• শিরোনাম

    মাতামুহুরী ট্রাজেডী ঃ শোকার্ত মানুষের ঢল

    যেখানে গেলো প্রাণ সেখানে শেষ বিদায়

    মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া | ১৬ জুলাই ২০১৮ | ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

    যেখানে গেলো প্রাণ সেখানে শেষ বিদায়

    যেখানে মৃত্যু হয়েছে সেখানেই নামাজে জানাজার মাধ্যমে বিদায় দেয়া হয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর চোরাবালিতে আটকে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া মেধাবী পাঁচ স্কুল ছাত্রের মধ্যে চারজনকে। গতকাল রবিবার সকাল ১১টায় মাতামুহুরী ব্রীজের নিচে জেগে উঠা চরে ঘটনাস্থলের পাশেই তাদের নামাযে জানাজা অনুষ্টিত হয়। এসময় উপজেলার হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ জানাজায় অংশ নেন। পরে তাদের মরদেহ অভিভাবকরা নিজ নিজ এলাকার নিয়ে গিয়ে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করেন। এদিকে, অপর ছাত্র তূর্ণ ভট্টাচার্যের লাশ নিজ এলাকা চট্টগ্রামের পটিয়ায় সৎকার করা হয়। সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল ১০টা থেকে দলে দলে শোকার্ত মানুষ জানাজায় অংশ নিতে মাতামুহুরীর চরে জড়ো হতে থাকে। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এক এক করে চারটি মরদেহ মাতামুহুরীর চরে এ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসা হয়। এসময় শতশত মানুষ মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। পরে সকাল ১১টায় চিরিংগা বাস স্টেশন জামে মসজিদের খতিব মাওলানা কফিল উদ্দিনের ইমামতির মাধ্যমে নামাজে জানাজা অনুষ্টিত হয়। জানাজায় অংশ নেয়া কয়েকজন ব্যক্তি জানায়, যে মাতামুহুরী তাদের প্রাণ কেড়ে নিলো সেই মাতামুহুরীর চরেই তাদের বিদায়ে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় পুরো চকরিয়া জুড়ে। এটা একটা বিরল ঘটনা। আমরা আল্লাহর দরবারে তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।
    জানাজায় চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো.ইলিয়াছ, চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জাফর আলম, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান, চকরিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী, চকরিয়া পৌরসভার মেয়র মো.আলমগীর চৌধুরী, জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম লিটু, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোন্দকার ইখতিয়ার উদ্দিন মো.আরাফাত, সাবেক মেয়র আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম হায়দার, চকরিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো.ইয়াসির আরাফাত, চকরিয়া পৌরসভার কাউন্সিলর মো.রেজাউল করিম, মুজিবুল হক ও বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ উপজেলার হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ জানাজায় অংশ নেন। উল্লেখ্য, গতকাল শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মাতামুহুরীর জেগে উঠা চরে ফুটবল খেলা শেষে নদীতে গোসল করতে নামে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের সাঈদ জাওয়াদ অরভি (১৫), দুই ভাই আমিরুল হোসেন এমশাদ (১৫) ও ৮শ্রেণী পড়ুয়া আফতাব হোসেন মেহরাব (১২) , ১০শ্রেণী পড়ুয়া তূর্ণ ভট্টাচার্য্য ও একই শ্রেণীর ফারহান বিন শওকত (১৫)।এসময় চোরাবালিতে আটকে পাঁচ ছাত্র নিখোঁজ হয়। এখবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধারে অভিযান শুরু করে। পরে জেলেরা জাল ফেলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে চট্টগগ্রাম থেকে তিনজনের একটি ডুবুরী দল এসে রাতে সাড়ে ১১টা ও রাত ১২টায় আরো দুটি মরদেহ উদ্ধার করে।
    প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে যেভাবে ঘটনার সুত্রপাত……
    গত শনিবার ছিলো চকরিয়া গ্রামার স্কুলের অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার শেষ দিন। এদিন পরীক্ষা শেষে দেড়টার দিকে ১০ শ্রেণী পড়–য়া ২২ থেকে ২৩ জন ছাত্র মাতামুহুরী নদীর জেগে উঠা চরে খেলতে যায়। ২টা থেকে খেলা শুরু করে। খেলার এ ফাঁকে মাতামহুরী নদীর নিকটবর্তী একটি বাড়ি থেকে সবাই পানি পান করে আবারো খেলতে নামে। খেলতে খেলতে বল গিয়ে মাতামুহুরী নদীতে পড়ে। বলটি আনতে প্রথমে নদীতে ঝাঁপ দেয় ৮ম শ্রেণী পড়–য়া ছাত্র মেহেরাব। একপর্যায়ে সে চোরাবালিতে আটকে গেলে তার বড় ভাই এমশাদ তাকে উদ্ধারের জন্য নদীতে ঝাঁপ দেয়। সেও আটকে যায় চোরাবালিতে। পরে অন্য চার বন্ধু ফারহান, তূর্ণ, অরভি ও জামি তাদের উদ্ধারে পানিতে ঝাঁপ দেয়। এক পর্যায়ে তারা চোরাবালিতে আটকে যেতে থাকলে এসময় বন্ধু জামি সাঁতরিয়ে অপর কুলে উঠে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ইতিমধ্যে ওই পাঁচ বন্ধু নদীর পানিতে ডুবে যায়। পরে নদীর তীরে অবস্থান করা লোকজন এ ঘটনা দেখে তাদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করে এবং জামিকে স্থানীয় একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করেন। পরে প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধারের জন্য তৎপরতা শুরু করে। এসময় পুরো মাতামুহুরীর ব্রীজ সংলগ্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে থাকে। পরে নিখোঁজ ছাত্রদের মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনরা নদী তীরে আসলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এক পর্যায়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জেলেরা জাল ফেলে তিন ছাত্র মেহেরাব, এমশাদ ও ফারহানের মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরী দল এসে রাত সাড়ে ১১টার সময় তূর্ণকে এবং ১২টার দিকে অরভির মৃতদেহ উদ্ধার করে।
    খোঁজে ফিরছে বন্ধুদের….
    মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে আসা ১০ শ্রেণী পড়–য়া ছাত্র মারুফুল ইসলাম জামি জ্ঞান ফিরলেই খোঁজ নিচ্ছে বন্ধুদের। এসময় সে বলতে থাকে আমার বন্ধুরা কোথায়। অন্য কিছু জানতে চাইলে সে শুধু ফেল ফেল করে তাকিয়ে তাকে। অন্য কোন প্রশ্নের উত্তর মিলছেনা তার কাছ থেকে। এসব কথাগুলো বলছিলেন তার আত্মীয় ও চকরিয়া পৌরসভার কাউন্সিলর মো.রেজাউল করিম। মো.রেজাউল করিম বলেন, জামি জ্ঞান ফিরলেই বন্ধুরা কোথায় জিজ্ঞেস করছে। তাকে বলেছি বন্ধুরা ভালো আছে। মৃত্যুর সংবাদ শোনলেই বড় কোন অঘটনের শংকায় তাকে সত্য কথা বলতে পারিনি।
    দুই সন্তান হারিয়ে পাগল মা-বাবা…….
    আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন। আর্থিকভাবে খুবই স্বচ্ছল। দুই ছেলে-এক মেয়ে নিয়ে সুখেই সংসার চলছিলো আনোয়ার হোসেন দম্পতির। সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন তারা। দুই ছেলেই লেখাপড়ায় ভাল হওয়াই তাদেরকে নিয়ে স্বপ্œও ছিলো বেশি। দুই ছেলে খুবই মেধাবী। বড় ছেলে এমশাদ পিএসসি ও জেএসসিতে বৃত্তি পেয়েছিলো। ছোট ছেলে মেহেরাবও পিএসসিতে বৃত্তি পেয়েছে। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে সবার বড় মেয়ে। পরীক্ষাই পাস হলেই উচ্চ শিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম শহরে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে প্লাটও কিনেছেন তিনি। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ওই প্লাটে উঠার কথা ছিলো আনোয়ার হোসেনের পরিবারের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তার সে স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো। প্লাটে উঠার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো তার দুই আদরের সন্তান মেধাবী ছাত্র এমশাদ ও মেহেরাব। আনোয়ার হোসেন সন্তানদের হারিয়ে পাগলপ্রায়। বার বার জ্ঞান হারিয়ে মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রীও। কান্না জড়িত কন্ঠে আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার এই ঘরে থাকবে কে আল্লাহ। আমি কি নিয়ে বাঁচবো। আল্লাহ তুমি আমার সন্তানদের যখন নিয়ে গেলে সাথে আমাকেও নিয়ে যেতে। আমি বাঁচতে চাইনা। এভাবেই বিলাপ করতে করতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন কয়েকবার। এসময় তার কথা শোনে পাশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের চোখেও পানি চলচল করছিলো।
    মেধাবী ছাত্রদের হারিয়ে বাকরুদ্ধ শিক্ষকরা..
    চকরিয়া গ্রামার স্কুলের মেধাবী এই ছাত্রদের হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষর্থীরা। তাদের মৃত্যুতে স্কুলের নেমেছে শোকের ছায়া। রবিবার সকালে ছাত্র-শিক্ষকরা স্কুলে এক অপরকে জড়িয়ে শুধু কান্না করছেন। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে স্কুল প্রাঙ্গন। মেধাবী এসব ছাত্রদের হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন শিক্ষকরা। ওই স্কুলের শিক্ষক জাহেদুল ইসলাম কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা আমাদের পাঁচ মেধাবী সন্তানদের হারিয়ে ফেললাম। আল্লাহ এ কোন অপরাধের বিচার করলেন জানিনা। আমরা কেন দেখে রাখতে পারলাম আমার সন্তানদের। আল্লাহর দরবারে শুধু এই টুকু প্রার্থনা তাদের যেন বেহস্তে রাখেন।
    যে কারণে বারবার এই মৃত্যু…
    মাতামুহুরী নদীর উজান ও ভাটির দিকে অন্তত ১৫ কিলোমিটার অংশে ২৫ থেকে ৩০টি স্যালু মেশিন বসিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছেন অসাধু বালু ব্যবসায়ীরা। মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করতে গিয়ে নদীর তলায় বিশ থেকে ত্রিশ ফুট গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়। এসব গর্তে বৃষ্টির পানির সাথে উজান থেকে নেমে আসা পলি মাটি পরে বরাট হলেও গর্তগুলোর মুখ মসৃন বা নরম থাকায় ভারি কিছু পড়লেই ওই গর্তে ডুবে যায়। এই গর্তকেই চোরাবালি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এভাবে নদীর ওই অংশে অন্তত অর্ধশত গর্ত বা চোরাবালি কুপের সৃষ্টি হয়েছে। এসব চোরাবালিতে আটকে ইতিপূর্বেও একই স্থানে দুই স্কুল ছাত্র নিখোঁজের তিনদিন পর মরদেহ উদ্ধার হয়। দেশবিদেশ /১৬ জুলাই ২০১৮/নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ