শফিকুর রহমান | বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | 22 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের সাগরপাড়া এলাকায় স্থানীয় মানুষের পৈত্রিক বসতভিটা জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে উপকূলীয় বন বিভাগের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় ও রেকর্ডভুক্ত জমির মালিকানা নিয়ে বন বিভাগের দাবি এবং সাম্প্রতিক দখলচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য, ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় বন বিভাগের পোকখালী বিট অফিসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন জমির মালিক সিদুল দে। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, কয়েক প্রজন্ম ধরে ভোগদখলে থাকা তাদের বসতভিটার ওপর কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি ছাড়াই বন বিভাগ মালিকানা দাবি করছে এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে জমিটি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়:- প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, চৌফলদন্ডী মৌজার আরএস ৬০৫ এবং বিএস ১৪৪৮ খতিয়ানে তেজেন্দ্র দে, বাদল চন্দ্র দে, হরবিন্দু দে ও কালী কুমার দে’র নামে জমিটি রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তাদের পরিবার কয়েক যুগ ধরে ওই জমিতে বসবাস করে আসছে এবং বসতভিটা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়:- বন বিভাগ ১৯৭৩-৭৪ সালে এক একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল বলে দাবি করে আসছে। তবে জমির মালিকপক্ষ এ দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, অধিগ্রহণের কোনো ক্ষতিপূরণ তারা কিংবা তাদের পূর্বপুরুষরা কখনো গ্রহণ করেননি। শুধু তাই নয়, জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদান, জমি হস্তান্তর কিংবা সরকারি দখল গ্রহণের কোনো গ্রহণযোগ্য নথিপত্রও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত উপস্থাপন করতে পারেননি।
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নুরু জানান:- প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জমির মালিকদের কাছে প্রায় আড়াই কানি জমি ক্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় মালিকরা জমি বিক্রয়ে রাজি হননি। পরে সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি জমিটি সত্যিই বহু আগে অধিগ্রহণ হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে কেন জমি ক্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল? আবার যদি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষতিপূরণ প্রদানের নথি কোথায়? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর মিলছে না বলে দাবি তাদের।
জমির মালিক সিদুল দে বলেন:- আমার বাবার নামে জমির রেকর্ড রয়েছে। আমরা বৈধভাবে এই জমি ভোগদখল করে আসছি। বন বিভাগ অতীতেও জমি অধিগ্রহণের কথা বলেছিল, কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। কারণ জমির মালিকরা জমি হস্তান্তরে রাজি হননি। এখন আমরা সাধারণ ও অসহায় মানুষ হওয়ায় সুযোগ নিয়ে আমাদের বসতভিটা দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন:- আমরা বৈধ কাগজপত্রের ভিত্তিতে সেখানে গিয়েছি। আদালতের রায় এবং বিভিন্ন দালিলিক রিপোর্ট আমাদের কাছে রয়েছে।
তবে কোন আদালতের রায়, কখন দেওয়া হয়েছে, মামলার নম্বর কী এবং কোন দালিলিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বন বিভাগ জমিটির মালিকানা দাবি করছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। ফলে বন বিভাগের দাবির ভিত্তি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রেকর্ডভুক্ত ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমির ওপর সরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন দাবি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যখন অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ ও মালিকানা সংক্রান্ত মৌলিক নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্তের প্রয়োজন দেখা দেয়।
তাদের দাবি, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে ভূমি প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে জমির মালিকানা নিয়ে সকল নথি জনসম্মুখে প্রকাশ করে বিভ্রান্তি দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এদিকে অভিযোগের পর ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোনো পক্ষের দাবিকে ভিত্তি করে পদক্ষেপ নেওয়া হলে একটি পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।