• শিরোনাম

    মৃত উদ্ধার-১৫, ৪ দালালসহ জীবিত উদ্ধার-৭২, নিখোঁজ-৫১

    সাগরে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ট্রলার ডুবি

    নুরুল করিম রাসেল /জাকারিয়া আলফাজ, সেন্টমার্টিনস থেকে ফিরে : | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২:২৫ পূর্বাহ্ণ

    সাগরে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে  ট্রলার ডুবি

    রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিয়ে সাগর পথে ট্রলারে চেপে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। টেকনাফ সেন্ট মার্টিনসের দক্ষিণে মগঘোলা নাম সাগর এলাকায় ট্রলারটি ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা সব যাত্রী উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নাগরিক। গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ট্রলার ডুবির ঘটনাটি ঘটেছে।
    সেন্ট মার্টিনস নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের উদ্ধার অভিযানে ডুবে যাওয়া ট্রলারের যাত্রীদের মধ্যে ১৫ জনকে মৃত, ৪ দালাল সহ ৭২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া অন্তত ৫১ জন রোহিঙ্গা এখনো নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে।
    জীবিত উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, উখিয়া ও টেকনাফের কয়েকটি ক্যাম্প থেকে সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ১৩৮ জন যাত্রী নিয়ে একটি ফিশিং ট্রলার সোমবার রাতে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী সাগর উপকূল থেকে রওনা হয়। ট্রলারটি সেন্ট মার্টিনস অতিক্রম করে গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে দূর্ঘটনার শিকার হয়ে ডুবে যায়।
    নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের উদ্ধার অভিযানে ডুবে যাওয়া ট্রলারের মাঝিসহ চারজন দালালকে আটক করা হয়েছে। তারা হলেন বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী পাড়ার মৃত. ওলা মিয়ার ছেলে ফয়েজ আহমদ, একই এলাকার হাসিম আলীর ছেলে সৈয়দ আলী, বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কবির আহমদের ছেলে মো. ওসমান ও কুতুপালং ক্যাম্পের পুরাতন রোহিঙ্গা আজিম উদ্দীন। কোস্ট গার্ড টেকনাফ স্টেশান কমান্ডার লেফট্যানেন্ট সোহেল রানা জানান, আটক দালালদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হবে।

    আটক চার দালাল ও ট্রলার মাঝিরা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়া ট্রলারটি বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী পাড়ার আব্দুল আলীর ছেলে মানবপাচারকারী সাইফুলের। সে একজন তালিকাভূক্ত শীর্ষ মানবপাচারকারী।
    কোস্ট গার্ড টেকনাফ স্টেশান কমান্ডার লেফট্যানেন্ট সোহেল রানা জানান, দূর্ঘটনার খবর পেয়ে কোস্ট গার্ড সদস্যরা দ্রæত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। সেখানে আমরা ৭২ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া ১৫ জন রোহিঙ্গাকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। আরো অনেকে নিখোঁজ রয়েছে বলে আমরা জীবিতদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি।
    তিনি আরো বলেন, মৃত উদ্ধার রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১২ জন নারী ও তিন জন শিশু রয়েছে। এছাড়া জীবিতদের মধ্যে ৪৮ জন নারী, ২০ জন পুরুষ ও ৪ জন শিশু রয়েছে। তবে ট্রলারটি অতিরিক্ত যাত্রী বহন করার কারণে ডুবে যায় বলে জানা গেছে।
    নৌবাহিনী সেন্ট মার্টিনস স্টেশান ইনচার্জ লেফট্যানেন্ট জায়েদ জানান, দূর্ঘটনার খবর পেয়ে নৌবাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি টীমে বিভক্ত হয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করেছি দূর্ঘটনার শিকার রোহিঙ্গাদের জীবিত উদ্ধার করতে। তবে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনী যৌথ উদ্ধার অভিযানে আমরা বেশিরভাগ রোহিঙ্গাকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি আরো অনেকে নিখোঁজ রয়েছে, তাই দূর্ঘটনাস্থল ও আশেপাশে তল্লাশি অব্যাহত থাকবে।
    তিনি আরো জানান, যে ট্রলারটি রোহিঙ্গাদের বহন করছিল সেটি ছিল ২২ অশ^শক্তি বিশিষ্ট একটি ইঞ্জিন চালিত কাঠের ট্রলার। যে ট্রলারটিতে স্বাভাবিক যাত্রী ধারণ সক্ষমতা থাকার কথা সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ জন, সেই ট্রলারে প্রায় ১৩৮ জন রোহিঙ্গা উঠানো হয়েছে বলে আমরা জানতে পারি। অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে ট্রলারটি দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

    জীবিত রোহিঙ্গাদের লোমহর্ষক বর্ণনা :
    মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ট্রলার ডুবির ঘটনায় জীবিত উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে দূর্ঘটনার লোমহর্ষক কাহিনী বর্ণনা করেছেন।
    উখিয়া উপজেলার কুতুপালংক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নারী মজুমা (২২) জানান, স্থানীয় দালাল ও ক্যাম্পের রোহিঙ্গা দালালরা মিলে ক্যাম্পে মানবপাচার সক্রিয় রয়েছে। আমার স্বামী মালয়েশিয়াতে বসবাস করে। সে আমাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় যে দালালের মাধ্যমে আমাদের সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা হয়েছে, দালাল চক্রের সদস্যরা পাঁচদিন আগেই আমাদেরকে ক্যাম্প থেকে বের করে তাদের তত্ত¡াবধানে নিয়ে যায়। বাহারছড়া নামক এলাকায় পাহাড়ের কাছে একটি বাড়িতে আমাদের জমায়েত করা হয়। পরে সোমবার আমাদের নোয়াখালী এলাকা থেকে ট্রলারে ওঠানো হয়।
    মাজুমা আরো জানান, ছোট একটি ট্রলারে আমাদের ওঠানো হয়। আমরা ১২০ জন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষ ছাড়াও ১৮ জন শিশু ছিলাম। ট্রলারে আমাদের মাছ রাখার কোল্ড স্টোরে ডুকিয়ে উপর থেকে ছিদ্র করা ঢাকনা চেপে দিয়ে ঢাকনার উপর আরো যাত্রী বসানো হয়। আমরা একজনের গায়ের উপর আরেকজন এভাবে বসেছিলাম। শুরু থেকে আমরা এ অবস্থা দেখে কান্নাকাটি করলে ট্রলারের মাঝি আমাদের বারবার চুপ থাকতে বলে।

    উদ্ধার হওয়া বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা যুবতী কুলসুমা আকতার (১৭) জানান, মালয়েশিয়াতে আমার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা মিলে আমাকে জোর করে ট্রলারে মালয়েশিয়া যেতে বাধ্য করেছেন। দালালরা গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্যাম্পে সিএনজি পাঠিয়ে আমাকেসহ আরো কয়েকজন নিয়ে যায়। তারপর আমাদের নোয়াখালী এলাকার একটি বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে তারা সকাল সন্ধ্যায় মাত্র একবেলা খাবার দিত। পরে গত সোমবার রাতে একটি বোটে তুলে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা বলে।
    টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের সাফিয়া বেগম (২৫) বলেন, আমি এক মেয়ে ও ননদসহ মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ট্রলারে ওঠেছিলাম। ট্রলারটি দূর্ঘটনার শিকার হলে আমি প্রাণে বাঁচলেও আমার মেয়ে এবং ননদকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে।
    তিনি বলেন, দালালরা আমাদের বলেছিল বড় জাহাজে করে আমাদের মালয়েশিয়া পাঠানো হবে। কিন্তু তারা ছোট একটি ফিশিং ট্রলারে প্রায় ১৩৮ জন রোহিঙ্গা নাগরিককে তুলে দেয়। যার কারণে ট্রলারটি দূর্ঘটনার শিকার হয়। ####

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ