রবিবার ১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে কক্সবাজার, বদলে যেতে পারে পর্যটন-অর্থনীতির চিত্র

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা

শফিকুর রহমান   |   শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   18 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা

কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে চার কিংবা ছয় লেনে উন্নীত করা। বছরের পর বছর যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, ধীরগতির যোগাযোগ এবং পর্যটন শিল্পের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে এই দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। অবশেষে সেই দাবির প্রতিফলন দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায়।

শনিবার সন্ধ্যায় চকরিয়া পৌর বাসটার্মিনাল মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পর জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি সড়কের উন্নয়ন হবে না; বরং কক্সবাজারের অর্থনীতি, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন- ২৫ বছর আগে আমি যে কক্সবাজারের সড়ক দেখেছি, আজও তার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। কক্সবাজারের উন্নয়নের স্বার্থে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করা হবে।

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রোহিঙ্গা সংকট এবং ক্রমবর্ধমান পর্যটন শিল্প- সব মিলিয়ে কক্সবাজার বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা। অথচ এই জেলার প্রধান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।

বিশেষ করে ঈদ, পূজা, সরকারি ছুটি কিংবা পর্যটন মৌসুমে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয় যাত্রীদের। অনেক সময় সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। এতে পর্যটক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ৬ লেন মহাসড়ক বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে দীর্ঘ যাত্রা, যানজট এবং সময়ের অনিশ্চয়তা অনেক পর্যটককে নিরুৎসাহিত করে। উন্নত মহাসড়ক হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের যাতায়াত আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে। এতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে, হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবা খাতে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে।

কক্সবাজারের লবণ, মাছ, শুঁটকি, কৃষিপণ্য এবং বিভিন্ন স্থানীয় পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে এসব পণ্য দ্রুত ও কম খরচে পরিবহন করা সম্ভব হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় কমলে উৎপাদন খরচও কমবে। ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পেতে আধুনিক মহাসড়ক অপরিহার্য। আগামী বছরগুলোতে এসব প্রকল্পকে ঘিরে পণ্য পরিবহন ও যাত্রী চলাচল কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। সেই চাপ মোকাবিলায় ৬ লেন মহাসড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওভারটেকিং, বিপরীতমুখী যানবাহনের চাপ এবং সংকীর্ণ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ৬ লেন সড়ক নির্মিত হলে যানবাহন চলাচল হবে আরও সুশৃঙ্খল। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পর্যটন, পরিবহন, আবাসন, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, যার সুফল দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষ ভোগ করে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত হলে সরাসরি উপকৃত হবে কক্সবাজার জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। এছাড়া চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোটি মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হবে। প্রতি বছর কক্সবাজারে আগত লাখো পর্যটক, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, লবণচাষি, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এর সুফল ভোগ করবেন।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। আগামী বাজেটে ৪২ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড এবং ৪০ লাখ কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। এসব উদ্যোগ ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কর্মসূচির অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল। তিনি লবণচাষিদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতি কেজি লবণের ন্যূনতম মূল্য ১৫ টাকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সভায় কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না এমপিসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার জেলার দশম উপজেলা হিসেবে মাতামুহুরী উপজেলা ও থানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

কক্সবাজারবাসীর প্রত্যাশা, ঘোষণার মধ্যেই যেন প্রকল্পটি সীমাবদ্ধ না থাকে; দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে জেলার উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার শুধু দেশের প্রধান পর্যটন নগরী হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

Facebook Comments Box

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

প্রকাশক ও সম্পাদক
তাহা ইয়াহিয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
বিজয় কুমার ধর

যোগাযোগ

প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত

মোবাইল : বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন : 01828090145, 01812586237

ই-মেইল: ajkerdeshbidesh@yahoo.com