• শিরোনাম

    কক্সবাজারের সবুজাযন

    শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের মাঝে তরলীকৃত পেট্রোলিযাম গ্যাস বিতরণে ইতিবাচক প্রভাব

    নিজস্ব প্রতিবেদক | ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৭:০৪ অপরাহ্ণ

    শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের মাঝে তরলীকৃত পেট্রোলিযাম গ্যাস বিতরণে ইতিবাচক প্রভাব

    ইউএনএইচসিআর, আইইউসিএন, বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যান্য অংশীদারদের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকাগুলোর পুনরায সবুজায়ন সম্ভব হচ্ছে।
    রান্নার জ্বালানির জন্য নিকটস্থ জঙ্গল থেকে অতিরিক্ত লাকড়ি সংগ্রহ কক্সবাজারের পরিবেশের জন্য একটি দীর্ঘকালীন উদ্বেগ, যা পরবর্তীতে তীব্রতর হয়েছিল বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমনের কারণে। এমতাবস্থায় ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে শরণার্থী ও স্থানীয় উভয় জনগোষ্ঠী জন্য বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিতরণ করা শুরু হয় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)।

    শরণার্থী ও স্থানীয় মানুষের জীবন ও পরিবেশের উপর বিকল্প জ্বালানির প্রভাব যাচাই করার জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন) ইন্টার এজেন্সি এনার্জি এন্ড এনভায়রনমেন্ট টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইইটিডব্লিউজি)-এর সাথে মিলে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এতে প্রায় ১,২০০ রোহিঙ্গা পরিবার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিকটবর্তী প্রায় ২০০ স্থানীয় বাংলাদেশী পরিবার মিলে মোট ১,৪০০ পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশের ১০টি বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

    এলপিজি বিতরণের ফলে সকল রোহিঙ্গা পরিবার এখন উপকৃত হচ্ছে। সমীক্ষায় দেখা যায়, এলপিজি বিতরণের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জ্বালানি কাঠের চাহিদা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর মধ্যে জ্বালানি কাঠের চাহিদা গড়ে ৮০% পর্যন্ত কমে এসেছে।
    গ্লোবাল রিফিউজি কম্প্যাক্ট-এর অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপর চাপ কমানো, আর সে জন্যেই ইউএনএইচসিআর ও আইওএম রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর কাছাকাছি স্থানীয় বাংলাদেশী পরিবারগুলোর মধ্যে এলপিজি বিতরণ শুরু করে। লক্ষ্য হচ্ছে যৌথভাবে ৫৫,০০০ স্থানীয় পরিবারকে এই সহযোগিতার আওতায় নিয়ে আসা। ইতোমধ্যেই স্থানীয় পরিবারগুলোতে এলপিজি’র ব্যবহার ৭% থেকে বেড়ে ২০% হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে এই পরিবারগুলোর জ্বালানি কাঠের চাহিদা ৫৩% কমে গিয়েছে।

    আইইউসিএন-এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাকিবুল আমিন এ প্রসঙ্গে বলেন, “এলপিজি বিতরণের ফলে জ্বালানি কাঠের বাজারের পুরো চিত্রটিই বদলে গেছে। সমীক্ষায় আমরা জানতে পেরেছি নিকটস্থ বাজারের দোকান ও ডিলারদের কাছে সহজলভ্য এলপিজি থাকার কারণে স্থানীয় জনগণ তাদের বাড়ি ও খাবার রেস্তোরাঁগুলোতে এলপিজি ব্যবহার করা শুরু করছেন”। সাশ্রয়ী বিকল্প জ্বালানির এই সহজলভ্যতার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ ও স্থানীয় পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে উপকৃত হবে।

    রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমনের পূর্বে স্থানীয় বাজার ও বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ৯৫,০০০ টন জ্বালানি কাঠ সরবরাহ করা হত। শরণার্থীদের আগমনের পর এই পরিমাণ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়, সাথে সাথে বাড়তে থাকে তার দাম। এলপিজি বিতরণ কার্যক্রম শুরুর পর এই চাহিদা বর্তমানে কমে মাত্র ৩৭,০০০ টনে এসে পৌঁছেছে; আর বাজারে জ্বালানি কাঠের দামও কমে গেছে।
    খাদ্যাভাস ও পুষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এলপিজি। ধোঁয়া ও দূষণমুক্ত রান্নাঘরে রান্না করাও এখন অনেক সহজ। এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারগুলোতে আরও বেশি রান্না হচ্ছে, খাবারে এসেছে বৈচিত্র। তাদের শাক-সবজি রান্নার হার বেড়েছে, তাই তাদের খাবারে যোগ হচ্ছে অধিক ভিটামিন ও সুষম পুষ্টি।

    উপরন্তু, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় পরিবারগুলোকে এখন আর জ্বালানি লাকড়ি সংগ্রহ করতে দূর-দূরান্তে যেতে হয় না। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে অনেক কিশোরী ও নারীর যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি এর মাধ্যমে কমে গেছে। জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের পেছনে ব্যয় করা সময় এখন শিশু-কিশোরেরা ব্যবহার করতে পারবে তাদের পড়শোনার পেছনে।
    উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বন বিভাগ ও এনার্জি এন্ড এনভায়রনমেন্ট টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইইটিডব্লিউজি)-এর সদস্যদের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে শুধুমাত্র ২০১৯ সালেই কক্সবাজারে ৩০০ হেক্টরের বেশি জায়গা পুনরায় বনায়ন করা সম্ভব হয়েছে। মাটির শক্তিশালীকরণ ও ভূমিধ্বস কমানোর মাধ্যমে এটি দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতেও অবদান রাখছে। এ সবই করা হচ্ছে উদ্ভাবনী উপায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

    বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর-এর রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টিভেন করলিস বলেন, “এলপিজি’র সহজলভ্যতার কারণে জ্বালানি কাঠের চাহিদা ও দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমা, পুনঃবনায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে কক্সবাজারের পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে গিয়েছে। জ্বালানি ও পরিবেশ সংক্রান্ত এই উদ্ভাবনী ও যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের জীবনে অসাধারণ পরিবর্তন এসেছে”।

    সামাজিক প্রভাবের কথা বিবেচনা করলে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বৈশ্বিক কল্যাণের মূল্য প্রায় ৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ২০১০ সাল থেকে জাতিসংঘের রিডিউসিং এমিশনস ফ্রম ডিফরেস্টেশন এন্ড ডিগ্রেডেশন (ইউএন-আরইডিডি) প্রোগ্রামের এক সক্রিয় সদস্য।
    ওয়ার্ল্ড এলপিজি এসোসিয়েশন ও অন্যান্য অংশীদারদের সহযোগিতায় ইউএনএইচসিআর, আইইউসিএন ও ইইটিডব্লিউজি’র পরিকল্পনা হচ্ছে ২০২০ সালে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের মধ্যে এলপিজি বিতরণ কার্যক্রম বৃদ্ধি করা ও এর পাশাপাশি যৌথভাবে পুনঃবনায়ন কর্মকান্ড চালু রাখা। এই সমীক্ষার পূর্ণ মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২০২০ সালের প্রথমার্ধে প্রকাশ করা হবে।

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ