• শিরোনাম

    নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন

    শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাঁধের কাজে ব্যাপক অগ্রগতি

    জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ | ০১ অক্টোবর ২০১৮ | ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

    শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাঁধের কাজে ব্যাপক অগ্রগতি

    সম্রাট শাহ সুজার ‘শাহ’ ও তার স্ত্রী পরীবানুর ‘পরী’ মিলিয়ে নামকরণ হয়েছিল শাহপরীর দ্বীপ। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নে প্রকৃতির অপার সৌন্দয্যের পর্যটন সম্ভাবনাময় একটি জনপদ। কৃষি, লবণ শিল্প ও মৎস শিল্পে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল এ জনপদের। প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন গামী পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য এখানেই নির্মিত হয়েছিল পর্যটক জেটি, মিয়ানমার থেকে গবাদী পশু আমদানির করিডোরও এ দ্বীপেই অবস্থিত।
    দূর্ভাগ্যবশত গত ২০১২ সালের ২২ জুলাই দ্বীপের পশ্চিমের বেড়িবাঁধের অংশবিশেষ বঙ্গোপসাগরের জোয়ারে বিলীন হয়ে যায়। তড়িৎ কোন উদ্যেগ না নেয়াতে দিনে দিনে ভাঙন আরো দীর্ঘ হয়। সাগরের জোয়ারে প্লাবিত হয়ে যায় শতশত মানুষের ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছরে ভাঙন রূপ নেয় আড়াই কিলোমিটার মতো। লোকালয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম টেকনাফ- শাহপরীর দ্বীপ সড়কের প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক বিলীন হয়ে যায়। এভাবে পুরো জনপদটি পরিণত হয়ছিল ধ্বংসস্তুপে।
    বেড়িবাঁধ ভাঙনে দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর জোয়ার ভাটার বৃত্তে বন্দি দ্বীপবাসীর ভোগান্তির শেষ ছিলনা। ভিটেমাটি সর্বস্ব হারিয়ে অনেকে পাড়ি জমিয়েছিল অন্যত্র। দ্বীপবাসীর দাবি ছিল একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মানের। বাঁধের দাবিতে বহু আকুতি, মিনতি, বাদ-প্রতিবাদ, সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধনের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও পালন করেছিল দ্বীপবাসী।
    দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে গত ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় শাহপরীর দ্বীপ বেড়িবাঁধ নির্মাণে ১০৬ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে। পরবর্তীতে প্রকল্পের অর্থ বাড়িয়ে প্রায় দেড়শ কোটি টাকায় বর্ধিত করা হয় বলে জানা যায়। প্রকল্পটি অনুমোদন লাভ করায় আশায় বুক বাঁধে শাহপরীর দ্বীপের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ এবং দাবি জানায় টেকসই ও সুষ্ঠু কাজের স্বার্থে সেনা অথবা নৌ বাহিনীর অধীনে কাজটি সম্পন্ন করার। শেষ পর্যন্ত কাজের দায়িত্ব পান বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
    চলতি বছরের জানুয়ারীর শুরুতে নৌ বাহিনীর ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসএস ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করেন। বর্ষার আগ পর্যন্ত বিরতিহীন ভাবে চলা বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজে ইতোমধ্যে বাঁধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খালের মুখ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি এক কিলোমিটারের কাছাকাছি বাঁধ নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়াতে বাকী অংশের কাজও শুরু হয়েছে।
    বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর ডকইয়ার্ড এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিঃ এর প্রতিনিধি লে. মোঃ ফারুক বলেন, ‘দীর্ঘ অংশ জুড়ে বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ায় সেখানে বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করা অনেক কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সেই চ্যালেঞ্জিং কাজটি সফল ভাবে সম্পন্ন করতে দায়িত্ব নিয়েছি। ইতোমধ্যে, আমরা সাগরের অবিরত জোয়ারে সৃষ্টি হওয়া খালের মুখ অর্থ্যাৎ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশের কাজ শেষ করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের আগেই আমরা বেড়িবাঁধের সম্পূর্ণ অংশের কাজ শেষ করতে পারবো।’
    নৌ বাহিনীর ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সরকার এবং স্থানীয় জনগণ টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের বাহিনী তথা প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতার ওপর আস্থা রেখেছে। আমরা সে আস্থা এবং বিশ্বাসের প্রতিদান দিতে বদ্ধ পরিকর। তাই এ বাঁধ নির্মাণ কাজে কোন ধরনের গাফলতির যেমন সুযোগ নেই তেমনি মানের ক্ষেত্রেও কোন ধরনের আপোষ করা হবেনা। যথাসাধ্য প্রচেষ্টা থাকবে দ্বীপবাসীকে এমন একটি টেকসই বেড়িবাঁধ উপহার দেয়ার, যে ধরনের বেড়িবাঁধের স্বপ্ন তারা দেখে আসছে।’
    এদিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে এলাকাবাসীও। দীর্ঘ ভোগান্তি শেষে স্বপ্নের বেড়িবাঁধ টেকসই ও সুষ্ঠুভাবে নির্মাণ হওয়াতে দ্বীপবাসীর উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। কারণ এ বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলেই তাদের বসবাসের সম্ভাবনাটুকু জিইয়ে থাকার পাশাপাশি রক্ষা পাবে দ্বীপের শত শত একর ফসলি জমি, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। দ্বীপবাসীর আশা, বাঁধ হলেই কৃষি, শিল্প ও পর্যটন সম্ভাবনার এই জনপদ নতুন প্রাণ ফিরে পাবে, বিশ্বব্যাপী কদর বাড়বে দ্বীপের।
    দ্বীপের বাসিন্দা ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য সোনা আলী বলেন, ‘বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ার পর এ জনপদের মানুষ দীর্ঘ সাড়ে ৫ বছর চরম দূর্ভোগে ছিল। বাঁধ ভেঙ্গে শতশত ঘরবাড়ি উদ্ধাস্তুসহ, যোগাযোগের প্রধান সড়কটিও বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এখন বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে দ্বীপের মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছে।’
    প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক ও উপজেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাস্টার জাহেদ হোসেন বলেন, ‘দ্বীপ বাসীর দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ। আমাদের দেখামতে নৌ বাহিনীর প্রতিনিধিদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে বাঁধ নির্মাণ কাজ সন্তোষজনক, কাজের অগ্রগতিতে এলাকাবাসীও খুশি।’
    নৌ বাহিনীর ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন লিঃ এর সহযোগি প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্টান এসএস ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কন্সট্রাকশন এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার শাখারী (ননী বাবু) বলেন, ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজে আমাদের প্রতিষ্টানটি নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠানের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সাপোর্ট দিচ্ছি। সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তারা নিয়মিত কাজ তদারকি করে যাচ্ছেন। কাজে কোন ধরনের অনিয়ম হচ্ছেনা। তাই বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হলে দ্বীপবাসী একটি টেকসই আধুনিক বেড়িবাঁধ পাবে বলে মনে করছি।’
    পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কক্সবাজার এর উপ সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘শাহপরীর দ্বীপে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধ প্রকল্পের কাজটি আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত কাজের মান ভালো, অগ্রগতিও সন্তোষজনক। এখন বর্ষা মৌসুম কেটে গেলে বিরতিহীন ভাবে কাজ করা সম্ভব হবে। আশা করছি, আগামী বর্ষা শুরুর আগেই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ পুরো অংশে শেষ করা সম্ভব হবে।’

    দেশবিদেশ /০১ অক্টোবর ২০১৮/নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ