• শিরোনাম

    দেশে ফিরতে রোহিংগাদের অনীহা ঃ প্রত্যাবাসন বিরোধী চক্র সক্রিয় :২৩৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহন সম্পন্ন

    রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন

    নিজস্ব প্রতিবেদক কক্সবাজার/টেকনাফ | ২২ আগস্ট ২০১৯ | ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

    রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন

    আজ বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) রোহিংগা প্রত্যাবাসনের জন্য সরকারের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। মিয়ানমারে ফিরতে ইচ্ছুক রোহিংগাদের টেকনাফের শালবাগান রোহিংগা ক্যাম্প থেকে ঘুমধুম ট্রানজিট ঘাটে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় কক্সবাজারস্থ শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংএ একথা জানান শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম। ব্রিফিংএ তিনি আরো জানান, রোহিংগা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার জন্য বাংলাদেশস্থ মিয়ানমার দূতাবাসের একজন এবং বাংলাদেশস্থ চাইনিজ দূতাবাসের দুই জন কর্মকর্তা বুধবার বিকালে কক্সবাজারের পৌছেছেন।

    এদিকে প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার মধ্যে দু’শতাধিক পরিবারের সাক্ষাৎকার গ্রহন করা হয়েছে। রোহিঙ্গা শরনার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) ও ইউএনএইচসিআর মঙ্গল ও বুধবার দু’দিনে টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করেন। তালিকায় থাকা ৯৫ ভাগ রোহিঙ্গাদের মাঝে প্রত্যাবাসনের বার্তা পৌঁছানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে প্রত্যাবাসনের জন্য ঘুমধুম ঘাট প্রস্তুত রয়েছে। এদিকে ক্যাম্পে প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে সেনা, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসারের টহল জোরদার রয়েছে।

    ২১ আগস্ট বুধবার টেকনাফে শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে। শালবাগান সিআইসি (ক্যাম্প ইনচার্জ) অফিসে সাক্ষাৎকার প্রদান শেষে ফেরার পথে রোহিঙ্গা মোঃ আলম, ইসমাইল, নুর বাহার, নুরুল ইসলাম, নুর হাসান, শব্বির আহমদের সাথে কথা হলে তারা দাবি দাওয়া পূরণ হলে মিয়ানমারে ফিরে যাবেন বলে জানান। অন্যথায় তারা স্বদেশ ফিরতে রাজি নয়। এক কথায় তারা ফিরতে রাজি নয়।

    তাদের এ দাবী দাওয়া গুলোর মধ্যে সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটে-বাড়ি ও জমি-জমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়ীতে ফেরত, কারাগারে বন্ধি রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা, ধর্ষনের বিচার, অবাধ চলাফেরা, নিরাপত্তা প্রদানসহ একাধিক শর্ত । তবে এসব রোহিঙ্গাদের সবাইকে একই সুরে কথা বলতে দেখা গেছে। অনেকটা শেখানো বুলি’র মত।
    এদিকে প্রত্যাবাসন বিরোধী একটি চক্র ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় রয়েছে। তাদের চোখ রাঙ্গানীতে তটস্থ সাধারন রোহিঙ্গারা। এমনকি তারা উচ্চ স্¦রে ক্থা বলতেও শঙ্কিত। অদৃশ্য এ চক্রের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়। প্রত্যাবাসনের রাজি ১০-১৫টি পরিবারের খবর জানা গেলেও স্পস্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
    টেকনাফ নয়াপাড়া শালবন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের (নং- ২৬) ইনচার্জ মোঃ খালিদ হোসেন জানান, দুই দিনে ২৩৫ পরিবার প্রধানের সাক্ষাৎকার গ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার ২১ পরিবারের সাক্ষাৎ নেওয়া হয়েছিল। তবে এদের মধ্যে কত পরিবার প্রত্যাবাসনের জন্য রাজি হয়েছে তা সাক্ষাৎ প্রক্রিয়া শেষে জানা যাবে বলে জানান তিনি। আবার আগের দিনের চেয়ে সাক্ষাৎকার প্রদানে রোহিঙ্গাদের আগ্রহ বেড়েছে। প্রত্যাবাসন বিরোধী একটি চক্র সক্রিয় থাকার ব্যাপারে তিনি জানান, কোন রোহিঙ্গাকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে এরকম কোন অভিযোগ তিনি পাননি। টেকনাফ র‌্যাবের কোম্পানী কমান্ডার লেঃ মির্জা শাহেদ মাহতাব জানান, র‌্যাবের তিনটি টহল দল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সার্বক্ষনিক তৎপর রয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী উস্কানীমুলক কর্মকান্ড ঠেকাতে কাজ করছে তারা।

    এদিকে বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছেন, ‘আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে। এজন্য আমরা সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে আজ বুধবার প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা ২১৪টি পরিবারের গৃহকর্তাদের মতামত নেয়া সম্পন্ন হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে কাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে’।

    মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘ আমরা গত দুইদিনে মোট ২৩৫টি পরিবারের প্রধানদের সাথে কথা বলেছি। তারা অনেকে আমাদের আশ^স্ত করেছেন। তাই আমরা সকালে ৫টি বাস, ৩টি ট্রাক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমরা এই পর্যন্ত যাদের যেসব রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেছি, তারা প্রত্যেকে স্বেচ্ছায় নিজ উদ্যোগে আমাদের সাথে কথা বলতে এসেছে। এতে কাউকে জোর করে আনা হয়নি। এসব পরিবারে পরিবারের সংখ্যা, তাদের শর্ত সমুহ সহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে ডাটাবেজ প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং রাতের মধ্যেই আমরা তালিকাটি প্রস্তুত করা হবে। এসব তালিকা থেকে সকালে যারা স্বেচ্ছায় গাড়িতে উঠবে মুলত: আমরা তাদেরকেই প্রত্যাবাসন করা হবে’।

    সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বাংলাদেশস্থ মিয়ানমারের দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ও চীনা দূতাবাসের দুইজন কর্মকর্তা বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। তারা পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করবেন। সারাদিন তারা আমাদের সাথে থাকবেন বলে জানিয়েছেন’।

    তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের আধিবাসি হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। আমরা মুলত: এই তথ্যটি রোহিঙ্গাদের জানিয়েছি। এছাড়াও মিয়ানমার সরকার দেয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী এক হাজার ৩৭টি পরিবারের মোট ৩হাজার ৫৪০জনকে ফেরত নেয়ার প্রথম তালিকাটি দেয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি। পর্যায়ক্রমে অন্যান্যদের এই প্রক্রিয়ায় আনা হবে। কারণ এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে’।

    আবুল কালাম বলেন, ‘কাল প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি হিসাবে টেকনাফের কেরণতলী থেকে উখিয়া হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম এলাকা পর্যন্ত নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এজন্য পুলিশ, র‌্যাব সহ অন্যান্য আইন শৃংখলা বাহিনীদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে’।
    আজ কতজন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘যেসব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা হবে, তাদের পুরো ডাটাবেজ তৈরী কাজ চলছে। রাতে এটি সম্পন্ন হবে। এটি সম্পন্ন হলে সকালে বিষয়টি পরিস্কার করে জানা যাবে’।

    গত ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। এদের সঙ্গে রয়েছেন ১৯৮২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া অন্তত সাড়ে ৩ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের জানুয়ারি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।

    সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই মাসে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। ১৫ সদস্যের দলটি দুই দিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তরফে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও চলাফেরায় স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ