রেজাউল করিম রেজা | বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 84 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
পৃথিবীর পথহারা মানুষকে আলোর পথ দেখাতে যুগে যুগে যেসব ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে, হজরতুল্লামা শাহ্ আবদুল মালেক আল-কুতুবী (রহ.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে অনন্য প্রতিভার অধিকারী আলেম, আধ্যাত্মিক সাধক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর বহুমাত্রিক জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক গভীরতা তাঁকে দেশ-বিদেশে খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
১৯১১ সালের জুলাই মাসে কক্সবাজার জেলার পুণ্যভূমি কুতুবদিয়া দ্বীপের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা হাফেজ শামসুদ্দীন (রহ.) এবং মাতা বদিউজ্জামাল ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির। মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি চট্টগ্রামের দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে আলিম ও ফাজিল সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে প্রতিটি স্তরেই অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
তিনি ছিলেন জ্ঞানের এক অতল সমুদ্র। এ কারণেই আলেম সমাজ তাঁকে ‘বাহরুল উলুম’—অর্থাৎ ‘জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর স্মরণশক্তি ছিল প্রবাদপ্রতিম; কিতাবের কোনো পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে, তা তিনি হুবহু বলে দিতে পারতেন।
ইলমে তফসির, হাদিস, ফিকহ থেকে শুরু করে তাসাউফ ও মারেফাত—ইসলামি জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় তাঁর ছিল বিস্তৃত ও গভীর বিচরণ। তাঁর ভাষাগত শৈলী ও বাচনভঙ্গি শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করত।
দারুল উলুম আলিয়ায় অধ্যয়নকালেই তিনি কাদেরীয়া সিলসিলার পীর হজরত হাফেজ ছৈয়দ মুনির উদ্দীন নুরুল্লাহ (রহ.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে খিলাফত লাভ করেন।
তবে তিনি প্রথাগত পীরতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে নির্জন সাধনা ও ‘রেয়াজত’-কে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ১৯৪৯ সাল থেকে তিনি পাহাড়, অরণ্য ও সমুদ্রের নির্জনে কঠোর সাধনায় আত্মনিবেশ করেন। ক্ষুধা ও নিদ্রাকে সংযমে রেখে তিনি ফানা-ফিশ শায়খ থেকে বাকা-বিল্লাহর উচ্চতর মাকামসমূহ অতিক্রম করেন বলে তাঁর অনুসারীরা বিশ্বাস করেন।
১৯৬০ সালে কুতুবদিয়ার ধুরুং গ্রামে তিনি ‘কুতুব শরীফ দরবার’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি দ্রুতই তাসাউফ চর্চা ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এর আগে তিনি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা ও মাঝিরঘাট এলাকায় নিয়মিত ভক্তদের দ্বীনি তালীম প্রদান করতেন। তাঁর জিকিরের মাহফিলগুলো ছিল নূরানী পরিবেশে পরিপূর্ণ, যেখানে মানুষের অন্তর প্রশান্তি ও আত্মিক শান্তি লাভ করত।
তিনি ছিলেন সুন্নাতে রাসুল (সা.)-এর কঠোর অনুসারী। সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি বাতিলপন্থীদের রক্তচক্ষু ও প্রাণনাশের হুমকিকেও উপেক্ষা করেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত ‘সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল’ ছিল দেশবরেণ্য আলেমদের মিলনমেলা।
তাঁর জীবনে নানা অলৌকিক ঘটনার কথা ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। ১৯৫৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সান্নিধ্যে আসেন বলে অনুসারীরা উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাঁর দোয়া নিতে কুতুব শরীফে গিয়েছিলেন।
১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে কুতুবদিয়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁর পর্ণকুটিরটি অক্ষত ছিল—এ ঘটনাকে ভক্তরা বিশেষ কারামত হিসেবে দেখেন।
২০০০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের মাঝিরঘাটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইন্তেকালে লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও অনুসারী শোকাহত হন।
শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁর আদর্শ, আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে তিনি আজও মানুষের হৃদয়ে এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে আছেন।