রবিবার ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

রোহিঙ্গা ঢলের ৪ বছর আজ

রোহিঙ্গার আশ্রয়ে ফলে বহুমাত্রিক সমস্যায় স্থানীয়রা

  |   বুধবার, ২৫ আগস্ট ২০২১

রোহিঙ্গার আশ্রয়ে ফলে বহুমাত্রিক সমস্যায় স্থানীয়রা

শফিক আজাদ, উখিয়া

# বন্যপ্রাণী ও বনসম্পদ ধ্বংস
# ১৫০ একর স্থানীয়দের চাষাবাদের জমি অনবাদী
# রোহিঙ্গাদের দখলে শ্রমবাজার
# হুমকিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

মিয়ানমার সামরিক জান্তা’র নানান নির্যাতনের মূখে ২০১৭সালের ২৫ আগস্টের পর এদেশে রোহিঙ্গার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রীর মানবিকতার এসব রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফের বনভূমিতে। সেখানে গড়ে তুলেন বসতি। এরপর থেকে উজাড় হতে থাকে বনসম্পদ। বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায় বন্যপ্রাণী এবং পাহাড়। দখল হয়ে গেছে শ্রমবাজার, হুমকির মূখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বর্তমানে বহুমাত্রিক সমস্যায় স্থানীয়রা।

সরজমিন ঘুরে স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ৪ বছর পূর্ণ হতে চলেছে আজ। গত ৪ বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয়ের ফলে নানান সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয়রা। তারা চান রোহিঙ্গারা যাতে দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত যায়।

বালুখালী এলাকার মৌলভী গফুর উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক চিন্তা করে নিজের জোত জমিতে আশ্রয় দিয়েছিলাম। বর্তমানে জমির মালিক বলে দাবি করতে পারতেছিনা৷ রোহিঙ্গাদের কথায় ক্যাম্প প্রশাসন আমাদের ২০ একর জোত জমি দখল করে এনজিওদের ভাড়া দিয়েছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীরসহ সকল দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে তিনি জানান। কুতুপালং এলাকার রহিম উদ্দিন নামে এক কৃষক বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে ধান চাষ বন্ধ রয়েছে। অথচ এ জমি আমাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু গেল ৪ বছরে ধান চাষ বন্ধ থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।

ক্যাম্প লাগোয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার কৃষক জমির আহমেদ বলেন, ক্যাম্পের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, পচনশীল ময়লা, মানব বর্জ্যসহ নানা বর্জ্যে অতিষ্ঠ আমরা। কোনোভাবেই এ বর্জ্য ফেলানো ঠেকানো যাচ্ছে না। ১৫০ শত একর ধানি জমি চার বছর ধরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে গেছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

রাজাপালং ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, একটি ড্রেন নির্মাণ করে পানি নিষ্কাশনের জন্য নানা জায়গায় আবেদন করেও সাড়া দেয়নি কেউ। দফায় দফায় কৃষকদের নিয়ে প্রশাসন, এনজিও কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে গিয়েও কোনো কাজ হয়নি। এরপরেও শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করা হয়েছে।

বিলুপ্তির পথে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র:

এসময়ে বন্যাপ্রাণীর অভ্যয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত উখিয়ার মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, ময়নারঘোনা, টিভি রিলে কেন্দ্র, তাজনিরমারখোলা, শফিউল্লাহ কাটায় রোহিঙ্গা বসতির কারনে এ অঞ্চলে বসবাসরত এশিয়া প্রজাতির বন্যহাতি বিলুপ্ত প্রায়। এক সময় ওই অঞ্চলে আড়াইশথর বেশি বন্য হাতির অবস্থান থাকলেও ইতোমধ্যে তারা নিরাপদ বাসস্থান হারিয়ে অন্যত্রে পাড়ি জমিয়েছে। এক সময় চট্টগামের দোহাজারি ও চুনতি রেঞ্জে উখিয়ার পাহাড়ি বনভূমিতে ঘুরে বেড়াত এশিয়া প্রজাতির ইন্ডিয়া উপপ্রজাতির হাতিগুলো।

আইইউ-এর তথ্যমতে, কক্সবাজারের উত্তর-দক্ষিণ বনভূমিতে ৪৬-৭৮টি বন্য হাতির বিচরণ ছিল। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। বর্তমানে উজাড় হওয়া বন ও পাহাড়ে গড়ে উঠেছে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসতি। এতে বিলুপ্তির পথে বসেছে বন্যহাতিসহ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র। টিভি রিলে কেন্দ্র এলাকার বাসিন্দা নুরুল কবির ভুট্টো বলেন, আজ থেকে ৩ বছর পুর্বে বন্যহাতির ভয়ে এই এলাকায় কোন সাধারণ মানুষ রাতে বাড়িতে ঘুমাতে পারতনা। সড়কের উপর বন্যহাতির দল দাড়িয়ে থাকার কারণে রাতে যানবাহন চলাচলে সৃষ্টি হত বাধাগ্রস্ত। কিন্তু তা এখন আর চোঁখে পড়েনা। রোহিঙ্গা বসতির কারণে বন্যপ্রাণী সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পথে।

উখিয়ার রেঞ্জ কর্মকর্তা গাজী শফিউল আলম জানান, মূলত এ এলাকাটি বন্য হাতির মূল বিচরণের ক্ষেত্র ছিল। বর্তমানে সেখানে রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠার কারণে বন্যহাতির দল আবাসস্থল হারিয়ে অন্যত্রে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ৮ম সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট পর থেকে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন নিবন্ধিত রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বনভূমিতে বসতি স্থাপন করেছে। পুরনো দুটি নিবন্ধিত ক্যাম্প এবং নতুন অনিবন্ধিত ৩২টি ক্যাম্পসহ রোহিঙ্গাদের মোট ক্যাম্প ৩৪টি। ৬ হাজার ১৬৪ দশমিক ০২ একর বনভূমি দখল করে এসব ক্যাম্প গড়ে উঠেছে। এতে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, ভূমিরূপ পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বনজ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি টাকার অংকে প্রায় ৪৫৭ কোটি টাকা এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। মোট ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৮৬৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

এতে আরও বলা হয়, ৫৮০ একর সৃজিত বন এবং এক হাজার ২৫৭ একর প্রাকৃতিক বনসহ ক্যাম্প এলাকার বাইরে জ্বালানি সংগ্রহে রোহিঙ্গারা বনাঞ্চল উজাড় করেছে এক হাজার ৮৩৫ একর। সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণে মোট ধ্বংসপ্রাপ্ত বনের পরিমাণ ৮০০১ দশমিক ০২ একর এবং সর্বমোট বনজদ্রব্য ও জীববৈচিত্র্যসহ ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৪২০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত ৪ বছরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছে রোহিঙ্গারা। দিনদিন জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ কর্মকান্ডে। ইয়াবা, মাদক, স্বর্ন ও অস্ত্র চোরাচালান তাদের একমাত্র ব্যবসা। যার কারনে হুমকিতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি৷

রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক দায়িত্বরত এপিবিএন-৮ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন জানান, চলতি বছর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লক্ষ ২৮ হাজার ৩৩৬ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে ১০৯জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রোহিঙ্গা অধ্যূষিত পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গার কারনে আমাদের নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- আইনশৃঙ্খলা, শ্রম বাজার, শিক্ষা, যাতায়াত ব্যবস্থা রাস্তা-ঘাট, বনভূমি ও পাহাড় ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে ১৫০ একর স্থানীয়দের জোত জমি অনাবাদী হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে এ বিষয়ে লেখালেখি করেও কাজের কাজ কিছু হয়নি।

অতিরিক্ত শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. শামসুদ্দোজ্জা বলেন, সাড়ে ৬ হাজার একর বন ভূমিতে রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। প্রথম দিকে রোহিঙ্গা আশ্রয় ফলে বনসম্পদের কিছুটা ক্ষতি হলেও পরবর্তীতে বনায়নের উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পে বনায়ন করা হয়েছে৷ তবে এই মুর্হুতে কি পরিমাণ বনায়ন সৃজন করা হয়েছে তা সঠিক করে বলা যাচ্ছেনা। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এডিবি/জেইউ।

 

Comments

comments

Posted ১:৩১ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৫ আগস্ট ২০২১

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক : তাহা ইয়াহিয়া কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
০১৮১২-৫৮৬২৩৭
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com