শফিকুর রহমানঃ | মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | 32 বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সোমবার (১৫ জুন) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন রিট আবেদনটি দায়ের করেন। আবেদনে মহেশখালী উপকূলীয় এলাকা থেকে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন এবং নামমাত্র মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদন জানানো হয়। হাইকোর্ট রিটটি গ্রহণ করে আগামী ২১ জুন শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
রিটের নথিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর ভিত্তিমূল্য (রয়্যালটি) ৬ টাকা ৯৪ পয়সা হলেও ড্রেজিং ব্যয় বাবদ ৪ টাকা ৫৭ পয়সা সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যত প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা। এতে সংশ্লিষ্ট যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তোকিউ-এমআইএল-জেভি (Tokyu-MIL-JV) বিশেষ আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে এবং রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আইনজীবীদের দাবি, ‘বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র বাধ্যতামূলক। অথচ এ প্রকল্পে কোনো প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
রিটে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ কক্সবাজার (কস্তুরীঘাট) বন্দরের সহকারী পরিচালক, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তোকিউ-এমআইএল-জেভি যৌথ উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বালুতেই ঠিকাদারের পকেটে যাবে ৪৫০ কোটি টাকা” শিরোনামে দাবি করা হয়, মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড প্রকল্পে ব্যবহৃত বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব সুবিধা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্র থেকে উত্তোলিত বালুর রয়্যালটি প্রতি ঘনফুট ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারিত হলেও ড্রেজিং ব্যয় সরকারি কোষাগার থেকে বহনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কার্যত সরকারের রাজস্ব আয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি ঘনফুটে ২ টাকা ৩৭ পয়সায়।
রিট আবেদনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের স্বাক্ষরে বালু উত্তোলনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে অনুমোদনের আগে কোনো বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়নি এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র কিংবা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) সম্পন্ন করা হয়নি।
পরিবেশবিদদের মতে, যথাযথ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়া মহেশখালী উপকূল থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করলে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এবং এলাকার ভূপ্রকৃতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রিটকারী আইনজীবী সোহানা শারমিন বলেন, “সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা এবং এর অপচয় ও অপব্যবহার প্রতিরোধ করা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু এখানে আইনের তোয়াক্কা না করে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা জনস্বার্থের পরিপন্থী।”
তিনি বলেন, “বালুমহল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) যথাযথভাবে পর্যালোচনা ছাড়াই এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।”
তার দাবি, প্রকল্পে অন্তত ৫০ কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বালুর বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে প্রতি ঘনফুট ৪৭ টাকা থেকে ১১৭ টাকা পর্যন্ত বিল নেওয়া হবে, অথচ রয়্যালটি বাবদ রাষ্ট্র পাবে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং শত শত কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই বালু উত্তোলনের সিদ্ধান্ত পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেও পরিপন্থী। তাই আমরা এই অবৈধ ও জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা স্থগিত এবং রুল জারির আবেদন জানিয়েছি। আদালত রিটটি গ্রহণ করেছেন এবং আমরা আশা করছি দেশের সম্পদ ও পরিবেশ সুরক্ষায় আদালত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।