• শিরোনাম

    সুপারিশ না মেনে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরে ‘অযৌক্তিক’ ব্যয় প্রস্তাব

    দেশবিদেশ অনলাইন ডেস্ক | ১৮ মে ২০২০ | ৯:৩৫ অপরাহ্ণ

    সুপারিশ না মেনে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরে ‘অযৌক্তিক’ ব্যয় প্রস্তাব

    মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেও কাজ শুরুর আগেই এর অবকাঠামো ব্যয় প্রস্তাব প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রকল্পটিতে প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিংয়ে খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০ টাকা। একই কাজ অন্য প্রকল্পে ৫৫০ টাকা খরচেই বাস্তবায়ন হচ্ছে। আবার অন্য পায়রা বন্দরে চার লেন রাস্তায় প্রতি কিলোমিটারে যেখানে ব্যয় ৬০ কোটি টাকা, সেখানে মাতারবাড়ীতে দুই লেন রাস্তায় খরচ ধরা হয়েছে প্রতি কিলোমিটার ১৬০ কোটি টাকা। আবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির পক্ষ থেকে ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিস ও নির্মাণ পরামর্শক ব্যয় কমানোর কথা বলা হলেও বরং ওই খাতে ৬১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।

    পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) পক্ষ থেকে এই মেগা প্রকল্পের বেশকিছু খাতের ব্যয়কে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। বেশকিছু খাতে ব্যয় কমিয়ে ধরার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) এসব সুপারিশ প্রতিপালন করা হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পটি আদৌ লাভজনক হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

    করোনা পরিস্থিতির আগে সবশেষ গত ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জানা গেছে, ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সেটি ডিপিপি’র সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশ দেন। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে অযৌক্তিক ব্যয় প্রস্তাব এবং আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন তৈরি বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের তথ্য জানা গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের জারি করা কার্যবিবরণীটি সারাবাংলার হাতে রয়েছে।

    পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয় ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ‘মাতাবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রকল্পটি। এই প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা, জাইকার ঋণ ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রকল্প অনুমোদনের পর থেকেই এর বিভিন্ন খাতের খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। অভিযোগ ওঠে, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভার সিদ্ধান্তগুলো প্রকল্প পুনর্গঠনে আমলে নেওয়া হয়নি।

    পরিকল্পনা কমিশনের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের পরামর্শক সেবা খাতে ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিস বাবদ ৫৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়। নির্মাণ পরামর্শক সেবার জন্য ধরা হয় ১২১ কোটি টাকা। পিইসি সভায় এই ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমানোর সুপারিশ ছিল। সর্বশেষ পুনর্গঠিত ডিপিপিতে নির্মাণ খাতের পরামর্শক সেবা বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু ইলেকট্রিক্যাল সার্ভিস অংশে ব্যয় ২৩৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়। অর্থাৎ পরামর্শক বাদ দিয়েও ব্যয় বাড়ানো হয় ৬১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

    প্রকল্পটিতে প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের জন্য ১ হাজার ৯০ টাকা হারে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ সমজাতীয় মোংলা আউটার বার ও পায়রার রমনাবাদ চ্যানেলের প্রতি কিলোমিটার ড্রেজিংয়ে খরচ ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৪৭০ টাকা ও ৫৫০ টাকা। আবার মাতাবাড়ী প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার রাস্তা (দুই লেন) নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা। অথচ পায়রা বন্দরে চার লেন রাস্তায় প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ৬০ কোটি টাকা। পিইসি সভায় বলা হয়, এসব ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমানো আবশ্যক।

    কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, রাস্তা নির্মাণ বাবদ মূল ব্যয়ের অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ইনডিরেক্ট কস্ট ও ৭ শতাংশ ওভারহেড কস্ট ধরা হয়েছে। পিইসি সভায় এ খাতে ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হলেও তা মানা হয়নি। আবার প্রকল্পের আওতায় অনাবাসিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পিডব্লিউডি’র রেট শিডিউল অনুসরণের সুপারিশ করা হলেও তা প্রতিপালন করা হয়নি। প্রশাসনিক ভবন, ওয়্যার হাউজ, জেনারেটর হাউজ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ঠিকাদারের পরিবর্তে দেশীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মাণ করে ব্যয় অনেকাংশে কমানোর সুযোগ ছিল বলেও মত দেওয়া হয়। কিন্তু সে পরামর্শও মানা হয়নি।

    এছাড়া প্রাইস অ্যাডজাসমেন্ট ও প্রাইস কন্টিনজেন্সি খাতে ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছিল। পিইসি সভায় ভবিষ্যতে কোনো খাতে ব্যয় বাড়লে তা সমন্বয় করতে এ দুই খাতের যেকোনো একটি খাতে বরাদ্দ রাখার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু পুনর্গঠিত ডিপিপিতে দুই খাতেই রাখা হয়েছে বরাদ্দ।

    একনেকের বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য শামীমা নার্গিস (সিনিয়র সচিব) জানান, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় পিইসি সভা। সেখানে কিছু সিদ্ধান্ত প্রতিপালনের শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ডিপিপি’তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হয়নি। পিইসি সভার কোনো সিদ্ধান্ত প্রতিপালন করা সম্ভব না হলে তার একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখা থাকা প্রয়োজন হলেও উদ্যোগী মন্ত্রণালয় (নৌপরিবহন) থেকে এ ধরনের কোনো জবাবও পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন শামীমা নার্গিস।

    পরিকল্পনা কমিশনের ওই কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, একনেকে ব্যাপক আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য রাস্তা, ব্রিজ, কালাভার্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় প্রকল্প এলাকার বনজ ও প্রাণিজ সম্পদসহ জনগণের জানমাল রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। প্রকল্প এলাকায় যথেষ্ট পর্যটনের সম্ভাবনা রয়েছে।

    প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে বাড়তি খরচের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। তাই ওই এলাকায় রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় অন্য এলাকার তুলনায় বেশি হওয়াই স্বাভাবিক।

    তারপরও প্রকল্পটির আয়-ব্যয় বিশ্লেষণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, প্রকল্পের আউটপুট এবং দেশের অর্থনীতিতে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের সব দিক বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবতার নিরিখে প্রকল্পে আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। এটি পরে ডিপিপিতে সম্পৃক্ত করতে হবে।

    জানা যায়, সভায় এসব প্রশ্নের বিষয়ে আলাদাভাবে ব্যাখা দেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রকল্পটি অলাভজনক হওয়ার কথা নয় বলেও তাদের বক্তব্যে তুলে ধরেন।

    এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনা সচিব মো. নূরুল আমিন বলেন, ‘জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) বলেছিল, প্রকল্পটি আর্থিকভাবে লাভজনক হবে না। কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষ হলেই দেখা যাবে এটি অবশ্যই লাভজনক হবে।’

    সচিব বলেন, বৈঠকে প্রকল্পটি নিয়ে আরও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ডিপিপি’তে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া একনেক বৈঠকের দুই দিন পর আমি সরেজিমন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। দেখা গেছে, সেখানে এখনো কোনো রাস্তা নেই। অনেক উঁচু করে নতুন রাস্তা তৈরি করতে হবে। এছাড়া প্রায় ৮ কিলোমিটার রাস্তা ব্রিজের মতো করে তৈরি করতে হবে। এজন্য ব্যয় অনেক বেশি পড়বে।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংশ্লিষ্ট যে সড়কগুলো তৈরি করা হচ্ছে, সেখানকার জমিতে লবণাক্ততা অনেক বেশি। ওই এলাকায় রাস্তা নির্মাণ সহজ হবে না। এজন্য কিছুটা বাড়তি খরচ হবে। তবে যদি প্রকল্পে বাড়তি প্রস্তাব করা হয়েও থাকে, প্রকল্প শেষে নির্মাণাতা প্রতিষ্ঠান জাইকা বাড়তি অর্থ ফেরত দিয়ে দেবে। কেবল সড়ক নির্মাণ নয়, প্রকল্পের যেকোনো অংশের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। সূত্র-সারাবাংলার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    মাতারবাড়ী ঘিরে মহাবন্দর

    ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ