• শিরোনাম

    স্বাভাবিক জীবন বেছে নেয়াদের পুনর্বাসন করা হবেÑস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    মহেশখালীতে ৪৩ জলদস্যুর আত্মসমর্পন

    শহীদুল্লাহ্ কায়সার/ মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন মহেশখালী থেকে ফিরে ঃ | ২১ অক্টোবর ২০১৮ | ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

    মহেশখালীতে ৪৩ জলদস্যুর আত্মসমর্পন

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, মহেশখালী-কুতুবদিয়াকে জলদস্যু মুক্ত করেই ছাড়বো। যে জলদস্যুরা তাদের ভুল বুঝতে পেরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত এসেছে। তাদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা হবে। কক্সবাজারের জেলাপ্রশাসককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ ছাড়া আত্মসমর্পণকারিদের বিরুদ্ধে কোন মামলা থাকলে তা লঘু করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।’
    মন্ত্রী গতকাল ২০ অক্টোবর (শনিবার) কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও গুলিসহ ৪৩ জলদস্যুর আত্মসমর্পন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। বেলা ১২ টার সময় মহেশখালী এবং কুতুবদিয়া উপজেলার দুর্ধর্ষ ৬ জলদস্যু বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পন করেন।
    এ সময় তাঁদের কাছে থাকা বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও গুলিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। আত্মসমর্পনকারি ৬ জলদস্যু বাহিনী হলো কুতুবদিয়ার রমিজ বাহিনী, মহেশখালীর রমিজ বাহিনী, নুরুল আলম ওরফে কালাবদা বাহিনী, আইয়ুব বাহিনী এবং আলাউদ্দিন বাহিনী। উল্লেখিত ৬ বাহিনীর মধ্যে কুতুবদিয়ার রমিজ বাহিনী প্রধান রমিজসহ তার ১ সহযোগী, আনজু বাহিনী প্রধান আনজুসহ তার ১০ সহযোগী, কালাবদা বাহিনী প্রধান নুরুল আলম ওরফে কালাবদাসহ তার ৬ সহযোগী, জালাল বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ইসমাইলের নেতৃত্বে বাহিনীর ১৫ সদস্য, আইয়ুব বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড আব্দুল মন্নান ওরফে কালুর নেতৃত্বে বাহিনীর ৯ সদস্য এবং আলাউদ্দিন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন রয়েছে আত্মসমর্পণকারিদের তালিকায়।
    উল্লিখিত ৬ বাহিনীর ৪৩ সদস্য হাতে থাকা দেশি-বিদেশি ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৭ হাজার ৬’শ ৩৭ রাউন্ড গোলাবারুদ হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে বেলজিয়ামের তৈরি একটি এসএমজি, ১টি বৃটিশ পয়েন্ট ত্রি এইট রিভলবার, ২টি দেশীয় তৈরি পিস্তল, ৫২টি দেশি-বিদেশি একনলা বন্দুক, ২টি দেশি-বিদেশি দুই নলা বন্দুক, ১৯টি ওয়ান শ্যুটার গান, ১৫টি ত্রি কোয়ার্টার গান এবং ২টি পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেল।
    ৬ দস্যু বাহিনীর মধ্যে আন্জু বাহিনী ২৪টি অস্ত্র ও ৩৪৫ রাউন্ড গোলাবারুদ, রমিজ বাহিনী ৮টি অস্ত্র ও ১২০ রাউন্ড গোলাবারুদ, নুরুল আলম প্রকাশ কালা বদা বাহিনী ২৩টি অস্ত্র ও ৩৩৩ রাউন্ড গোলাবারুদ, জালাল বাহিনী ২৯টি অস্ত্র ৬৭৯৮ রাউন্ড গোলাবারুদ আয়ুব বাহিনী ৯টি অস্ত্র ও ৩৭ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং আলাউদ্দীন বাহিনী প্রধনা প্রধান আলাউদ্দীন ১টি অস্ত্র ও ৪ রাউন্ড গুলি হস্তান্তর করে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অস্ত্র ও গুলিসহ আত্মসমর্পন করে তারা।
    আত্মসমর্পনকারি ৪৩ জলদস্যুর মধ্যে ১২ জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত জলদস্যু। দীর্ঘসময় ধরে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়িয়ে তারা বঙ্গোপসাগরে দস্যুবৃত্তি থেকে শুরু করে লবণের মাঠ, চিংড়ি ঘের, পানের বরজসহ জমি দখলের ঘটনায় জড়িত ছিলো। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়া চ্যানেল, মহেশখালী এবং কুতুবদিয়া চ্যানেলে চলাচলরত মাছ ধরার ট্রলার ছিলো তাদের প্রধান টার্গেট। আধিপত্য বিস্তারকারীদের ভাড়াটিয়া হিসেবে অর্থের বিনিময়ে অপরাধ কর্মকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
    উপজেলার চিহ্নিত দুর্ধর্ষ জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করবে। বড় মহেশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। এমন সংবাদ পেয়ে গতকাল বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হয় মহেশখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে রাজনীতিক, স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা ছিলো এই তালিকায়। আত্মসমর্পন উপলক্ষে মহেশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্মাণ করা হয় অস্থায়ী মঞ্চ। বেলা পৌনে ১২ টায় মঞ্চে হাজির হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। বেলা ১২ টায় আনজু বাহিনী প্রধান আনজু মিয়ার আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর একে একে আত্মসমর্পণ করতে থাকে কুতুবদিয়ার রমিজ বাহিনী, মহেশখালীর নুরুল আলম ওরফে কালাবদা বাহিনী, জালাল বাহিনী, আইয়ুব বাহিনীর সদস্যসহ আলাউদ্দিন বাহিনী প্রধান আলাউদ্দিন।
    আত্মসমর্পণের পর কৃত অপরাধ স্বীকার করে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে আত্মসমর্পণকারি জমির উদ্দিন বললো, সন্তানদের নিয়ে অভাবে ছিলাম। আমার মতো কেউ যাতে না হয় সেটি আমার মিনতি। যারা এখনো আত্মসমর্পণ করেনি তাদের বলবো,আত্মসমর্পণ করো। এতে ভালো হবে। মহেশখালীতের অনেক উন্নয়ন কাজ হবে। আমরা সেখানে কাজ করতে পারবো।
    আনজু বাহিনী প্রধান আনজু নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বললো, এ জগত ভালো নয়। অন্ধ জগত। ঘৃণার জগত। অনেক মায়ের বুক খালি করেছি। আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আমার অনুরোধ জলদস্যু, অস্ত্রের কারিগর যে যেখানেই থাকুন, আত্মসমর্পণ করুন।
    সভায় র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার-৩ এর সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহম্মেদ, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, কক্সবাজারের জেলাপ্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন, জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তাফা, জেলা আওয়ামীল সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
    আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের কথা যেমন ভাবছেন। তেমনি দেশ কিভাবে শান্তিতে থাকবে তারও চিন্তা করছেন। জলদস্যুরা যাতে আগের পেশায় ফিরতে না পারে সেজন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। আত্মসমর্পণকারিদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করা হবে। যদি কেউ আবার আগের পেশায় ফিরে গেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা।
    র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, দুই ধরনের লোক আজ আত্মসমর্পণ করলো। যাঁরা বঙ্গোপসাগরে দস্যুবৃত্তি করতো। আর যারা বিবদমান বিভিন্ন গোষ্ঠীর হয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অংশ নিতো। আপনারা সহযোগিতা করলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মহেশখালী-কুতুবদিয়াকে জলদস্যুমুক্ত করবো। মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করবে। মহেশখালীতে অবশ্যই শান্তির সুবাতাস বইবে।
    আত্মসমর্পণকারি ৬ বাহিনীর সশস্ত্র জলদস্যুরা হলো
    ১)আনজু বাহিনী(সোনাদিয়া,মহেশখালী)ঃ
    সোনাদিয়ার আনজু বাহিনীর প্রকাশ বদি আলমের ছেলে আনজু মিয়া সিকদার (৩৩), একই এলাকার  মোস্তাফার ছেলে সুমন মিয়া(৩৮), এখলাছের ছেলে মকসুদ মিয়া(৩২),আব্দুর রহমানের ছেলে মোনাফ মিয়া(২৮), মোজাফ্ফরের ছেলে মোবারক(২৭), বাহাদুর মিয়ার ছেলে মনজুর মিয়া(৩০), বাদশা মিয়ার ছেলে নুরুল মোস্তফা প্রকাশ নাগু(৩০),নুরু মিয়ার ছেলে ছৈয়দ হোছন(৩০),বাহাদুর মিয়ার ছেলে নবাব মিয়া(২৯), আব্দুল গফুর নাগু মেম্বারের ছেলে ইমতিয়াজ উদ্দীন নকিব। ২) রমিজ বাহিনী(কুতুবদিয়া)
    কুতুবদিয়ার রমিজ বাহিনী প্রধান ধুরং এলাকার নজির আহমদের ছেলে রমিজ উদ্দীন(৫৩) ও আবু মোছার ছেলে ছালেহ আহমদ।
    ৩) কালা বদা বাহিনী(কালারমারছড়া)
    কালা বদা বাহিনীর প্রধান আবুল কাসেমের ছেলে নুরুল আলম প্রকাশ কালা বদা(৪৪),মোহাম্মদ আমিনের ছেলে রশিদ মিয়া(২৯), নুরুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ আলী(৩৩),করিম মিয়ার ছেলে আলমগীর প্রকাশ টুইন্না(২৪), ইসমাইলের ছেলে আবু জাফর(৪৮),নেজাম উদ্দিনের ছেলে মোঃ আলা উদ্দীন।
    ৪) জালাল বাহিনী(হোয়ানক)
    জালাল বাহিনীর সেকেন্ড কমান্ড ছিদ্দিক আহমদের ছেলে ইসমাইল(৩১), বশির আহমদের ছেলে মোস্তাফা কামাল পারভেজ((২৫), ছিদ্দিক আহমেদের ছেলে ওসমান(৩০),আবুল কালামের পুত্র আহমদ জামান(৪০),আবুল কালামের ছেলে নুরুল আমিন(২৬),ফরিদুল ইসলামের ছেলে আবু তাহের (৩১), ছিদ্দিক আহমদের ছেলে আবদুল মন্নান(২৬),মজিবুর রহমানের ছেলে আবদুর মন্নান-২(৩৩), তার ভাই রাশেদ(৩২), ছৈয়দ আহমদের ছেলে লোকমান(৩১),নুর আহমদের ছেলে জয়নাল আবেদীন(৩৫), মোঃ শরীফের ছেলে মোঃ শহিদুল্লাহ(৪৫), নছিমের ছেলে বাদল(৩৪), রফিক উদ্দীনের ছেলে মাহবুব আলম(৩৫), মৌলভী রফিক উদ্দীনের ছেলে আতা উল্লাহ বাহারী(৩৩)।
    ৫) আয়ুব বাহিনী( হোয়ানক)
    আয়ুব বাহিনীর সেকেন্ড কমান্ড বদর আমিনের ছেলে আবদুল মন্নান(২৫), সৈয়দ মিয়ার ছেলে মোঃ জসিম(২৭),গোলাম কুদ্দুসের ছেলে মোঃ রবিউল আলম(২২), মোক্তার আহমদের ছেলে মোঃ রুবেল(২২),জোনাব আলীর ছেলে মোঃ আবু তাহের(২৪),গোলাম কুদ্দুসের ছেলে মোঃ আনোয়ার (২৭), সিরাজের ছেলে মোঃ আনোয়ার পাশা(২৭), করিমদাদের ছেলে মোঃ ইউনুছ(২৮) গোলাম কুদ্দুসের ছেলে মোঃ কামাল(৩৫)
    ৬) আলা উদ্দিন বাহিনী( বড় মহেশখালী) আলাউদ্দীন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দীন(৪৫) ।

    দেশবিদেশ /২১ অক্টোবর ২০১৮/নেছার

    Comments

    comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • ফেসবুকে দৈনিক আজকের দেশ বিদেশ