সোমবার ২৭শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম
#পর্যটক নিয়ন্ত্রণ #জাহাজ চলাচল সীমিতকরণ #জোন ভাগ করা

সেন্টমার্টিনের পাকা স্থাপনা উচ্ছেদে তাগিদ

তারেকুর রহমান   |   সোমবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২২

সেন্টমার্টিনের পাকা স্থাপনা উচ্ছেদে তাগিদ

সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও বিরল জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নে প্রণীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কক্সবাজারে  মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় রবিবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শহীদ এটিএম জাফর আলম হল রুমে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন।

সভায় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, কীভাবে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষা করা যায় সে বিষয়ে স্থানীয় লোকজন ও পরিবেশবিদদের নিয়ে আলোচনার নির্দেশনা দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উক্ত মতবিনিময় সভায় সেন্টমার্টিন রক্ষায় ইট কংক্রিটের স্থাপনা উচ্ছেদে সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন।  অবৈধ সমস্ত স্থাপনা উচ্ছেদের পর ল্যান্ড জোনিং করাসহ অন্যান্য সুপারিশ বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভায়  সামুদ্রিক গবেষণা ইনস্টিটউিটের মহা পরিচালক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেন্টমার্টির্ননের পরিবেশগত দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, সেন্টমার্টিন নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা যায়- প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টির্ননে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, পর্যটকদের স্থান দিতে গিয়ে পরিবেশের হুমকি ও ক্ষতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র হোটেল-মোটেল নির্মাণ, নির্বিচারে গাছ কর্তন মানুষের ব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্যের পরিত্যাক্ত বজর্য ও প্লাস্টিক সামগ্রীর বজের্য সেন্টমার্টিনের পরিবেশ-প্রতিবেশে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি বহুতল ভবন নির্মাণ, ভবনের পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা এবং খোলা পায়খানা নির্মাণসহ নানা পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে কোরাল তথা প্রবালসহ সেন্টমার্টির্ননের জীববৈচিত্র্য। এনিয়ে উপস্থিত বিভিন্ন বক্তা তাদের বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে সেন্টমার্টিন বাঁচাতে পরিবেশ বিধ্বংসী এসব স্থাপনা অনতিবিলম্বে সরিয়ে নেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রস্তাব করা হয় পর্যটক নিয়ন্ত্রণ করা, রাত্রি যাপন নিষিদ্ধ করা, জাহাজ চলাচল সীমিত করা, ইকোট্যুরিজম এবং স্থানীয়দের বসতবাড়িতে পর্যটকদের রাখা তথা কমিউনিটি পর্যটন ডেভলাপ করা,  সভায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন, কিছু ক্ষমতাশীল ব্যক্তি প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনসহ কক্সবাজারকে শোষণ করে খাচ্ছে। পরিবেশের বিপরীতে গিয়ে তারা সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ করছে। অর্থের মোহে পড়ে তারা এখানকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে মেতেছে। সেন্টমার্টির্নন যাত্রী নিয়ে যে জাহাজগুলো যায় সেই জাহাজগুলো থেকে যাত্রীরা বিভিন্ন নাস্তা ও ব্যবহার্য পণ্যের প্লাস্টিকের বর্জ্য সাগরের পানিতে ফেলে। ফলে সেই অপঁচনযোগ্য প্লাস্টিক সমুদ্রের প্রাণীগুলো খায় এবং মারা যায়। এসব জাহাজের বৈধতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। এমপি আশেক উল্লাহ রফিক প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে ম্যানগ্রোভ তথা বেশি বেশি গাছ লাগানোর সুপারিশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় গাছ-গাছালির বিকল্প নেই। কিন্তু সেন্টমার্টির্ননে গাছ না লাগিয়ে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ।

সেন্টমার্টিন থেকে আগত সচেতন ব্যক্তিরা বলেন, শুধু স্থানীয়দের কিংবা ব্যবসায়ীদের স্থাপনা নয়, সরকারি-বেসরকারি যে স্থাপনা সেন্টমার্টির্ননে গড়ে উঠেছে তা সব ভেঙে ফেলতে হবে। তারা সেন্টমার্টিনের চিকিৎসা সেবার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সেন্টমার্টির্ননের এত বড় হাসপাতাল থাকলেও কোনো চিকিৎসক নেই। জরুরি অবস্থায় কোনো গর্ভবতী নারীকে বোটে করে টেকনাফ হাসপাতালে নিতে নিতে অনেকের মারা যায়। তাই তারা সী অ্যাম্বুলেন্সের দাবি জানান।

সেন্টমার্টিনকে পরিবেশগতভাবে নিরাপদ রাখতে বেশ কয়েক দফা সম্ভাব্য সুপারিশ রাখতে আহ্বান করেছে জেলা প্রশাসন।

সেন্টমার্টিনকে রক্ষায় ৫১টি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় মানুষের জন্য ইকোলজিক্যালি বাসস্থান তৈরির সুযোগ, দ্বীপের বাসিন্দাদের পেশাগত আইডি প্রদান, অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা, দ্বীপের জমি ব্যবহারে নীতিমালা প্রণয়ন, হোটেল-রিসোর্টের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, প্রতিদিন কী পরিমাণ পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণে যাচ্ছেন, তা নিরূপণ, দ্বীপে নির্মিত সরকারি স্থাপনা বা রেস্টহাউসগুলো শুধু দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার, সাগরে বজর্য ফেলা বন্ধ, বজর্য ব্যবস্থাপনায় ১০০ মিটার অন্তর ডাস্টবিন স্থাপন ও ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্বীপে নিস্তব্ধতা ও শান্তি বজায় রাখা, আলো, ফানুস, আতশবাজি ও উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ, সেন্ট মার্টিন সৈকতে ধূমপান নিষিদ্ধ, পাখি, মাছ, কচ্ছপ, কাঁকড়া ও প্রবাল রক্ষায় দ্বীপে স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধকরণ, শব্দদূষণ রোধে যন্ত্রচালিত মোটরসাইকেল, ভটভটি এবং ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক (টমটম) চলাচল নিষিদ্ধ করে ম্যানুয়াল যানবাহন যেমন রিকশা-ভ্যান ব্যবহার নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি। পাশাপাশি সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পুরোপুরি ঘুরে দেখতে গেলে একজন পর্যটককে এক হাজার টাকা ফি এবং রাতে হোটেলে অবস্থান করতে হলে সরকারি কোষাগারে দুই হাজার টাকা জমা দিতে হবে। সেই টাকা জাহাজের টিকিট বা হোটেলকক্ষ ভাড়ার সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে।

এছাড়া সভায় যে সুপারিশগুলো রাখা হয়েছে- জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি, উপজেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, এনজিও প্রতিনিধি, পুলিশ সুপার কক্সবাজার  কোস্টগার্ড এবং কউক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সেন্টমার্টিন দ্বীপ ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করতে হবে।

সেন্টমার্টিনের হোটেল রেস্টুরেন্ট ও সকল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এ ব্যাপারে প্রথমে তাদের এক মাস প্রচার ও উদ্বুব্ধকরণ কার্যক্রম গ্রহণ করার পর পরবর্তী মাস থেকে জরিমানা করা হবে। প্রতি ১০০ মিটার পর পর বিন স্থাপন করতে হবে। নির্ধারিত বিনে ময়লা-আবর্জনা ফেলতে হবে। তা অমান্যে জরিমানা করা হবে। সেকেন্ডারী ডাম্পিং স্থাপন করতে হবে। সেন্টমার্টির্নন দ্বীপে চলাচলকারী জাহাজ-লঞ্চ সমুদ্রে ও দ্বীপে বর্জ্য পদার্থ ফেলবে না। জাহাজে পলিথিন ও প্লাস্টিক পাত্র খাবার, চিপস এবং প্লাস্টিক বোতলে পানি পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। জাহাজে বিন স্থাপন এবং যেকোন বর্জ্য সংগ্রহ করে দ্বীপের বাইরে মূল ভুখন্ডে প্রেরণ নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয় অমান্যে জাহাজ মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স ও রুট পারমিট বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হবে।

দ্বীপকে ঝড় ও ভাঙনের হাত থেকে র ক্ষা করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর উপকূলীয় বন বিভাগের পরামর্শে সেন্টমার্টিন দ্বীপের পেরিফেরিতে কমপক্ষে ১০ হাজার ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ ও কেয়া বেষ্টনি রোপন করবে। জাহাজ চলাচলে সূচী থাকতে হবে। প্রতি জাহাজে কতজন যাত্রী বহন করবে তা নির্ধারণ করতে হবে ইত্যাদি।

মুক্ত আলোচনায় আরো বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার-১ চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম,কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব) ফোরকান আহমদ, পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান, কউক সচিব আবু জাফর রাশেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ নাজমুল হুদা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী, সহ-সভাপতি রেজাউল করিম,  অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আমিন আল পারভেজ, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্তি পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আবছার, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু তাহের, সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি নজিবুল ইসলাম, কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু, কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিজ এর চেয়ারম্যান আবু মোরশেদ খোকা, জাহাজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আহমদ বাহাদুর, সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান।

Comments

comments

Posted ১:১৯ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২২

ajkerdeshbidesh.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

(485 বার পঠিত)

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

প্রকাশক
তাহা ইয়াহিয়া
সম্পাদক
মোঃ আয়ুবুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়
প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত
ফোন ও ফ্যাক্স
০৩৪১-৬৪১৮৮
বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন
01870-646060
Email
ajkerdeshbidesh@yahoo.com