• শিরোনাম

    উদ্বেগজনক ইয়াবা পাচারটেকনাফ সীমান্তে

    ২ দিনে আটক ১০ লাখ ৩২ হাজার ইয়াবার চালান

    দেশবিদেশ রিপোর্ট | ০৮ অক্টোবর ২০১৮ | ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

    ২ দিনে আটক ১০ লাখ ৩২ হাজার ইয়াবার চালান

    সাগর পথে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার বেড়ে গেছে উদ্বেগজনক ভাবে। সীমান্তে বিজিবি, কোষ্টগার্ড, র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের কড়াকড়ি সত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে পাচারকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, সীমান্তে আইন প্রয়োগকারি এসব সংস্থার সদস্যদের রিতীমত চ্যালেঞ্জ দিয়েই পাচারকারির দল লাখ লাখ ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে মিয়ানমার থেকে। বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা গত দু’দিনেই উদ্ধার করেছে ১০ লাখ ৩২ হাজার ইয়াবা টেবলেটের চালান। তন্মধ্যে টেকনাফ থানা পুলিশ গতকালের অভিযানে একাই উদ্ধার করেছে ৬ লাখ ইয়াবা।
    স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বশেষ সারাদেশে প্রায় ১২শ জনের একটি মাদকের তালিকা প্রণয়ন করেছে। তন্মধ্যে কেবল মাত্র কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে তালিকাভুক্ত রয়েছে ৯০০ জন ইয়াবা কারবারি। পরবর্তীতে প্রণীত তালিকা থেকে বাছাই করে এবং নতুন আরো কয়েকজনেরর নাম সহ ৭৩ জনের একটি তালিকার সারসংক্ষেপ পাঠানো হয় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে। তবে তালিকাটি নিয়ে অনেকের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারিদের ক’জন জানিয়েছেন, এমন কারবারে তারা কোনদিন জড়িত ছিলেননা এরকম ক’জন ব্যক্তির নামও সেখানে রয়েছে।
    এ প্রসঙ্গে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মোহাম্মদ হোছাইন বলেন-‘আমি সারাজীবন ইয়াবা বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছি। অথচ আমার নামও ইয়াবা কারবারিদের সাথে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আমার নাম এসব কারবারিদের তালিকায় দেখে আমি হতবাক হয়ে পড়েছি। তাই আমি চ্যালেঞ্জ করে পূণরায় তদন্ত পূর্বক তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেছি।’
    ইউপি মেম্বার হোছাইন আরো বলেন, তালিকায় তার মত আরো ক’জন ইয়াবা বিরোধী ব্যক্তির নামও রয়েছে। এধরণের নিরীহ ব্যক্তিদের নাম যদি প্রকৃত কারবারিদের সাথে তালিকাভুক্ত করা হয় তাহলে সেই তালিকাটি নিয়ে নানা কথা উঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তদুপরি যারা নানাভাবে সীমান্তের ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভুমিকা পালন করে আসছেন তাদেরও যদি এরকম কোন যাচাই বাছাই ছাড়াই তালিকাভুক্ত করা হয় তাহলে ইয়াবার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভুমিকা পালনকারিরা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়তে বাধ্য হবেন। এক্ষেত্রে ইয়াবার বাজার স্তিমিত হবার চেয়ে উল্টো চাঙ্গা হবে বেশী।
    সর্বশেষ এ তালিকারও সর্বশীর্ষে রয়েছেন ইয়াবা সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উখিয়া-টেকনাফের আওয়ামী লীগ দলীয় বিতর্কিত এমপি আবদুর রহমান বদির নাম। তালিকায় এমপি বদির পরিবারের আরো প্রায় ২০ জন সদস্যের নামও রয়েছে। তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে রয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম ইয়াবা ডিলার হিসাবে পরিচিত টেকনাফের শিলবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা হাজী সাইফুল করিম। তালিকাটি নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে অভিযানের নির্দ্দেশ দেয়া হয়েছে।
    এ তালিকা নিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ সহ অন্যান্য এলাকায় গত দু’সপ্তাহ ধরে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগকারি সংস্থার সদস্যদের নিয়ে তালিকাভুক্ত কারবারিদের ঘরে ঘরে অভিযানও অব্যাহত রেখেছে। কক্সবাজার জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সৌমেন মন্ডল জানান, অভিযানে তালিকাভুক্তদের পেলেই আটক করা হবে।
    এদিকে টেকনাফ সীমান্তের ইয়াবা কারবারিদের নিয়ে একের পর এক তালিকা করা হলেও মাত্র হাতে গুনা ক’জন ইয়াবা গডফাদার এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বেশীর ভাগ ইয়াবা ডন টেকনাফ সীমান্তে অবস্থান নিয়ে গোপনে তাদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তালিকাভুক্ত ইয়াবা ডন মৌলভী মুজিবুর রহমানের সিন্ডিকেট সীমান্তে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ইয়াবা ডন মৌলভী মুজিবুর রহমান হচ্ছেন টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র এবং এমপি আবদুর রহমান বদির ছোট ভাই।
    মাত্র ক’দিন আগেও টেকনাফ পৌর পরিষদের অনুষ্টিত এক সভায় তালিকাভুক্ত ইয়াবা ডন মৌলভী মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এ প্রসঙ্গে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রনজিত কুমার বড়–য়া জানান-‘ তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারিরা কেউই টেকনাফে প্রকাশ্যে নেই। ইয়াবা বিরোধী আমাদের অভিযান চলছে। মৌলভী মুজিবুর রহমানের উপস্থিতির কথা শুনে সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে তিনি পালিয়ে গেছেন।’
    এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেছেন-‘ ইয়াবা কারবার নিয়ে কোন আপষ নেই। তিনি এমপি-চেয়ারম্যান বা পুলিশ সদস্য যেই হোন না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবেই।’
    এদিকে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার উদ্বেগজনক ভাবে বেড়েছে গভীর সাগর পথে। শনিবার কেবল মাত্র এক রাতেই টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সৈকতে কয়েকটি নৌকা থেকে ইয়াবা খালাস করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। টেকনাফের সাবরাং থেকে কক্সবাজার শহরতলির কলাতলি পর্যন্ত দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন সৈকতই হচ্ছে এখন সাগরের নৌকা বোঝাই ইয়াবার চালান খালাসের সহজ পথ। নৌকা থেকে ইয়াবা খালাস নিয়ে পাচারকারিদের সাথে আইন শৃংখলা রক্ষাকারি সংস্থার সদস্যদের রিতীমত লুকোচুরি খেলাও চলছে।
    এরকমই লুকোচুরি খেলার ঘটনা ঘটেছে শনিবার রাতে। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রনজিত কুমার বড়–য়া জানান-‘ পুলিশের নিকট খবর ছিল ইয়াবার বড় বড় চালান খালাস হবে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন নোয়াখালী পাড়া সৈকতে। আমি যথারীতি ফোর্স নিয়ে সৈকতে রাত ৮ টার পরই ওঁৎপেতে থাকি। ইয়াবা বোঝাই নৌকাও প্রায় তীরের কাছাকাছি আসে। কিন্তু তারা খবর পেয়ে আবার পেছনে সরে পড়ে।’
    টেকনাফের ওসি বলেন‘ পুলিসের সোর্সের পরামর্শে তারা (পুলিশ) ফিরে যান। ভোর রাতে পাচারকারিরা পুলিশের অনুপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে ইয়াবা বোঝাই নৌকা আবারো তীরে ভীড়ায়। সোর্সের খবর পেয়ে পূণরায় পুলিশের দল সৈকতে অভিযানে নামে। এসময় পাচারকারির দল নৌকা থেকে ইয়াবার চালান খালাস করছিল।
    পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারিরা তাড়াহুড়ো করে গভীর সাগরে পাড়ি জমায়। এসময় সৈকতের পানি থেকে ভাসমান দু’টি প্যাকেট উদ্ধার করে পুলিশ। প্যাকেট দু’টিতে পাওয়া যায় ৬ লাখ ইয়াবা। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) নিহাদ আদনান তাইয়ান জানান, পাচারকারিদের সনাক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
    অপরদিকে মেরিন ড্রাইভের টেকনাফ নোয়াখালী পাড়ার একই সৈকতে আরো কয়েকটি নৌকা বোঝাই ইয়াবা খালাসের সংবাদ পেয়ে শনিবার রাতে ৩ টি টহল দল নিয়ে টেকনাফ বিজিবি ২ ব্যাটালিয়ানের সদস্যরা অভিযানে নামে। বিজিবি-২ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আছাদুদ-জামান চৌধুরী জানান, সারা রাত টহল দিয়ে গতকাল ভোররাতে সাগরে ভাসমান অবস্থায় ২ লাখ ১০ হাজার ইয়াবা ভর্ত্তি একটি বস্তা উদ্ধার করা হয়েছে।
    বিজিবি সদস্যরা গতকাল অপর এক অভিযান চালিয়ে টেকনাফ সড়কের হোয়াইক্যং তল্লাশী ফাঁড়িতে কক্সবাজারগামি একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে উদ্ধার করেছে আরো ১৯ হাজার ইয়াবা। একই সড়কের দমদমিয়া তল্লাশী ফাঁড়িতে বিজিবি সদস্যরা আরো এক অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করে আরো ১০ হাজার ইয়াবা।
    এদিকে র‌্যাবের একটি দল গতকাল দুপুরে টেকনাফ পৌরসভার অলিয়াবাদ গ্রামের এক ইয়াবা ডেরায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছে ৮৩ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা। র‌্যাব সদস্যরা এসময় সৈয়দ আলম (৩৬) নামের একজন কারবারিকে আটক করেছে। এর আগের দিন শনিবার সন্ধ্যায় কোষ্টগার্ড সেন্টমার্টিন্স দ্বীপ সন্নিহিত সাগরে একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকাকে ধাওয়া দিয়ে উদ্ধার করেছে আরো ১ লাখ ১০ হাজার ইয়াবার চালান। প্রসঙ্গত-গত দু’দিনে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও কোষ্টগার্ডের পৃথক ৫ টি অভিযানে এত বিপুল পরিমাণের ইয়াবা উদ্ধার করা গেলেও আটক করা হয়েছে কেবল একজন পাচারকারিকে।

     

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ