ছিল মাত্র একজন। তার নাম ছিল হোসনে আরা বেগম। ডাক নাম বুড়ী। বুড়ী খুনিয়া পালং ইউনিয়নের প্রয়াত চেয়ারম্যান এস,এম ফেরদৌসের ছোট বোন। সপ্তম শ্রেণীতে কোন মেয়ে ছিল না। অষ্টম শ্রেণীতেও ছিলেন মাত্র একজন। তিনি আমাদের সবার ফরিদা আপা। ফরিদা আপাই সম্ভবত স্কুলটির প্রথম ছাত্রী। তিনি সেই আমলেও বেশ হাসি-খুশিতে মেতে থাকতেন সবার সাথে।
ফরিদা আপাকে আমরা যথেস্ট সন্মানও করতাম। পরবর্তীতে ফরিদা আপার বিয়ে হয় স্কুলের অংকের স্যার ইসহাক বিএসসি’র সাথে। মনে পড়ে প্রয়াত আজিম স্যার কিভাবে পড়াতেন আমাদের। আবদুল হক স্যার, ইসহাক স্যার, মৃদুল স্যারের কথা ভুলার নয় কিছুতেই। মৃদুল স্যার অস্থানীয় বিধায় তিনি স্ত্রী পরিজন নিয়ে এসে প্রথমে উঠেছিলেন পাগলির বিলের আবদুর রহিম চৌধুরীর কাছারি ঘরে। সেখান থেধকে গেলেন ধেছুয়া পালং গ্রামের হোছন আহমদ সিকদারের কাছারিতে। আমরা ছাত্ররাই সেই সময় পাহাড়ের গাছ কেটে কাঁধে করে মৃদুল স্যারের থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম।
স্কুলের স্যাররা ক্লাশ শেষ হলে হাতের চক এবং ডাষ্টার নিয়ে চলে যেতেন প্রাইমারি স্কুলের অফিসটিতে। আর স্যারের পেছনে পেছনে আমাদের ক্লাশের একমাত্র ছাত্রী বুড়ী এবং ফরিদা আপাও যেতেন। আমাদের ক্লাশে কোন স্যার যখন অফিস থেকে আসতেন তখন বুড়ীকে নিয়ে আসতেন সাথে করে। ক্লাশে বেঞ্চের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। একজন মাত্র মেয়ের বসার জন্য একটি পুরো বেঞ্চ দেওয়ার মত অবস্থা ছিল না। তাই বেঞ্চের এক মাথায় বসত বুড়ী। আমি সহপাঠিদের মধ্যে একটু হালকা-পাতলা এবং ছোট সাইজের ছিলাম। সম্ভবত এ কারনেই ইসহাক স্যারের নির্দ্দেশ ছিল-প্রতিদিনই যাতে আমি বুড়ীর পাশে বসি। আমার বান্ধবী বুড়ীর বিয়ে হয়েছিল অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে। যেহেতু স্কুলটি তখনও জুনিয়র পর্যায়ের ছিল তাই আমি নবম শ্রেণীতে ভর্ত্তি হই কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে (কসউবি)। একটি কন্যা সন্তান জন্মের পর অকালেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমায় হোসনে আরা বেগম বুড়ী।
আমরা সপ্তম শ্রেণীতে উঠার পরই ১৯৭১ সালে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে গেল। তখনকার দিনে দিন-মজুরদের গায়ে বেশীর ভাগই কালো রংয়ের গেঞ্জি থাকত। ময়লা আবর্জনা হলেও তেমন টের পাওয়া যায়না এসবে-সুবিধা ছিল এটিই মূলত। তবুও কালো গেঞ্জি মানেই দিন-মজুর এবং রাখালদের পোশাক হিসাবে পরিচিতি পেয়ে বসে। বাবা বাজার থেকে কালো গেঞ্জি এনে দিতেন। হাতে থাকত গরু চরানোর বেত (হাইল্যা ছোঁয়া)। মা বলতেন হাত থেকে হাইল্যা ছোঁয়াটি যাতে কোনভাবেই ফেলে না দিই। হাতে ছোঁয়াটি থাকলে হাতের তালু নাকি শক্ত হবে এবং এক সময় চাটও হতে পারে। এরকম চাট ওয়ালা শক্ত হাত প্রমাণ করা দরকার। কেননা দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, রাজাকার-বদর বাহিনী চারিদিকে নজর রাখছে। ছাত্র পেলেই নাকি তারা ধরে নিয়ে যায়।
ছাত্রদের হাত নাকি অত্যন্ত কোমল থাকে। তাই স্কুল ছাত্রত্ব যাতে প্রমাণ করা না যায় সে কারনেই হাতের তালু শক্ত করার জন্যই গরু চরানোর হাইল্যা ছোঁয়া হাতে নিয়ে সব সময় থাকতে হবে। আর আমিতো ভয়ে তালু শক্ত করার জন্য রাতে বিছানায় যেতেও সেই ছোঁয়া হাতে নিতে শুরু করলাম। ঘরের গরু গুলোও সারাদিন নিয়ে মাঠে এবং পাহাড়ে নিয়ে চরাতে হত সেই সময়। সেই সাথে রাজাকার-বদর এবং পাকিস্তানী বাহিনীর গতিবিধি সহ খোঁজ খবর নিতে হত। রিতীমত রাখাল ছেলের ছদœাবরণে পরিস্থিতির খোঁজ খবর নেয়ার কাজ। এক কথায় আমি তখনকার সময়ে রিতীমত একজন ক্ষুধে মুক্তিযোদ্ধা।এমনই স্মৃতির কথা মনে পড়ে- যেদিন আমাদের স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র নির্মল বড়–য়া এবং ভুট্টো মহাজনকে রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল সেদিন গরু চরানোর বেশে আমরা ছিলাম রাস্তার একদম কিনারেই। যেন চোখের সামনেই হায়েনার দলটি ছোঁ মেরে নিয়ে গেল দু’টি তাজা মানুষের জীবন প্রদীপ।
দেশ স্বাধীন হবার পর আবার এসে ভর্ত্তি হলাম সপ্তম শ্রেণীতে। তখন ষষ্ট শ্রেণীতে ভর্ত্তি হয়েছিল শিরিন নূর বেগম রানু (সরকারি কলেজের অধ্যাপক), পাগলির বিলের শাহেদা আকতার ও সুপ্তি বড়–য়া (প্রাইমারি শিক্ষক)। ছাত্র বলতে আমরা সবাই লুঙ্গি পরে স্কুলে যেতাম। শিক্ষকদের মধ্যে ইসহাক স্যার সব সময় লুঙ্গি পরতেন। আজিম স্যারকেও লুঙ্গি পরিহিত দেখা যেত। যুদ্ধ-বিধ্বস্থ দেশের সে এক করুন অবস্থা। আমাদের গ্রামের বাড়ী থেকে স্কুলে সোজা পথে আসতে হত খাল পার হয়ে পাহাড়ী পথ ধরে। এক জোড়া রাবারের স্যান্ডেল ছিল। পাহাড়ী পথে যদি স্যান্ডেল পায়ে দিই তাহলে একদিনেই শেষ হয়ে যাবে। আরেক জোড়া কিনে নেয়ার সামর্থ অন্তত সেই সময় থাকার কথা চিন্তাও করা যায়না। তাই স্যান্ডেল জোড়া ধুয়ে হাতে অথবা ছাতার ভিতর করে স্কুলে নিয়ে আসতাম। তারপরই পায়ে লাগাতাম সেই স্যান্ডেল। একবারতো স্কুলের বেতন দিতেও মহা কষ্টে পড়েছিলাম। মা ১৪ টি ডিম দিয়েছিলেন মরিচ্যা বাজারে বিক্রির জন্য। বাজারে আনার পথে ৪ টি ভেঙ্গেও গিয়েছিল। ডিম বিক্রির টাকা নিয়ে আজিম স্যারের হাতে দিয়েছিলাম স্কুলের বেতন। লজ্জা বোধ করছি না এসব বলতে- বরং গর্ববোধ করছি।
মেধাবী মোটেই ছিলাম না। তাই মেধাবী ছাত্রদের ফলো করতাম-যাতে মেধার অধিকারি হই। সব সময় নজর রাখতাম এলাকায় সেই সময়েই মেধাবী হিসাবে পরিচিত আমাদের সিনিয়র ভাই গোলাম রহমান (অবসর প্রাপ্ত ব্যাংকার), ডাঃ আবদুল মাজেদ (চট্টগ্রাম মেডিকেলের প্রফেসর), মির আহমদ (অবসর প্রাপ্ত উপ সচিব), উখিয়া কলেজের অধ্যাপক আবদুল হক, আমাদের জুনিয়র সুলতান আহমদ (অতিরিক্ত সচিব) সহ মেধাবীদের প্রতি। তাদের চালচলন দেখতাম। সে সময় আরেক মেধাবীর কথা শুনে তাকে দেখতে মরিচ্যা থেকে রুমখাঁ গিয়েছিলাম। তিনি মোহাম্মদ শফিউল আলম (মন্ত্রিপরিষদ সচিব)। তিনি পড়তেন পালং মডেল হাই স্কুলে। মনে করতাম তারা যেরকম করে সেইরকম করলে আমিও মেধাবী হব।
মেধা বৃদ্ধির জন্য সে সময় দুধ-চিনিও খেতাম। যুদ্ধ-বিধ্বস্থ দেশের পুষ্টিহীন শিশুদের জন্য সেই সময় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নানা সহায়তা দিয়েছিল। আমাদের দেয়া হত বস্তাভর্ত্তি পাউডার দুধ এবং লাল রংয়ের চিনি। হয়তোবা এগুলো ফেলে না দেয়ার জন্যই স্যাররা বলতেন-মহা মূল্যবান খাবার। যাতে আছে ঔষধি গুণ। ঘরে এনে মাকে দেয়ার আগে আমি বেশ কিছু পরিমাণ কৌটা ভরে নিয়ে লুকিয়ে রেখে মেধা বৃদ্ধির জন্য খেতাম। মেধাবী ছাত্র বলতেই আমার কেন জানি মনে হত তারা আলাদা কেউ কিনা ! বাস্তবে সেই সময় কিছুই যেন বুঝতাম না। এখন এসব যখন মনে পড়ে তখন মনে মনে হাসি। আর বলি হায়রে শৈশব ! কি ছিলামরে আর কি হয়েছি।
দেশ স্বাধীন হবার পর স্বাধীনতার ঢেউ লাগল আমাদের নতুন স্কুলটিতে। স্কুলে ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্টিত হল। নির্বাচনে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আলী আকবর বাঙ্গালী (মুক্তিযোদ্ধা) জিএস, আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র এজিএস এবং ষষ্ট শ্রেণীর ছাত্র জিতেন্দ্র বড়–য়া ক্রীড়া সম্পাদক (অন্যান্যদের কথা মনে নেই) নির্বাচিত হয়েছিলাম। সর্বশেষ শৈশবে প্রাপ্ত একটি শিক্ষা দিয়েই শেষ করছি। ষষ্ট শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ের ঘটনা। সেদিন বিকাল বেলায় স্কুল ছুটির পর মরিচ্যা মসজিদ সংলগ্ন খাসমহলের পুকুর পাড়ের ভিতরের অংশে প¯্রাব করতে বসেছিলাম। যেই উঠি পেছন থেকে ভরাট কন্ঠের ডাক পড়ল। পুকুর পাড়ের উত্তর দিকে খাসমহলের বারান্দায় বসা হাছন আলী মাষ্টার। আমারই বান্ধবী হোসনে আরা বুড়ীর বাবা, তিনি তখন খুনিয়া পালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এলাকাজুড়ে অত্যন্ত দাপুটে লোক ছিলেন তিনি। অভিভাবক হিসাবে কোন জুড়ি নেই। আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, পুকুরের পাড়ে প¯্রাব করলে সেটি গড়িয়ে পড়বে পানিতে। পরিবেশ দূষিত হবে। শৈশবে একজন মুরুব্বীর সেই শিক্ষাটি এখনো মনে গেঁথে রয়েছে।
লেখক ঃ তোফায়েল আহমদ, সাংবাদিক ও আইনজীবী এবং প্রাক্তন ছাত্র, মরিচ্যা পালং হাই স্কুল।

Comments

comments

Posted ১০:০০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক : তাহা ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
০১৮১২-৫৮৬২৩৭
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com