• শিরোনাম

    মাতারবাড়ীতে উচ্ছেদকৃত ৪৫ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ৪ বছরেও পূণর্বাসন হয়নি ঃ ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ

    মোহাম্মদ শাহাব উদ্দীন,মহেশখালী | ২৪ জুলাই ২০১৯ | ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

    মাতারবাড়ীতে উচ্ছেদকৃত ৪৫ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার  ৪ বছরেও পূণর্বাসন হয়নি ঃ ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ

    মহেশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নির্মাণের ফলে উচ্ছেদকৃত পরিবারের জন্য নির্মানাধীন বাসস্থানের একাংশ

    উচ্ছেদকৃত ৪৫ পরিবারের পূণর্বাসন করা হয়নি ৪ বছরেও । দেওয়া হয়নি ক্ষতিপূরণের রোয়েদাদের টাকাও । প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল- জমির ন্যায্যমূল্য দেয়া হবে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে, পূণর্বাসন করা হবে, মাতারবাড়ির কেউ বেকার থাকবে না, সবাইকে প্রকল্পে কাজ দেয়া হবে, নানারকম প্রশিক্ষণ দিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। এই সব প্রতিশ্রুতির নুন্যতম বাস্তবায়ন ছাড়া তেমন কোন বাস্তবরূপ দেখা যায়নি। মাতারবাড়ির মানুষ আজ মানবেতরভাবে কোন রকমে বেঁচে আছে। তাই মাতারবাড়ির মানুষ আজ অসহায় ও ক্ষুব্ধ। এমন টিই জানান, উচ্ছেদ পরিবারের সদস্য আবদু জাব্বার, মোহাম্মদ ইউনুছ,মোহাম্মদ আলী ও হুমায়রা বেগম।
    তারা বলেন, ২০১৬ সাল থেকে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নিজেদের মাথাগুজার ঠাঁই সহায়-সম্পদ দিয়ে দিয়েছে মহেশখালীর মাতারবাড়ির বাসিন্দারা। জমি অধিগ্রহণের আগে নানারকম প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। আশা দেয়া হয়েছিল, যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের। সেই আশাতেই দিন ফুরাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তদের। গেল ৩ বছরে কিছু লোক ক্ষতিপূরণের টাকা পেলেও অধিকাংশ লোক টাকার মুখ দেখেনি। উচ্ছেদকৃত ৪৫ পরিবারের পূনর্বাসন ও রোয়েদাদভুক্ত ক্ষতিপুরণের টাকা পায়নি। প্রকল্প কাজের বর্জ্য পলিমাটি নির্গত হয়ে কোহেলীয়া নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাটি ভরাটের কারণে ৮টি স্লুইচগেট ও ৬টি কালভার্টসহ পানি নিষ্কাশণের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রকল্পের কাজে স্থানীয় শ্রমিক হিসেবেও নেয়া হচ্ছে তুলনামুলক কম। চলছে দালাল নির্ভর কাজ। ক্ষতিপূরণে টাকা সঠিকভাবে পাবে কিনা-তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সহায় সম্পদহারা মাতাবরাড়ির বাসিন্দারা। তারা শীঘ্রই ন্যায্য পাওনা দাবী জানিয়ে বিভিন্নœ সময়ে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন,প্রতিবাদসভা করেছে ক্ষতিগ্রস্তরা।
    ভুক্তভোগিরা জানান, জাইকা ও সিঙ্গাপুর কর্তৃক দুটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করার জন্য মাতারবাড়ি ও ধলঘাট ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যার ফলে লবণ ও চিংড়ি চাষে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ কর্ম হারিয়ে বেকার জীবন যাপন করছে। যে সামান্য জমিতে চাষাবাদ করা যেত, তাও আজ কয়লা বিদ্যূৎ প্রকল্পের কারণে পানির নিচে চলে গেছে।কয়লা বিদ্যুৎ পুনর্বাসন প্রকল্পের ঘর নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে । কার্যাদেশ পাওয়ার পর ১৫ মাসে ঠিকাদারের লোকজন কাজ শেষ করেছে মাত্র ৩০ শতাংশ ।
    কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিডেটের মাতারবাড়ী প্রকল্প কার্যালয় সূত্র জানায় , প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর জমির ওপর মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প করছে সরকার । তাপবিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালের আগস্টে অধিগ্রহণ করা ১ হাজার ৬০০ একর জমি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান কোল পাওয়ারকে বুঝিয়ে দেয় । এতে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে গিয়ে ২০১৫ সালের জুনে ৪৫ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। পরে কোল পাওয়ার প্রায় ১০ একর জমিতে ৪৫ পরিবারের জন্য ৫০টি ঘর নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ৮২০ টাকার দরপত্র আহ্বান করে । এই কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রো গ্লোব কোম্পানি । ঠিকদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৮ সালের মার্চে শুরু করে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নির্মাণকাজ শেষ করে কোল পাওয়ারকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা । কার্যাদেশ অনুয়ায়ী ৫০ সেমিপাকা ঘর নির্মাণ , ৫০টি নলকূপ , পর্যাপ্ত নালা ও রাস্তা নির্মাণ করার কথা রয়েছে । একেকটি ঘরের আয়তন হবে ৬৬০ বর্গফুট । সরেজমিনে দেখা যায় ১০টি ঘরের ছাউনি নির্মাণের কাজ চলছে । আর ২৮টি ঘরের বিম ও দেয়াল নির্মাণের কাজ করছে। ৫০টি নলকূপের মধ্যে বসানো হয়েছে মাত্র ১৮টি । কার্যাদেশ পাওয়ার পর ১৫ মাসে কাজ শেষ করেছে মাত্র ৩০ শতাংশ । অথচ কাজ সম্পন্ন করার শেষ সময় এ বছরের সেপ্টেম্বর । বাকি ৭০ শতাংশের কাজ তিন মাসের মধ্যে শেষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে ।
    ঠিকাদারিপ্রতিষ্ঠান ইলেকট্রো গ্লোব কোম্পানির প্রতিনিধি মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন , বৃষ্টির কারণে যথাসময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি । এখন গৃহ নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে চারটি দল পুরোদমে কাজ করছে । প্রথমে ২০টি ঘর নির্মাণকাজ শেষ করে আগস্ট মাসে কোল পাওয়ারের কাছে হস্তান্তর করা হবে । বাকি ৩০টি ঘরের নির্মাণকাজ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হবে ।
    কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিডেটের সহকারী প্রকৌশলী ইয়াকুবের বলেন, ১৫ মাসে ঠিকাদার ঘর নির্মাণের কাজ শেষ করেছে মাত্র ৩০ শতাংশ । এখন তাদের হাতে সময় আছে মাত্র তিন মাস । এই সময়ে ৭০ শতাংশের কাজ শেষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এরপরও সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে ।
    উচ্ছেদকৃত ৪৫ পরিবারের সদস্য হুমাইরা বেগম বলেন, ৬ মাসের মধ্যে পূর্নবাসন, প্রত্যাক পরিবারের একজন সদস্যকে চাকুরী, বাড়ীর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে ৪৫টি পরিবার উচ্ছেদ করা হয়। অদ্যাবদি ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক ২০ কেজি করে চাউল ছাড়া কোন প্রকার সহায়তা পায়নি। গত সাড়ে ৩ বছর ধর উচ্চ ভাড়া দিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছি। কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন আমাদের কে দ্রুত পূনবাসন,ক্ষতিপূরণ দিয়ে মানুষের মত বাঁচতে দিন। তবে এ বছরের জুলাই থেকে পরিবারের সদস্যদের শ্রমিক হিসাবে কোল পাওয়ার কর্তপক্ষ কাজ করার সুযোগ দিয়েছে বলেও জানান।
    মহেশখালী জন সুরক্ষা কমিটির সদস্য ও মানবাধিকার সুরক্ষা কর্মী হামেদ হোসাইন খোকা মেম্বার বলেন, গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর জাপানের টোকিও থেকে জাইকার পরিচালক (বাংলাদেশ) তাকাশিয়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল মাতারবাড়ী পরিদর্শন করে। স্থানীয় মানুষের কষ্টের কথা শুনেছে জাইকরা প্রতিনিধি দল। সরেজমিন সাধারণ মানুষের অবস্থা দেখতে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সুষ্ট ভাবে বসবাস করতে দ্রুত স্লুইচ গেইট করে পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু এখনো কোন প্রকার সুøইচ গেইটের ব্যবস্থা না করায় এ বছরও পানিবন্দি হয়ে পড়ছে হতভাগ্য মাতারবাড়ীর মানুষ। কিন্তু আজও তার কথার বাস্তবায়ন দেখতে যায়নি।
    মাতারবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হায়দার বলেন, কোল পাওয়ার কতৃপক্ষের ভবণ গুলো ৬ মাসে ১ বছরে ৫ তলা ভবণ তৈরী করা গেলে কেন ৪৫টি পরিবারের বাড়ী গুলো কেন নির্মান শেষ হচ্ছে না। মাতারবাড়ীর মানুষের চলাচলের ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত সড়কটি আপনারা ব্যবহার বড় বড় লরি, ট্রাক চলাচল করছে। ফলে সড়কে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। দ্রুত সময়ে বিকল্প সড়ক তৈরী করার আহবান জানান তিনি। তা না হলে দাবী আদায়ে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারী দেন তিনি।
    মাতাবারড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সাধারণ জনগনের ক্ষতিকরে উন্নয়ন চাননা। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশমতে আমার মাতারবাড়ীর মানুষের ক্ষতিপূরণ,পূর্ণবাসন, চাকুরী নিশ্চিত করুন। কিছু শ্রমিককে টাকা দেওয়া শুরু করলেও মাতারবাড়ীর প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক ক্ষতি পূরণ পায় নাই। প্রকল্পের ২৫% কাজ শেষ হলেও উচ্ছেদ কৃত ৪৫টি পরিবারকে কোন প্রকার পূর্ণবাসন,চাকুরী ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। কয়লা বিদ্যুৎ নির্মানে বাধঁ দেওয়ার ফলে বর্ষায় প্লাবিত হচ্ছে বাড়ীঘর। ফলে নৌকা নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এনমকি ওই পানিতে ডুবে বেশ ক’জন শিশুর মুত্যৃর ঘটনাও ঘটেছে। দ্রুত কালভার্ট ও স্লইচগেইট তৈরী করার জোর দাবী জানান তিনি।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ