• শিরোনাম

    মাতামুহুরী নদীর ভাঙনে ঝুঁকিতে সড়ক-মন্দির-বসতিসহ নানা স্থাপনা

    মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া: | ১৫ অক্টোবর ২০১৮ | ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

    মাতামুহুরী নদীর ভাঙনে ঝুঁকিতে সড়ক-মন্দির-বসতিসহ নানা স্থাপনা

    বান্দরবানের আলীকদমস্থ গহীন থেকে কক্সবাজারের সাগর-মোহনা পর্যন্ত মাতামুহুরী নদীর দৈর্ঘ্য ২৮৬ কিলোমিটার। এরমধ্যে চকরিয়া উপজেলার মাঝ দিয়ে গেছে প্রায় শত কিলোমিটার নদীর অংশ। এই নদী কারো আশির্বাদ হলেও আবার অনেকের জন্য অভিশাপ হয়ে উঠেছে। উজান থেকে নেমে আসা পলি মাটি ও বালি জমে ভরাট হয়ে গেছে মাতামুহুরী নদী। একসময়ের প্রবাহমান নদীটিতে এখন শুষ্ক মৌসুমে নৌ চলাচলও করতে পারেনা। অথচ দুই দশক পূর্বে ট্রলারসহ নানা নৌযান পণ্য নিয়ে চকরিয়া হয়ে লামা পর্যন্ত যেতো। সেই নদী তলদেশের সামান্য অংশ দিয়ে ছড়াখালের মতো পানি চলাচল করলেও বৃহদাংশ চর জেগে খেলার মাঠও ফসলি জমিতে রুপ পেয়েছে।
    অভিযোগ রয়েছে উজানের লামা ও আলীকদম উপজেলা বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজি কাটার পাশাপাশি গুড়ালিও উত্তোলন করে ফেলায় এবং নিয়মিত পাহাড় কেটে পাথর উত্তোলন করায় ছোট-বড় পাহাড়গুলোর মাটি বৃষ্টির পানির সাথে ভেসে এসে মাতামুহুরীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। এতে মাতামুহুরী নদীর দু’কুল ভাংচে হরদম। বিশেষ করে বর্ষা আসলেই নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা ভাঙ্গনের খপ্পরে পড়ার ভয়ে আতংকে থাকে। মাত্র দু’দশকেই এই নদীর ভাঙ্গনে অন্তত দশ হাজার বসতভিটে বিলীন হয়েছে। চকরিয়ার পুরনো চিরিংগা বাজার, তৎসংলগ্ন মামা-ভাগিনার মাজার, কবরস্থানের আংশিক, পুরনো থানা ও হাসপাতালের ভিটে তলিয়ে গেছে নদীতে। কাজির পাড়া, বেতুয়াবাজার, সীতারখিল, ছোট ভেওলা, লক্ষ্যারচর. সাহারবিল, কাকারা, মানিকপুর, ফাঁসিয়াখালী, পৌরসভার একাংশ ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে।
    এই নদীতে পাহাড়ি ঢল নেমে পলি পড়ায় আবদি জমিতে ভালো ফসল ফলন হলেও ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। এই ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পেতে ১৯৯১ সাল থেকে চকরিয়ার মানুষ সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে মাতামুহুরী নদীতে ড্রেজিং করার জন্য। সাত থেকে দশ ফিট গভীর ড্রেজিং করলে এবং নদীর আঁকা-বাঁকা অংশ সোজা করনের পাশাপাশি কিছু কিছু অংশে বাঁধ ও ব্লক দেয়া হলেও ভাঙ্গন অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
    কাকারা ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শওকত ওসমান বলেন, মাঝেরফাঁড়ি অংশে বেড়িবাঁধ দেয়ায় ঢলের ক্ষতি থেকে চলতি বর্ষায় কাকারা অনেক বাসিন্দা রক্ষা পেয়েছে। দিঘীর নিকটবর্তী হাজিয়ান সড়কের সেতু পয়েন্টে একটি স্লুইস গেট বসানোর পাশাপাশি আরো ৫-৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ দেয়া হলে এবং ওই বাঁধের নদী সাইটে ব্লক পেলানো হলে বন্যা ও ভাঙ্গ থেকে লাখো মানুষ রক্ষা পাবে।
    ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দিগরপানখালী এলাকায় বেড়িবাঁধ দেয়া হলেও তা টেকসই করে রাখতে আরো ব্লক এবং মাটি দিতে হবে। পাশপাশি নির্মিত বাঁধের দৈর্ঘ্য আরো বাড়াতে হবে।
    চকরিয়া পৌরসভার মেয়র মো.আলমগীর চৌধুরী বলেন, মাতামুহুরী নদীর পৌরসভার অংশে ভাঙ্গন রোধ কল্পে ইতিপূর্বে দু-্একটি স্থানে শহর রক্ষা বাঁধ দেয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অন্য স্থানে বাঁধ নির্মাণ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
    এই মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গনে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের শীলপাড়া নিয়ে একটি সড়কসহ নানা স্থাপনা বিলীন হওয়ার প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলো।
    ইট বিছানো একমাত্র চলাচল সড়কটি বিলীন হয়েছে। সেই সঙ্গে বিলীন হলো দুটি মন্দির। নদীর গর্ভে ঠাঁই হয়েছে অন্তত একশত বসতঘর। আরও ৫০টি বসতঘর ভাঙনের মুখে রয়েছে। তারপরও কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। এই গ্রামের মানুষের মাঝে মাতামুহুরী নদী মানেই দীর্ঘশ^াস, তীব্র ক্ষোভ আর আক্ষেপ। এই নদী কেড়ে নিয়েছে তাঁদের সর্বস্ব।
    সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, চকরিয়া-বদরখালী-মহেশখালী সড়কের উত্তরপাশে বাটাখালী সেতু সংলগ্ন সাহারবিলের শীলপাড়ার অবস্থান। বাটাখালী সেতু থেকে ইটবিছানো সড়ক দিয়ে উত্তরে গেলে সাহারবিল আনওয়ারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা। সড়কটি দিয়ে ৫০ মিটার উত্তরে গেলেই সড়কের আর চিহ্ন নেই। সড়কের এই অংশটি (৫০০ মিটার) পাশের মাতামুহুরী নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পাশেই গাছের তক্তা দিয়ে সাঁকো বানিয়ে মানুষ পার হচ্ছে। এখনও নদীর গর্ভে নারিকেল গাছ, বসতঘরের চালা ও সড়কের কিছু স্মৃতি চিহ্ন ভেসে রয়েছে। যে কোনো মুহুর্তে মাতামুহুরী গ্রাস করতে পারে আরও কিছু বসতঘর। এসব ঘরের আঙিনা ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।
    শীলপাড়ার দুলাল সুশীল, সাধন সুশীল, তপন সুশীল, মানিক সুশীল, সচিন্দ্র সুশীল, যদু সুশীল, রাখাল সুশীল, সুবল সুশীল, রতন সুশীল, বিধান সুশীল, হৃদয় শীলের বসতঘর গত বর্ষায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে। তাঁদের সবার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।
    বসতঘর হারা হৃদয় শীল বলেন, দেশে এতো নেতা, এতো প্রশাসন, এতো জনপ্রতিনিধি। দু:খের সময় কাউকেই পাইনি। বসতঘর হারিয়ে এখন অন্যের আঙিনায় থাকি। কেউ কোনোদিন একটু দেখতেও আসলো না, খবরও নিলো না।
    সচিন্দ্র সুশীল (৫৫) বলেন, গত দশ বছরে অন্তত একশত বসত ঘর, দুটি মন্দির ও চলাচলের একমাত্র সড়কটি মাতামুহুরীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। উদ্ধাস্তু হয়েছে বহু মানুষ। এখন লোকজন বসত-বাড়ির উঠানের ওপর দিয়ে হাঁটছে।
    শীলপাড়ার বাসিন্দা রাখাল সুশীল (৪৬) বলেন, এই শীলপাড়ার মানুষের জন্য মাতামুহুরী নদী আতঙ্কের নাম। নদীর সর্বনাশা থাবায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন এই গ্রামের মানুষ। কেউ কেউ বসতঘর হারিয়ে অন্যত্র গিয়ে নতুন বসতঘর করলেও অনেকেরই সেই সামর্থ্য নেই। সামর্থ্যহীন সেই সব মানুষ এখনও অন্যের বসতঘরের আঙিনায় বসবাস করছেন।
    স্থানীয় লোকজন বলেন, শীলপাড়ার সড়কটি দিয়ে সাহারবিল ইউনিয়নের মাদ্রাসাপাড়া, শীলপাড়া, নোয়াপাড়া, মধ্যমপাড়া, পূর্বপাড়া ও পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের ঘাইট্যার চর, কাজীরপাড়া এলাকার লোকজনের যাতায়াতের একমাত্র সড়ক হচ্ছে শীলপাড়ার সড়কটি। এসব গ্রামের শিক্ষার্থীদের আনওয়ারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা ও বাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে এই সড়ক ছাড়া বিকল্প কোনো চলাচল রাস্তা নেই। সড়কটির ৫০০ মিটার মাতামুহুরীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
    আনওয়ারুল উলুম ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার ফাজিলের (ডিগ্রী) শিক্ষার্থী জন্নাতুল মাওয়া বলেন, প্রতিদিন শীলপাড়া সড়কটি দিয়ে মাদ্রাসায় আসা যাওয়া করতে খুব কষ্ট হয়। গাড়ি চলে না। প্রতিদিন হেঁটে আসা যাওয়া করতে হয়। বৃষ্টি হলে হেঁটেও যাওয়া যায় না। সাহারবিল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মহসিন বাবুল বলেন, শীলপাড়ার মানুষের আর্তনাতের কথা লিখিতভাবে পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ে জানানোর পর পানি উন্নয়নবোর্ডের কর্মকর্তারা সরেজমিনে ঘুরে গেছেন। এলাকার মানুষ ভাঙনরোধে স্থায়ী সমাধান চায়। এজন্য বড় প্রকল্প নিয়ে জিও ব্যাগ বা ব্লক দিয়ে কাজ করতে হবে।
    চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, সরেজমিনে শীলপাড়া এলাকায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙন পরিদর্শন করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই পজিটিভ কিছু একটা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের চিরিংগা শাখা কর্মকর্তা (এসও) তারেক বিন ছগির বলেন, সাহারবিলের শীলপাড়া এলাকার ৫০০ মিটার ভাঙন নিয়ে একটি প্রতিবেদন মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনশত মিটারের একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এতে এক কোটি টাকার কাছাকাছি একটা বরাদ্ধ হতে পারে। জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানো হবে। দরপত্রের কাজ শেষ হলেই কাজ শুরু হবে।
    দেশবিদেশ /১৫ অক্টোবর ২০১৮/নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ