দেশবিদেশ ডেস্কঃ | শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | 16 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বর্তমান যুগ তীব্র প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষের যুগ। এ যুগে তরুণ প্রজন্মের সামনে যেমন অগণিত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে, ঠিক তেমনি যুক্ত হয়েছে দ্রুত সফল বা ধনী হওয়ার এক মানসিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চাকচিক্য, বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রদর্শনী এবং রাতারাতি ‘মিলিয়নেয়ার’ বনে যাওয়ার গল্প তরুণদের একটি বড় অংশকে এক চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে থাবা মেলেছে অনলাইন জুয়া, বেটিং অ্যাপস, ক্রিপ্টো-স্ক্যাম এবং বিভিন্ন অবৈধ আর্থিক ফাঁদ। ‘শর্টকাট’ বা দ্রুত বড়লোক হওয়ার এ মরণনেশায় জড়িয়ে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ ধ্বংস করে ফেলছে তাদের ক্যারিয়ার, পরিবার এবং নৈতিকতা। অথচ ইসলাম আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই মানবজাতিকে, বিশেষ করে যুবসমাজকে এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ক্যারিয়ারের গাইডলাইন দিয়েছে, যা শুধু দুনিয়াতেই মানসিক শান্তি নিশ্চিত করে না, বরং আখিরাতের চিরস্থায়ী মুক্তির পথও সুগম করে।
অনলাইন জুয়া ও ব্যাটিংয়ের ফাঁদ
ডিজিটাল দুনিয়ার অপব্যবহারের ফলে আজকের তরুণদের একটা অংশ এমন কিছু আয়ের উৎসের দিকে ঝুঁকছে যা আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয় মনে হলেও আসলে তা মরীচিকা। ক্রিকেট বা ফুটবলের লাইভ ম্যাচকে কেন্দ্র করে অনলাইন বেটিং, বিভিন্ন ক্যাসিনো অ্যাপস এবং কোনো রকম পরিশ্রম বা মেধা ছাড়া শুধু টাকা খাটিয়ে দ্বিগুণ করার ভুয়া ‘রিয়েল এস্টেট’ বা এমএলএম (MLM) স্কিমগুলোতে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার তরুণ নিঃস্ব হচ্ছে।
ইসলাম এ ধরনের যে কোনো লেনদেনকে ‘মাইসির’ তথা জুয়া বা অন্যায্য আর্থিক সুবিধা হিসাবে সরাসরি হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তিরগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সূরা আল-মায়েদা, আয়াত : ৯০)।
জুয়া বা অবৈধপথে যে অর্থ আসে, তাতে কোনো ‘বারাকাহ’ বা কল্যাণ থাকে না। ইতিহাস সাক্ষী, রাতারাতি জুয়া বা লটারির মাধ্যমে ধনী হওয়া কোনো মানুষই শেষ পর্যন্ত তার সম্পদ ধরে রাখতে পারেনি এবং মানসিকভাবে সুখী হতে পারেনি।
ইবাদত কবুল হওয়ার মূল শর্ত
অনেকেই মনে করেন, উপার্জন যেভাবে বা যে পথেই হোক না কেন, দান-সদকা, নামাজ বা হজ করলেই বোধহয় সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। এটি একটি চরম ভ্রান্ত ধারণা। ইসলামি শরিয়তের স্পষ্ট বিধান হলো, আপনার পুরো জীবন এবং ইবাদত কবুল হওয়ার প্রধানতম পূর্বশর্ত হলো আপনার পেটের দানাটি হালাল হতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘এমন একটি দেহ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যা হারাম উপার্জনের খাদ্যে লালিত-পালিত হয়েছে। হারাম খাদ্যে বর্ধিত মাংসপিণ্ডের জন্য জাহান্নামের আগুনই সবচেয়ে উপযোগী।’-(সুনানে তিরমিজি)।
শুধু তাই নয়, আমরা যখন গভীর রাতে হাত তুলে আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে দোয়া করি, সেই দোয়া কবুল হওয়ার পেছনেও রয়েছে হালাল খাদ্যের সরাসরি সংযোগ। সহিহ মুসলিমের এক বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, ধূলিমলিন পোশাকে আকাশের দিকে হাত তুলে আকুল হয়ে বলছে, ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম এবং সে হারাম দিয়েই পুষ্টি লাভ করেছে। রাসূল (সা.) বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘এমতাবস্থায় তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে?’ (সহিহ মুসলিম)। অতএব, তরুণদের বুঝতে হবে যে, কোটি টাকার অবৈধ ক্যারিয়ারের চেয়ে অল্প টাকার হালাল জীবিকা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।
হালাল ব্যবসা ও চাকরির ফজিলত
ইসলাম কখনো উপার্জনকে ছেড়ে দিয়ে সংসারবিরাগী বা অলস হয়ে বসে থাকতে বলেনি। বরং ইসলাম শ্রমের মর্যাদা দেয় এবং সততার সঙ্গে ব্যবসাকে অন্যতম সর্বোত্তম পেশা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। একজন তরুণ যখন তার মেধা, সততা এবং দক্ষতার মাধ্যমে একটি হালাল ক্যারিয়ার গড়ে তোলে, তখন তার প্রতিটি কর্মঘণ্টা ইবাদত হিসাবে গণ্য হয়।
যারা সততার সঙ্গে ব্যবসা বা চাকরি পরিচালনা করেন, তাদের মর্যাদা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক উঁচুতে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও আমানতদার (বিশ্বস্ত) ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীগণ, সিদ্দিকীন (সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ) এবং শহীদদের সঙ্গী হবেন।’ (সুনানে তিরমিজি)।
অনুরূপভাবে, যারা বিভিন্ন পর্যায়ে চাকরি করছেন, তাদের জন্য সততা ও সময়ের হেফাজত করা ফরজ। দায়িত্ব অবহেলা না করা, ঘুস বা দুর্নীতির আশ্রয় না নেওয়া এবং নিজের কাজকে সর্বোচ্চ নিখুঁতভাবে করাই হলো একজন মুসলিম তরুণের পেশাদারত্ব (Professionalism)। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন যে, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, সে যেন তা অত্যন্ত নিখুঁত ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে।’ (বায়হাকি)।
হালাল ক্যারিয়ারের বরকত
অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ মানুষের মনে অহংকার, লোভ এবং পাপাচারের জন্ম দেয়। অন্যদিকে, হালাল উপার্জনের সবচেয়ে বড় বৈষয়িক গুণ হলো-‘বারাকাহ’ বা প্রাচুর্য ও মানসিক প্রশান্তি। বরকত মানে শুধু টাকার অঙ্ক বড় হওয়া নয়; বরকত হলো অল্প টাকাতেও অভাব দূর হওয়া, পরিবারে শান্তি থাকা, সন্তান নেককার হওয়া এবং বড় কোনো জটিল রোগ বা বিপদ থেকে মুক্ত থাকা।
একজন সৎ চাকরিজীবী বা উদ্যোক্তা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। তার মনে কোনো আইনি জটিলতা বা পরকালের শাস্তির ভয় থাকে না। এ মানসিক প্রশান্তি কোটি টাকা খরচ করেও কেনা সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুসংবাদ দিয়েছেন : ‘যে পুরুষ বা নারী ইমান থাকা অবস্থায় সৎকাজ করবে, আমি অবশ্যই তাকে এক পবিত্র ও আনন্দময় জীবন (হায়াতান তায়্যিবাহ) দান করব।’-(সূরা আন-নাহল, আয়াত : ৯৭)।
তরুণদের প্রতি দিকনির্দেশনা
যুবসমাজকে এ ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং একটি চমৎকার হালাল ক্যারিয়ার গঠনে সমাজ ও তরুণদের নিজেদের যেসব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি তা হলো-ধৈর্য ও সন্তুষ্টি : রাতারাতি বড়লোক হওয়ার লোভ পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ প্রত্যেকের তাকদির বা রিজিক নির্ধারণ করে রেখেছেন। বৈধ উপায়ে চেষ্টা করলে রিজিক নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাবেই। দক্ষতা উন্নয়ন : প্রযুক্তির এ যুগে শুধু ডিগ্রির পেছনে না ছুটে নিজেকে ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং, গ্রাফিক ডিজাইন বা ই-কমার্সের মতো শরিয়াহসম্মত আধুনিক পেশায় দক্ষ করে তুলতে হবে। সংযম ও সঠিক সঙ্গ : ফ্রেন্ড সার্কেল বা বন্ধুদের নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। যারা অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ে আসক্ত, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। পিতা-মাতার ভূমিকা : সন্তানদের আয়ের উৎসের দিকে বাবা-মাকে নজর রাখতে হবে। সন্তান হঠাৎ করে বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করলে তার অর্থের উৎস খোঁজ নেওয়া অভিভাবকের দায়িত্ব।
তারুণ্য হলো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান এবং শক্তিশালী সময়। কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার যৌবনকাল কীভাবে ব্যয় করেছে সে হিসাব দেওয়া ছাড়া এক কদমও নড়তে দেওয়া হবে না। তাই হে প্রিয় তরুণ সমাজ! সাময়িক লোভের বশবর্তী হয়ে অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ের মতো অন্ধকার চোরাবালিতে নিজের ভবিষ্যৎ, পরিবার এবং ইমানকে বিসর্জন দেবেন না। অল্প উপার্জনে যদি আল্লাহর ভয় (তাকওয়া) ও সততা থাকে, তবে তাতেই মিলবে জীবনের প্রকৃত স্বাদ। আসুন, ‘উপার্জনে সততা ও হালাল ক্যারিয়ার’ গড়ার প্রতিজ্ঞা করি; নিজেকে একজন সৎ ও দক্ষ নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলি, যা আমাদের দুনিয়াকে করবে সুন্দর এবং আখিরাতকে করবে গৌরবময়।
লেখক : সহসম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর