রবিবার ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত

৬ মাস ধরে বন্ধ হিন্দু রোহিঙ্গাদের রেশন:অনিশ্চিত জীবনের গেঁড়াকলে প্রত্যাবাসন

শ.ম.গফুর,উখিয়া   |   শনিবার, ২০ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   29 বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

৬ মাস ধরে বন্ধ হিন্দু রোহিঙ্গাদের রেশন:অনিশ্চিত জীবনের গেঁড়াকলে প্রত্যাবাসন

২০ জুন, বিশ্ব শরণার্থী দিবসে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে দিন পালিত হয়েছে।দীর্ঘ অনিশ্চিত জীবনের ঘানি টানছে রোহিঙ্গারা।

যুদ্ধ, সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে দিবসটি পালন করছেন কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাও।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী জনপদ হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত এসব মানুষের জীবন এখনও অনিশ্চয়তা, সীমাবদ্ধতা এবং প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় আটকে আছেন।২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান শুরু হলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে ককক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৯৭ হাজার। এর মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছেন প্রায় ১১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এবং ভাসানচরে রয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা।

তারা বলছেন, দিন যত যাচ্ছে, সংকট তত বাড়ছে। তারা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরতে চান।কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৭ এর মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) মোহাম্মদ সাদেক বলেন, ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস এলেই আমাদের জীবনের কষ্টগুলো নতুন করে সামনে আসে। প্রায় ৯ বছর ধরে আমরা বাংলাদেশে আশ্রিত জীবন কাটাচ্ছি। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু এটি আমাদের স্থায়ী সমাধান নয়।

আমরা আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্বের অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে ফিরে যেতে চাই।আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচআর) চেয়ারম্যান মুহাম্মদ জুবাইর বলেন, ‘ক্যাম্পে আমাদের সন্তানরা বড় হচ্ছে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাধীন চলাচলের সুযোগ সীমিত। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মিয়ানমার দেখেনি। আমরা চাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আরও কার্যকর ভূমিকা নিক, যাতে আমরা নিজ দেশে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারি।কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং-বালুখালী মেগা ক্যাম্পকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতি হিসেবে ধরা হয়।

মাত্র কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকায় লাখো মানুষের বসবাস। বাঁশ, ত্রিপল ও টিনের তৈরি অস্থায়ী ঘরগুলো বর্ষা, ঝড় এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে সবসময় থাকে। ক্যাম্পগুলোতে নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করলেও জনসংখ্যার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা এখনও সীমিত।

রোহিঙ্গাদের বড় অংশের দিন কাটে খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা সেবা ও মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে। ক্যাম্পের বাইরে অবাধে কাজ করার সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ পরিবার আয়বিহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছে।রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক সহায়তা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থায়ন কমতে শুরু করেছে।

জাতিসংঘ এবং সহযোগী সংস্থাগুলো ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা পূরণে ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল চেয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অর্থায়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। সহায়তা কমে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি কর্মসূচি এবং সুরক্ষা কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করেছে, অর্থের সংকট অব্যাহত থাকলে শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি শিশু।

ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার শিশু কখনও মিয়ানমার দেখেনি। তাদের পরিচয় এখন ‘শরণার্থী’। সীমিত শিক্ষার সুযোগ এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের অভাবে একটি পুরো প্রজন্ম ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বেড়ে উঠছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া শিশুদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও নানা ধরনের অপরাধ এখনও উদ্বেগের কারণ। মাদকপাচার, মানবপাচার, চাঁদাবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা মাঝেমধ্যে সামনে আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানহীন ও অনিশ্চিত পরিবেশে বসবাস মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে, যা অপরাধচক্রের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারীরা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় প্ররোচিত করছে।
মালয়েশিয়া বা অন্যকোনও দেশে উন্নত জীবনের আশায় প্রতিবছর শত শত রোহিঙ্গা দালালদের মাধ্যমে সাগরপথে যাত্রা করে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রযাত্রা ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী।

প্রায় ৯০০ জন নিহত বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালেও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ক্যাম্পে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎহীনতাই অনেককে এই ঝুঁকি নিতে বাধ্য করছে।প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ক্যাম্পে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও ঝড়ের শঙ্কা দেখা দেয়।

পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডও বড় ঝুঁকি। চলতি বছরের শুরুতে কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ আগুনে শত শত ঘরবাড়ি পুড়ে যায় এবং দুই হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ এবং বাঁশ-ত্রিপলের ঘর অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ক্যাম্পের অবকাঠামো উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
চ্যালেঞ্জের মধ্যেও স্বাস্থ্য খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সম্প্রতি কুতুপালং ক্যাম্পে আধুনিক মাতৃসেবা হাসপাতাল চালু হয়েছে, যেখানে প্রসূতি মায়েদের জন্য ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এটি মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় চিকিৎসা সুবিধা এখনও অপর্যাপ্ত এবং অর্থায়ন সংকট অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। কিন্তু মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, নাগরিকত্ব সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রত্যাবাসন কার্যত স্থবির হয়ে আছে।আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশ সরকার বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে, যাতে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া হয়। কারণ প্রায় এক দশক ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভার বহন করা বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

’বিশ্ব শরণার্থী দিবসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর চিত্র একদিকে মানবিক সহমর্মিতার, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার প্রতীক। ৯ বছর পরও তারা নিজ দেশে ফিরতে পারেনি, আবার স্থায়ী ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও পায়নি। ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম শরণার্থী পরিচয় নিয়েই বড় হচ্ছে। ২০ জুন ছিল আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস।

উখিয়া-টেকনাফের কয়েকটি ক্যাম্পে দিবসটি পালন করাও হয়। এ উপলক্ষে ব্যানার-ফেস্টুন,লিফলেট, প্লেকার্ড হাতে নিয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকেই বক্তব্য রাখেন।তাতে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী জীবনের নানাদিক তুলে ধরা হয়।কিন্তু কুতুপালংস্থ হিন্দু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছিল বাস্তবতার ভিন্ন চিত্র।আশ্রিত হিন্দু রোহিঙ্গাদের একাংশ রেশন সুবিধা সহ আবাসনের আওতায় রয়েছে।অপর একটি অংশের প্রায় সাড়ে ৩শ পরিবারের সহস্রাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু গত ৬ মাস ধরে রেশন-ভাতা ও আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছে।তারা নিজেরাও জানে না কি কারণ রেশন ও আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ষাটোর্ধ হিন্দু রোহিঙ্গা নারী রাধিকা বালা বলেন গত ২০২৪ সালে মিয়ানমার জান্তা সরকার ও মগবাগির দ্ধিমুখি অত্যাচার থেকে প্রান বাঁচাতে পালিয়ে এদেশে এসেছি।আসার পর রেশন সুবিধায় আওতায় এসেছিলাম।কিন্তু চিকিৎসা, আবাসন,পানি সংকটে ভোগছিলাম।এরই মাঝে গত ২০২৬ সালের জানুয়ারী মাসের পর থেকে আকস্মিক রেশন সুবিধা বন্ধ করে দিয়েছে।ইন্দ্র বালা-(৩৫)প্রতিবন্ধি আশিস কুমার শর্মা(২৬)পশুরাম শর্মা(৫০)সোনারাম ধর এর মত ক্ষুদ্ধ কন্ঠে অনেকেই একই কথা জানান।আন্তর্জাতিক সহায়তা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই মানবিক সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন এখানকার বাসিন্দারা।

Facebook Comments Box

Comments

comments

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

প্রকাশক ও সম্পাদক
তাহা ইয়াহিয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
বিজয় কুমার ধর

যোগাযোগ

প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত এবং দেশবিদেশ অফসেট প্রিন্টার্স, শহীদ সরণী (শহীদ মিনারের বিপরীতে) কক্সবাজার থেকে মুদ্রিত

মোবাইল : বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন : 01828090145, 01812586237

ই-মেইল: ajkerdeshbidesh@yahoo.com